মানিকছড়িতে তৃণমূলের অসহায় দুস্থরা এখনো উন্নয়নের আড়ালে!

fec-image

খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলার চারটি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগলেও দুর্গমে বসবাসরত অসহায়, দরিদ্র ও দুস্থ জনগোষ্ঠীরা জীবনমান পরিবর্তনে মৌলিক অধিকার থেকে এখনো পিছিয়ে রয়েছে! সরকারের নানামুখী জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমে অসহায় মানুষ প্রতিনিয়ত সুবিধাবঞ্চিত থাকায় সরকারের উদ্যোগ একদিকে যেমন ব্যাহত অন্যদিকে জনপদে বাড়ছে দরিদ্রতার চাপ।

বিশেষ করে উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের তিনঘরির পাড়া, যোগ্যাছোলা ইউনিয়নের গুজাপাড়া, আচালংপাড়া, বড়টিলা, তিনটহরী ইউনিয়নের কুমারী, দাইজ্জাপাড়া, দেবাতলী, ডেপুয়া পাড়া, মম্প্রুতলী ও সদর মানিকছড়ি ইউনিয়নের ওয়াকছড়ি, ফকিরনালা এলাকায় অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার পাশাপাশি অন্তত দু’শতাধিক পরিবারে অনিরাপদ বাসস্থান ও সুপেয় পানি সংকটে রয়েছে।

সরজমিনে দেখা গেছে, এসব এলাকায় মুসলিম, চাকমা, ত্রিপুরামারমা সম্প্রদায়ের সম্প্রীতির বসবাস। এদের মধ্যে অধিকাংশই পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছে জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ ঘরে। বাঁশের বেড়া আর ছনের চালায় তৈরী অধিকাংশ ঘরের ভেতর থেকে দেখা যায় উপরের আকাশ! মেঝেতে নিজেদের তৈরী পাটি বিছিয়েই ঘুমাতে হয় তাদের। জরাজীর্ণ, ভাঙা, লক্কর-ঝক্কর ঝুঁপড়ি ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছে পরিবারগুলো। রোদে শুকিয়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে আতঙ্ক নিয়ে বসবাস করেন ওই ভাঙা ঘরে। বৃষ্টি হলে পানিতে সয়লাব হয়ে যায় কারও কারও ঘরের মেঝে।

উপজেলা সদর থেকে গড়ে প্রায় ১০- ১২ কিলোমিটার দূরের গ্রামগুলোতে যাতায়াতের সড়কগুলো উঁচুনিচু কাঁচা ও মেঠোপথ হওয়ায় বর্ষার মৌসুমে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হয় এলাকাবাসীর। সড়কের মাঝে কোথায় ব্রিজ কিংবা কালভার্ট না থাকায় ঝুঁকি নিয়েই উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিয়ে বাঁশের সাঁকু দিয়ে পারাপার হচ্ছে কৃষক। বিভিন্ন সময়ে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মসূচির আওতায় যৎসামান্য সংস্কার করলেও ইটের সলিং না হওয়ায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা।

গুজাপাড়ার হত-দরিদ্র কালেন্দ্র কুমার চাকমা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের এই ওয়ার্ডটি ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় একটি ওয়ার্ড। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত! নেই ভালো থাকার ঘর, নেই রাস্তা, নেই কালভার্ট, নেই একটি স্কুলও। অথচ অন্যান্য এলাকায় কত উন্নত হয়েছে এই সরকারের আমলেই।’

আচালংপাড়ার অসহায় দেবেন্দ্র ত্রিপুরার স্ত্রী মনপতি ত্রিপুরা বলেন, ‘স্বামী সন্তান নিয়ে বেড়াহীন ভাঙ্গা ঝুঁপড়ি ঘরেই থাকি। টাকা-পয়সা না থাকায় ভালো একটি ঘর করতে পারছি না। সন্তান দুটি তিন কি.মি. দূরে পায়ে হেঁটে গিয়ে পড়ালেখা করছে। এই ঝুপড়িতে রান্না, খাওয়া ও মেঝেতেই ঘুমাই। বর্ষার সময় অন্যের ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।’

বড়টিলার বাসিন্দা তিন সন্তানের জনক হত-দরিদ্র লক্ষী বিলাস চাকমা বলেন, ‘আমি বয়স্ক ব্যক্তি, পাঁচ সদস্যের সংসারের খরচ জোগাতে কষ্ট হয়। প্রায় সময় অর্ধাহারে থাকি। জরাজীর্ণ এই ঘরটিতে কিশোরী দুই মেয়ে ও ছেলেকে নিয়ে অনেক কষ্টে দিন পার করছি। বর্ষার সময় বেশি কষ্ট হয়। সরকার যদি একটি ঘর করে দিতো তাহলে বাকীটা জীবন অন্তত মাথা গোঁজার ঠাঁই হতো।’

প্রবীণ ব্যক্তি সুলতান আহমেদ বলেন, ‘এই এলাকাটি দুর্গম আর আয়তনে বড় হওয়ায় অনেকটাই অবহেলিত। আমি নিজেও ৮ সদস্যের পরিবার নিয়ে অনেক কষ্টে দিনপাত করছি। পাহাড় টিলায় কিছু ফসল উৎপাদন করলেও তা সঠিক বাজারজাত করতে পারিনা। রাস্তাঘাট উন্নত হলে এখানকার মানুষের জীবনমান উন্নত হবে। তাছাড়া যাচাইপূর্বক এই এলাকায় সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর প্রদান করলে অসহায় মানুষগুলো মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে।’

স্থানীয় ইউপি সদস্য সুমন্ত কান্তি চাকমা বলেন, ‘এই ওয়ার্ডের গুজাপাড়া, আচালংপাড়া, বড়টিলা ও চাকমাপাড়া অত্র উপজেলার সবচেয়ে প্রত্যন্ত জনপদ। হত-দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বেশি। সে অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদ হতে প্রাপ্ত সুযোগ সুবিধা অপ্রতুল। বিশেষ করে রাস্তাঘাট নির্মাণ ও গৃহহীনদের আশ্রয় (ঘর) প্রদান জরুরি।’

যোগ্যাছোলা ইউপি চেয়ারম্যান ক্যয়জরী মহাজন বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে যারা প্রকৃত অসহায় রয়েছে তাদেরকে যাচাই-বাছাই করে ঘরসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ওই এলাকায়ও বেশ কয়েকটি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর ও সৌর বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। পর্যাক্রমে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও দেওয়া প্রয়োজন।’

এদিকে উপজেলার বাটনাতলী ইউনিয়নের (৮নং ওয়ার্ড) তিনঘরিয়া পাড়ায় গিয়েও দেখা যায়, বেশ কয়েকটি পরিবারের মানবেতর জীবন-যাপনের চিত্র। তার মধ্যে অন্যতম নাসিরাম ত্রিপুরা (৭০)। বছর তিনেক আগে স্ত্রী মারা যাবার পর বেড়াহীন ভাঙ্গা ঘরেই কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে শীত, বর্ষা কিংবা প্রখর রোদে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। দুই ছেলে থাকা স্বত্ত্বেও কেউই পাশে নেই বৃদ্ধ নাসিরাম ত্রিপুরার।

এ বিষয়ে মানিকছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রক্তিম চৌধুরী বলেন, ‘উপজেলার প্রত্যন্ত জনপদেের জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছে সরকার। ইতোমধ্যে ৭২২ ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে আশ্রয়ণ ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। ২০০ পরিবারে ঘর নির্মাণ কাজ চলছে। এছাড়া এলাকার প্রকৃত অসহায়দের সরকারি সকল সুযোগ সুবিধার আওতায় আনতে জনপ্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগে কাজ করছি। চলমান ভিডব্লিউবি কর্মসূচিতে অসহায়, দুস্থ নারীদের প্রাধান্য দেওয়া হবে।’

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: উন্নয়ন, তৃণমূল, মানিকছড়ি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন