মাতামুহুরীর বুকে অসংখ্য চর : নাব্যতা হ্রাস আশঙ্কাজনক হারে

fec-image

বান্দরবানের পাহাড়ি নদী মাতামুহুরীর চিরচেনা রূপ বদলে যাচ্ছে। নদীর বুকে জেগে ওঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় চর। ক্ষীণ হয়ে আসা প্রবাহ জানান দিচ্ছে বার্ধক্য যেন ভর করছে এ স্রোতস্বিনীর বুকে। এক দশকের ব্যবধানে এ নদীর নাব্যতা হ্রাস পেয়েছে আশঙ্কাজনক হারে। খরস্রোতা মাতামুহুরীর অবিরত বোবা কান্না উপলব্ধিরও যেন কেউ নেই!

সরেজমিন দেখা গেছে, মাতামুহুরী নদীর উৎপত্তি আলীকদম উপজেলা সদর থেকে অন্তত ৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে। ক’বছর পূর্বে এ প্রতিবেদক  বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী আলীকদমের গহীন অরণ্যের পাহাড়ভাঙা এলাকায় গিয়ে এ নদীর উৎপত্তিস্থল পরিদর্শন করেন। পাহাড়ভাঙা মুরুং পাড়ার অনতিদুরে গেলেই দেখা মেলে এ মাতামুহুরী নদীর উৎপত্তি!

নদীটির উৎপত্তিস্থল ইংরেজি “Y” (ওয়াই) অক্ষরের মতো। উজানের দক্ষিণ দিক থেকে ‘ফাত্তারা ঝিরি’ ও দক্ষিণ-পূর্ব থেকে আসা ‘মাতাদুসরী ঝিরি’র মিলনস্থলই খরস্রোতা ‘মাতামুহুরী’র উৎপত্তিস্থল।

স্থানীয় প্রবীণ লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, একসময় বর্ষাকাল শেষ হয়ে গেলেও মাতামুহুরীতে পানির জৌলুস থাকতো গ্রীষ্মমৌসুমজুড়ে। কিন্তু এখন শুষ্কমৌসুম শুরু হতে না হতেই নদীর বুকে জেগে ওঠে একের পর এক ধু-ধু বালুচর।

নদীর নাব্য হ্রাসের কারণ পাহাড় ন্যাড়া করে জুমচাষ ও নির্বিচারে বৃক্ষ নিধন অন্যতম। এছাড়াও পাহাড় ও ঝিরি খুঁড়ে অবাধে পাথর উত্তোলন এবং নদীর তীরে ব্যাপকহারে তামাক চাষকেই দায়ী করছেন পরিবেশবাদীসহ স্থানীয়রা।

নদীর নাব্যসংকটে এককালের প্রমত্তা মাতামুহুরীর বুকে নৌযান চলাচল, কাঠ ও বাঁশ পরিবহনে এখন মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। নদীর গভীর জলাশয়গুলো ভরাট হয়ে গেছে। ফলে উধাও হয়েছে নানা প্রজাতির সুস্বাদু মাছ।

এ নদীর ওপর নির্ভরশীল সহস্রাধিক জেলে পরিবারের করুণদশা। নদীর ক্ষীণ প্রবাহের সঙ্গে যেন এসব জেলের জীবনের গতিও ক্ষীণ হয়ে আসছে।

নব্বই দশকের পর থেকে মাতামুহুরীর উৎপত্তিস্থল থেকে শুরু করে গভীর অরণ্যে নির্বিচার বৃক্ষ নিধন চলছে।

পাশাপাশি জুমচাষের ফলে পাহাড় হয়েছে ন্যাড়া। এর বিরূপ প্রভাবে বর্ষায় বৃষ্টির সাথে পাহাড় ধসে মাটি ও বালি এসে ভরাট করে দিচ্ছে নদীর বুক। আর এসব কারণে মাতামুহুরীর সেই গভীরতা এখন আর নেই কোথাও।

মাতামুহুরীর শীর্ণবুকের ধু ধু বালুচরও এখন একশ্রেণির অর্থলোভী পরিবেশ বিধ্বংসী তামাক চাষীর দখলে। এক্ষেত্রে যাদের দেখার কথা তারা যেন কুম্ভকর্ণের তন্দ্রাবিলাসে।

মাতামুহুরী নদীর দৈর্ঘ ১১৮ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থল থেকে সর্পিল গতিতে একেবেঁকে নদীটি পশ্চিমমুখী বাঁক নিয়ে আলীকদম-লামা ও চকরিয়া উপজেলার বুক চিরে প্রবাহিত হয়েছে।

পাহাড়ি উপজেলা লামা ও আলীকদমের ভূমিঢাল পশ্চিমমুখী হওয়ায় এ নদী চকরিয়ার বুক চিরে পেকুয়া পেরিয়ে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া চ্যানেলের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাতামুহুরী নদীর উৎপত্তিস্থল আলীকদম থেকে চকরিয়া পর্যন্ত ত্রিশটিরও অধিক কুম (গভীর পানি স্থল/খাদ) ছিল।

এগুলোর মধ্যে চেলার কুম, বুজির কুম, গোলকুম, মাছকুম, তুলা সিকদার কুম, ছোট বমুর কুম, চতরমল্লার কুম, কুরইল্যার কুম, কলইঙ্গার কুম, সাবেক বিলছড়ির কুম, তেইল্যার কুম, রেপারফাঁড়ির কুম, উনাছড়ির কুম, তাঞ্জার কুম, মল্লাইয়া পাড়ার কুম, চৈক্ষ্যং এর মুখের কুম, পাইল্লা পাড়ার কুম, মিজ্জিরির কুম, লামার হলইঙ্গার কুম, দুইখ্যা-সুইখ্যার কুম, সীতার কুম, ইয়াংছার কুম, ফাইতংয়ের কুম, চকরিয়ার ঘুইন্যার কুম, মোস্তাক মিয়ার কুম উল্লেখযোগ্য।

এসব কুমে সব সময়ই ৪০ থেকে ৬০ হাত পানি থাকতো। এখন এসব কুম ভরাট হয়ে গেছে।

এ নদীর বিপন্নদশা কাটাতে হলে ড্রেজিং করা জরুরি। অন্যথায় মাতামুহুরীর চকরিয়ার বাঘগুজারা ও রামপুর-পালাকাটা পয়েন্টে প্রায় ৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দু’টি র‌্যাবার ড্যামেও পানিসংকট দেখা যাবে।

লামা-আলীকদমে দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা পেশায়যুক্ত লামা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান জানান, উনিশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিটিশ সরকার সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর নাব্যতা ধরে রাখতে নদী তীরবর্তী পাহাড়ি অঞ্চলে ব্যাপকাহারে বনায়নের উদ্যোগ নেন।

সে ধারাবাহিকতায় বনায়নও গড়ে তোলা হয়েছিল। এসব বনে গত দু’যুগের বেশি সময় ধরে আগ্রাসী তৎপরতার কারণে পাহাড়ের মাটি নদীতে পড়ছে। পাশাপাশি নদীর তীরে তামাক চাষের কারণে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে।

প্রবীণ ব্যক্তিরা জানান, ১৯৮০-৮৫ সালেও মাতামুহুরী নদীর গভীরতা ছিল ৫০-৬০ ফুট। প্রস্থ ছিল ৫০০-৭০০ মিটার। এ নদীর আয়তন প্রায় ১৮৮০ একর।

গত ১০-১২ বছরে ভরাট হয়ে এ নদীর গভীরতা ১৫-২০ ফুটে চলে এসেছে। দুই কুল ভেঙে নদীর প্রস্থ দাঁড়িয়েছে ১০০০-১২০০ মিটারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সাথে আলাপে জানা গেল, বিপন্ন মাতামুহুরীর সংস্কারে সরকারি তরফে এ পর্যন্ত কোন সুখবর নেই। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড মাতামুহুরীর কয়েকটি পয়েন্টে ভাঙন প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেজিং করার পূর্বে যে কোন নদীর জরিপ দরকার পড়ে। তবে এখনো মাতামুহুরী সরকারীভাবে জরীপে আওতায় আসেনি। এ কারণে জরীপের আগে ড্রেজিং সম্ভব হবে না।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven − 1 =

আরও পড়ুন