বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারের পররাষ্ট্রনীতিতে বলেছিল, ‘পররাষ্ট্রনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনগণের কল্যাণ সর্বাগ্রে প্রাধান্য পাবে। সমতা, ন্যায্যতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে বাংলাদেশ একটি আত্মমর্যাদাশীল, সক্রিয় ও দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অবস্থান গ্রহণ করবে।’
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির ছত্রে ছত্রে যেভাবে আমাদের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি রয়েছে কিংবা যেভাবে এর ছত্রে ছত্রে বাংলাদেশের জন্য অসমতা, অন্যায্যতা এবং অসম্মানজনক ধারা রাখা হয়েছে, সেটা কি বিএনপি দেখতে পাচ্ছে না, নাকি দেখতে চাইছে না? এখানে সামান্য কিছু নমুনা দেওয়া হয়েছে মাত্র।
মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি যেভাবে আমাদের স্বার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি
চুক্তির আর্টিকেল ৪.১ অনুসারে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের ইচ্ছামাফিক চলতে হবে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার নিজের স্বার্থে কোনো দেশের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের শুল্ক বা অশুল্ক প্রতিবন্ধকতা আরোপ করে, তাহলে চুক্তির এই ধারা অনুযায়ী সেই দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য যতই লাভজনক কিংবা কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, বাংলাদেশকেও তখন যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া পদক্ষেপের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনুরূপ প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে হবে সেই দেশের জন্য। তার মানে কার সঙ্গে বাংলাদেশ কীভাবে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়বে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা বাংলাদেশের আর থাকল না।
আর্টিকেল ৪.১–এ আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভেতরে পণ্য উৎপাদন করা তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানির পণ্যের জন্য যদি বাংলাদেশে বা তৃতীয় কোনো দেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তার মানে চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশ তার অভ্যন্তরে কোন দেশকে ব্যবসা করতে দেবে আর কোন দেশকে দেবে না, সেই সিদ্ধান্তও এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্র নেবে।
আর্টিকেল ৪.২–তে আরও বলা হয়েছে যে বাংলাদেশে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের লেনদেন যদি এমন হয় যে, সেটি যুক্তরাষ্ট্রে ঘটলে বা কোনো আমেরিকান ব্যক্তি করলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের লঙ্ঘন বলে গণ্য হতো, তবে সেই লেনদেনগুলো বন্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। অর্থাৎ সোজা বাংলায় যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো দেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে বাংলাদেশকেও সেই নিষেধাজ্ঞা মানতে তো হবেই, পাশাপাশি বাংলাদেশের ভেতরে কোন কোম্পানি কার সঙ্গে কী লেনদেন করবে, সেটা এখন থেকে ঠিক করে দেবে ওয়াশিংটন। অর্থাৎ দেশ আমাদের, আর আইন চলবে যুক্তরাষ্ট্রের।
অন্যদিকে আর্টিকেল ৪.৩ অনুযায়ী, বাংলাদেশ অবাজার অর্থনীতির কোনো দেশের সঙ্গে মার্কিন বাণিজ্যচুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এমন কোনো বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। এর মাধ্যমে কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে কোনো ধরনের নতুন বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে বিরত রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক দেওয়া তালিকায় অবাজার অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে চীন, রাশিয়া ছাড়াও অন্যান্য দেশের মধ্যে ভিয়েতনামের নামও রয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের সামরিক ও বাণিজ্যিক সার্বভৌমত্ব বলে কিছু আর থাকবে না। বাংলাদেশ হয়ে পড়বে আমেরিকার ভূরাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি।
সেই আর্টিকেলে আরও বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে জাহাজ নির্মাণ ও শিপিং খাতে বাজার অর্থনীতির দেশগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে বাংলাদেশকে। শুধু তা–ই নয়, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কী নীতি নেবে, সেটা বাংলাদেশ একা ঠিক করতে পারবে না। এই ধারা অনুযায়ী সেটা ঠিক করতে তাকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘আলোচনা’ করতে হবে। সোজা বাংলায় এর মানে হলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশ, সেটি জাহাজ নির্মাণ ও শিপিংয়ের ক্ষেত্রে যতই কস্ট-ইফেক্টিভ হোক না কেন (যেমন চীন), সেটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এই খাতে আসতে উৎসাহিত করা যাবে না, কিংবা বাংলাদেশের যে নিজস্ব জাহাজ নির্মাণ সক্ষমতা তৈরি হয়েছে, সেটাকে উৎসাহিত করা যাবে না এবং ‘যৌথ আলোচনার’ নামে যুক্তরাষ্ট্র আসলে ঠিক করে দেবে বাংলাদেশ এই খাতে কী নীতি নেবে।
একদিকে অ্যানেক্স ৩–এর সেকশন ৬–এ পরিষ্কার করে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়াতে হবে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কেনা সীমিত করতে হবে। অন্যদিকে আর্টিকেল ৪.৩–এ বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য সহজতর ও জোরদার করবে। অর্থাৎ সামরিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে একতরফাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী করে তোলার আয়োজন করা হয়েছে।
যদিও পারমাণবিক প্রযুক্তি বা বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের জননিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবেই থাকবে, তবু বলতে হয় মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি সেই হুমকির ওপরই বাড়তি হুমকি যোগ করতে যাচ্ছে। আর্টিকেল ৪.৩ অনুযায়ী বাংলাদেশ মার্কিন স্বার্থকে হুমকির মুখে ফেলে, এমন কোনো দেশ থেকে নতুন করে নিউক্লিয়ার রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কিনতে চুক্তি করতে পারবে না। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মহাগুরুত্বপূর্ণ একটা সেক্টরে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বাধা পড়তে হবে। তবে আগে হওয়া রূপপুরের চুক্তি এর বাইরে থাকবে।
আর্টিকেল ৪.২ অনুযায়ী জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সংবেদনশীল এমন পণ্য ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে তার রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে সেটি যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার সঙ্গে মিলে যায়। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো পণ্য বা প্রযুক্তিকে তার জন্য স্পর্শকাতর মনে করে এবং সেসব পণ্য বা প্রযুক্তি কোনো দেশে পাঠানো নিষিদ্ধ করে, তাহলে বাংলাদেশকেও সেটা অনুসরণ করতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের ওপর প্রযুক্তিগত কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়, তাহলে সেই প্রযুক্তি বাংলাদেশও ওই দেশে রপ্তানি করতে পারবে না, সেটা বাংলাদেশের জন্য সামরিক বা বাণিজ্যিকভাবে যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন। অর্থাৎ অন্য কোনো সামরিক শক্তির সঙ্গে বাংলাদেশ তার নিজের সুবিধামতো কোনো গভীর বাণিজ্যিক বা কারিগরি সম্পর্ক রাখতে পারবে না।
আর্টিকেল ৪.২ তে আরও বলা হয়েছে যে অর্থনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভেতরে কী কী বিনিয়োগ, কী কী শর্তে আসছে, তার সব তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিতে বাংলাদেশ সহযোগিতা করবে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে হওয়া বিনিয়োগের ওপর কঠোর নজরদারি তো করবেই, সেই সঙ্গে তারা যদি মনে করে বাংলাদেশে হওয়া প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো দেশের বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তাহলে সেই বিনিয়োগ বন্ধ করার জন্য তারা চাপও দিতে পারবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত ক্ষেত্রে বিনিয়োগ আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একা কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না।
আর্টিকেল ৩.২ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ডিজিটাল পণ্যের সঙ্গে বাংলাদেশ কোনো বৈষম্য করতে পারবে না। শুধু তা–ই নয়, ‘ব্যবসার প্রয়োজনে’ বাংলাদেশের ডিজিটাল তথ্যের ডেটা অন্য দেশে বা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কোনো ধরনের বাধা দিতে পারবে না। ফলে পুরো ব্যাপারটি দিন শেষে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য একটা বড় হুমকি হবে।
জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত খাত হলো আমাদের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ। চুক্তির আর্টিকেল ৫.১ অনুযায়ী, বাংলাদেশকে তার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতকে মার্কিন কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করতে হবে এমনভাবে, যাতে মার্কিন কোম্পানি বাংলাদেশের জন্য অতিগুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও জ্বালানি কেবল অনুসন্ধান, উত্তোলন, শোধন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিবহন, বিতরণই করতে পারবে না; মার্কিন কোম্পানি সেটা রপ্তানিও করতে পারবে। এবং এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণও করতে পারবে না।
আর্টিকেল ৫.২ অনুযায়ী বাংলাদেশ এমনকি তার রাষ্ট্রায়ত্ত করপোরেশনগুলোকেও কোনো ভর্তুকি দিতে পারবে না, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবেই কাজ করবে।
এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনভাবে কোনো ধরনের ইমপোর্ট লাইসেন্সিং আরোপ করতে পারবে না বাংলাদেশ। এই চুক্তির কারণে বাংলাদেশ আলাদা করে নিজের মতো করে যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত পণ্যের মান যাচাই করতে পারবে না। বা করলেও তাতে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনভাবে করতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষতি করে বাংলাদেশ কোনো তৃতীয় দেশের সঙ্গে এমন কোনো ধরনের চুক্তি বা সমঝোতায় যেতে পারবে না, যেখানে এসপিএস মানদণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অনুরূপ নয়। বাংলাদেশ যদি কোনো পণ্যকে জিআই হওয়া সত্ত্বেও সেটা যে আসলেই জিআই, তা প্রমাণ করতে না পারে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যও একই নাম ব্যবহার করতে পারবে। অযথা বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিবছর ৭ লাখ মেট্রিক টন গম, ১.২৫ বিলিয়ন ডলারের সয়াবিন, ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তুলা কিনতে হবে। বাধ্য হয়ে কিনতে হবে ১৪টি বোয়িং বিমান, ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের এলএনজি।
চুক্তির ফলে ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস কঠোরভাবে মানতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ওষুধ শিল্পসহ নানান খাত। চুক্তির ফলে মার্কিন সেবাদাতা কোম্পানির সঙ্গে কোনো বৈষম্য করতে পারবে না বাংলাদেশ। ফলে দেশীয় সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো যারা দুর্বল তাদের আলাদা করে কোনো সুরক্ষা দিতে পারবে না বাংলাদেশ।
চুক্তির কারণে মার্কিন কোম্পানিকে ঠেকাতে কোনো ধরনের ভ্যাটও বসাতে পারবে না বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র যদি তার রপ্তানিকারকদের কোনো ভর্তুকি দেয়, তাহলে বাংলাদেশ সেটা নিয়ে আপত্তি করতে পারবে না। মার্কিন কোম্পানির সঙ্গে বৈষম্য করে বাংলাদেশ কোনো ধরনের ডিজিটাল সার্ভিস ট্যাক্স আরোপ করতে পারবে না। মার্কিন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে অন্য কোনো দেশের সঙ্গে কোনো ধরনের ডিজিটাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট করতে পারবে না। ইলেকট্রনিক ট্রান্সমিশনের ওপর কোনো ধরনের কাস্টমস ডিউটি আরোপ করতে পারবে না।
চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের জেনেটিক্যালি মডিফাইড পণ্য কোনো পরীক্ষা–নিরীক্ষা ছাড়াই বাংলাদেশে ঢুকতে দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের মুরগিতে বার্ড ফ্লু শুরু হলে পুরো দেশ থেকে আমদানিতে নিষেধাজ্ঞার বদলে মাত্র ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দিতে পারবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ শুধু তখনই কোনো মার্কিন কোম্পানিকে নিষিদ্ধ/সাসপেন্ড করতে পারবে, যদি তারা বারবার (multiple times) নিয়ম ভাঙে।
ওপরে যা যা ফিরিস্তি দেওয়া হলো, সেগুলো সবই বাংলাদেশের জন্য চূড়ান্ত অসম, অন্যায্য এবং অসম্মানজনক। ফলে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা কিংবা জাতীয় স্বার্থের কথা যদি বাদও দিই, তাহলেও শুধু অসম, অন্যায্য ও অসম্মানজনক এই কারণেও নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী এই চুক্তি সরকারকে বাতিল করতে হবে।
বিএনপি নির্বাচনী ইশতেহারে আরও বলেছিল যে তারা ‘আন্তর্জাতিক বিধিবিধান অনুযায়ী দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেবে।’ মার্কিন বাণিজ্যচুক্তিটির ভিত্তিই হলো বাণিজ্যের খোদ আন্তর্জাতিক বিধিবিধানকে ট্রাম্পের বুড়ো আঙুল দেখানো। ফলে এই দিক থেকেও এই চুক্তি বিএনপির ইশতেহারবিরোধী।
বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারে আরও বলেছে, ‘বাংলাদেশ অন্য কোনো রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রকেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে দেবে না।’ ইতিমধ্যে তেল কিনতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যেভাবে অনাপত্তির সন্ধান করেছে সরকার, সেটাই হস্তক্ষেপের একটা বাস্তব উদাহরণ হলেও ওপরে যা যা ফিরিস্তি দেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেও যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওপর হস্তক্ষেপ করবে, সেটা পরিষ্কার।
ফলে ওপরের আলোচনা থেকে এটা পরিষ্কার যে বিএনপি যদি এই মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল না করে, তাহলে তারা নিজেদের দেওয়া নির্বাচনী ইশতেহারেরই চরম বরখেলাপ করবে। এই চুক্তি অনতিবিলম্বে সংসদে তুলে বাতিল করার ব্যবস্থা তাই সরকারকে করতে হবে।
মাহতাব উদ্দীন আহমেদ লেখক ও গবেষক। সদস্য, গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি
