মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসছেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং

fec-image

অং সান সুচির নেতৃত্বাধীন এনএলডি সরকারকে উৎখাতের ছয় মাসের মাথায় মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসছেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। জান্তা সরকার নিজেদের এখন স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল বলে থাকে। তাদের পক্ষ থেকে রোববার এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মিন অং হ্লাইংকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের (কেয়ারটেকার সরকার) প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করা হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এদিকে রোববার এক টেলিভিশন ভাষণে আগামী দুই বছরের মধ্যে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার এবং নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং। ২০২৩ সালের আগস্টের মধ্যে দেশটিতে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে দেশটিতে সেনাশাসনের সময় আরও দুই বছর বাড়িয়ে দেওয়া হলো।

গত ১ ফেব্রুয়ারি সেনা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসে সামরিক জান্তা। তারা সু চির বিরুদ্ধে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনে। তবে ওই অভিযোগ নাকচ করে দেয় মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশন। এরপর থেকে দেশটিতে শুরু হয় সামরিক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থানের পর থেকে ভিন্নমত দমন করতে ৯৩৯ জনকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা হত্যা করেছেন বলে অভিযোগ করেছে দ্য অ্যাসিস্ট্যান্ট অ্যাসোসিয়েশন ফর পলিটিক্যাল প্রিজনারস। এ ছাড়া ৬ হাজার ৯৯০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

সম্প্রতি দেশটিতে ব্যাপকভাবে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বেড়েছে। জান্তাবিরোধী বিক্ষোভের অংশ হিসেবে অনেক চিকিৎসক হাসপাতাল ছেড়েছেন। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশটির অর্থনীতি ১৮ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

টেলিভিশন ভাষণে মিন অং হ্লাইং বলেছেন, ‘২০২৩ সালের আগস্টের মধ্যে আমরা দেশের জরুরি অবস্থা তুলে নেব। কোনো রকম ব্যর্থতা ছাড়াই এই সময়ের মধ্যে বহুদলীয় নির্বাচন আয়োজন করব।’

এএফপি জানিয়েছে, জান্তা প্রধানের এই ঘোষণা মিয়ানমারকে আরও অন্তত দুই বছর সেনাবাহিনীর দখলে রাখবে। এর আগে ক্ষমতা দখলের সময় এক বছরের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

জান্তা সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমতা দখলের বিষয়টিকে বৈধতা দিতে সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির বিরুদ্ধে ২০২০ সালের নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনা হয়েছে। দলটিকে বিলুপ্ত করার হুমকিও দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে ওই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল ঘোষণা করে জান্তা। দাবি করা হয়, ওই নির্বাচনে ১ কোটি ১০ লাখ ভোট জালিয়াতি করা হয়েছে।

দেড় দশকের গৃহবন্দিত্বের পর ২০১০ সালের নভেম্বরে মুক্ত হন সু চি। এরপর ২০১৫ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে তাঁর দল এনএলডি। ওই সরকারের স্টেট কাউন্সিলর হন সু চি। পাশাপাশি মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০২০ সালের নির্বাচনে আবার জয় পায় তাঁর দল। তবে ওই নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী।

এরপর ফেব্রুয়ারির শুরুর থেকেই বন্দী রয়েছেন অং সান সু চি। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, করোনভাইরাসের বিধিনিষেধ ভঙ্গ থেকে শুরু করে অবৈধভাবে ওয়াকিটকি আমদানির অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর এক দশকের বেশি সময় কারাদণ্ড হতে পারে।

রোববার মিয়ানমারজুড়ে ছোট ছোট দলের বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। সেনা অভ্যুত্থানের ছয় মাস পূর্তির প্রাক্কালে জান্তার বিরুদ্ধে রাজপথে নামেন দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

হাজার হাজার সরকারি কর্মচারী ও অন্য কর্মীদের বিক্ষোভ সমাবেশে যোগদানের জন্য বরখাস্ত করেছে জান্তা সরকার। নিউইয়র্কভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে জানায়, মিয়ানমারের সেনাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানুষের ওপর সশস্ত্র দমন-পীড়ন চালাচ্ছে জান্তা। আটক বিরোধীপক্ষের ওপর চালানো হয়েছে নির্যাতন। অনেককে হত্যা করা হয়েছে, যা মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

রোববার মিয়ানমারে মার্কিন দূতাবাসের পক্ষ থেকে এক ফেসবুক পোস্টে বলা হয়, ‘সেনা অভ্যুত্থানের ছয় মাস পূর্তির মধ্যে মিয়ানমারের জনগণ অভূতপূর্ব সাহস ও ব্যাপক সহিংসতার মুখে দৃঢ় প্রত্যয় দেখিয়েছে। মিয়ানমারের জনগণকে তাদের নিজস্ব পছন্দের গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষায় সমর্থন করতে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’

সূত্র: প্রথম আলো

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − eleven =

আরও পড়ুন