মিয়ানমারে সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তুতি সু চি’র দলের

fec-image

মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দল অং সাং সূ চি’র নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি (এনএলডি) দেশের সংবিধান পরিবর্তন করার দুঃসাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরিবর্তনের বিষয়গুলো এখনো পার্লামেন্ট ও জনসাধারণের কাছে প্রকাশ করা না হলেও তাতে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের ঘষামাজা চলছে।

দলের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, সংবিধান সংস্কার করার মাধ্যমে এনএলডি তার ২০১৫ সালের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই কেবল পূরণ করছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে ২০২০ সালের আসন্ন নির্বাচনের প্রস্তুতিকে সামনে রেখে।

তবে বেসামরিক সরকার যেসব পরিবর্তন আনছে এবং এ জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে, তাতে সামরিক বাহিনী ক্ষুব্ধ হতে পারে এবং দুই পক্ষের মধ্যে ক্রুদ্ধ সঙ্ঘাত অনিবার্য বলেই মনে হচ্ছে।

সরকারি সূত্রের ভাষ্যমতে, সামরিক বাহিনীকে বিপুল রাজনৈতিক শক্তি দেয়া সংবিধানের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলো পরিবর্তনের চূড়ান্ত ধাপ হিসেবে গণভোটের জন্যও প্রস্তুতি চলছে।

ইউনিয়ন নির্বাচন কমিশন (ইউইসি) গণভোটের জন্য ভোটার তালিকা তৈরি করছে। সংবিধান পরিবর্তনের এই সাহসী উদ্যোগের লক্ষ্য হলো সামরিক বাহিনীর শক্তি হ্রাস করা।

স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির প্রশাসনের প্রাথমিক বছরগুলোতে পাঙলঙ নামে পরিচিত শান্তিপ্রক্রিয়ার দিকেই বেশি মনোযোগী হয়েছিলেন। কিন্তু সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনে তেমন কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি ক্রমবর্ধমান হারে হতাশ হয়েছেন। ফলে তিনি পরিবর্তনের প্রধান বাহন হিসেবে পার্লামেন্টের দিকে নজর দিয়েছেন।

এ কারণে চলতি বছরের প্রথম দিকে সরকার সংবিধান পর্যালোচনা ও সংশোধনের পরামর্শ দিতে একটি যৌথ পার্লামেন্টারি কমিটি গঠন করেন।

সংবিধান পরিবর্তনের এই নতুন উদ্যোগ কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনায় ছিল। আর সরকারের নেতা স্টেট কাউন্সিলর কোন রাখঢাক না করেই সম্ভব হলে নির্বাচনের আগেই সংবিধানের পরিবর্তন আনার ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছেন। উল্লেখ্য, আগামী ২০২০ সালের নভেম্বরে ওই নির্বাচন হতে পারে। তবে এখনো তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।

গত বছরের শেষ দিক থেকে সংবিধানে পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিতে থাকেন সু চি। দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতা কেবল অভ্যন্তরীণ আলোচনা সম্পর্কে অবগত ছিলেন। অবশ্য সু চি তার পদক্ষেপের বিষয়টি সেনাবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং লাইংকে অবগত করেছেন। ২০১৬ সালের মার্চে ক্ষমতা গ্রহণের প্রাক্কালে দুই পক্ষের মধ্যে হওয়া সমঝোতার আলোকে তিনি এই পরিবর্তনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

সু চি প্রথম দুই বছরের মধ্যে সংবিধান পরিবর্তন করার চেষ্টা না করার ব্যাপারে রাজি হয়েছিলেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে সরকারি পরিকল্পনা সম্পর্কে সেনাপ্রধানকে আগেই অবহিত করা হবে। আলোচনার সাথে সম্পর্কিত সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে।

এখন চার মাস আগে গঠিত পার্লামেন্টারি কমিটি তার প্রতিবেদন চূড়ান্ত করছে, আগামী মাসে পার্লামেন্টর অধিবেশনে এমপিদের কাছে তা প্রকাশ করা হবে।

তখন প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিতর্ক হবে, সংশোধিত বিলের খসড়া প্রণয়নের দায়িত্ব বর্তাবে।

কমিটির সদস্য

৪৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি সব রাজনৈতিক দল ও সামরিক বাহিনীর প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত। সামরিক বাহিনী, সেনাপন্থী ও এস্টাবলিশমেন্ট পার্টি ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি কমিটি গঠনে আপত্তি করেছিল। তারা প্রথম দিকে এর অংশ হতেও অস্বীকার করেছিল এই যুক্তিতে যে এটি সংবিধান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া অনুসরণ করে গঠিত হয়নি। কিন্তু পরে তারা ওই অবস্থান থেকে সরে এসে কমিটিতে যোগ দেয়।

সামরিক বাহিনী প্রথমে মনে করেছিল এনএলডি আলাদাভাবে সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করবে। এতে সামরিক বাহিনী আক্রান্ত হলে তারা ভেটো প্রয়োগ করবে বলে মনে হচ্ছিল। এই ভেটো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সংশোধনী পাস করতে হলে ৭৫ ভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রয়োজন।

কিন্তু সু চি কৌশল পরিবর্তন করে গণভোটের দিকে যাচ্ছেন। ফলে সামরিক বাহিনীর হুমকি নিস্ফল হয়ে গেছে।

বড় ধরনের পরিবর্তন

কমিটি সংবিধানের ১৫টি অধ্যায়ের সবই পর্যালোচনা করেছে। এমনকি কর সংগ্রহ, আঞ্চলিক আইন পরিষদ, স্বচালিত অঞ্চলসহ অন্যান্য বিষয়ও পর্যালোচনা করেছে বলে কমিটর সচিব ও পার্লামেন্টের উচ্চ কক্ষের এমপি ময়াত নইয়ানা সো জানিয়েছেন।

কিছু কিছু সংশোধনী স্রেফ পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরেই পাস হতে পারে। যেমন অঞ্চল ও রাজ্যগুলোকে আরো বেশি স্বায়ত্তশাসন দেয়া, প্রেসিডেন্টের সরাসরি নিয়োগের বদলে স্থানীয় পার্লামেন্টের মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনের ব্যবস্থা। এগুলো নিশ্চিতভাবেই সংশোধিত হবে।

তবে কিছু বিরোধপূর্ণ ধারা আছে, যেগুলোর জন্য ৭৫ ভাগ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন এবং এরপর তা গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হবে। এগুলোর মধ্যে আছে ধারা ৪৩৬। এতে পার্লামেন্টে সামরিক বাহিনীকে ২৫ ভাগ আসন দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা কার্যত ভেটো শক্তির অধিকারী হয়েছে। সেনাপ্রধানই সীমান্ত রক্ষা মন্ত্রী, প্রতিরক্ষা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, ও একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট মনোনীত করেন।

ফলে মিয়ানমারের বর্তমান সংবিধান যেকোনো বেসামরিক সরকারের জন্য প্রতিবন্ধকতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

প্রাগের চার্লস ইউনিভার্সিটিতে চ্যালেঞ্জ অব ট্রানজিশন শীর্ষক সাম্প্রতিক বক্তৃতায় সু চি বলেছেন, ২০০৮ সালে সংবিধান সত্যিকারের কার্যকর গণতান্ত্রিকব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বাধা দিচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবেই বিচার বিভাগীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিয়ানমারের সংবিধান হলো বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন।

আইন পরিষদে সংবিধান সংশোধনের বিরোধিতা প্রত্যাশিত হলেও এনএলডির সংবিধান পরিবর্তনে জনগণের স্বার্থের বিষয়ে উৎসাহিত বলে তিনি জানান।

ফলে মনে হচ্ছে, এসব ইস্যুতে পার্লামেন্টে সামরিক বাহিনীর ভোট শক্তিও এনএলডিকে সংবিধান পরিবর্তন করে সেনাবাহিনীর রাজনৈতিক শক্তি খর্ব করার পরিকল্পনা থেকে পিছু হটাতে পারবে না।

তবে পরবর্তী কৌশল কী হবে তা নিয়ে সিনিয়র এনএলডি কর্মকর্তা ও এমপিরা কিছুই বলছেন না। সরকার বিতর্কিত পরিবর্তনগুলো পরিবর্তন নিয়ে সরাসরি জনগণের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মনে হচ্ছে, ২০২০ সালের নির্বাচনের সাথে সামঞ্জস্য রেখেই গণভোট হবে। এটি দলকে গতিশীলতা দিতে সহায়ক হবে। তাছাড়া নির্বাচনে এনএলডির প্রার্থীরাও ভোটারদের উদাসীনতা দূর করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারবে।

তবে সরাসরি গণভোটের ব্যবস্থা করাটা সংবিধানসম্মত হবে কিনা তা নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

এক্ষেত্রে সরকার পার্লামেন্টে কেবল সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে পারে। এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন দুই বছর আগে নিহত হওয়া প্রখ্যাত আইনজীবী কো নি। নিহত হওয়ার সময় তিনি ছিলেন সু চির ঘনিষ্ঠ আইন উপদেষ্টা।

তবে সামরিক বাহিনী এই পরিবর্তনের ব্যাপারে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। দলের সিনিয়র সদস্যসহ অনেকেই মনে করছে, দুই পক্ষের মধ্যে এ নিয়ে উত্তেজনাকর বিতর্ক হতে পারে।

তবে বাস্তবতা হচ্ছে, সংবিধান পরিবর্তন কমিটির সামরিক বাহিনীর সদস্যরা মাঝপথে ওয়াক-আউট করেনি। তারা এখনো একটি সমঝোতার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সামরিক বাহিনীর ২৫ ভাগ আসন এখনই পুরোপুরি বাতিল না করে ধীরে ধীরে কমানোর প্রস্তাব করছে এনএলডি। আগামী তিন নির্বাচনে বা ১৫ বছরে তাদের আসন পর্যায়ক্রমে কমানোর প্রস্তাব বিবেচনা করা হচ্ছে।

আর সামরিক বাহিনীর মনোনীত তিন মন্ত্রী পদেও পরিবর্তন আসবে না। স্বায়ত্তশাসনের জন্য জাতিগত সশস্ত্র গ্রুপগুলোর লড়াই অব্যাহত থাকায় ওই তিন পদে সামরিক বাহিনীর মন্ত্রীর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।

সামরিক বাহিনী-বেসামরিক ভারসাম্য

তবে সমঝোতার বিনিময়ে সামরিক বাহিনী কী চায় তা এখনো তেমন পরিস্কার নয়। আলোচনার মাধ্যমে বর্তমান কমান্ডার-ইন-চিফের প্রস্থান কৌশল নির্ধারিত হতে পারে কিংবা তাকে চীনা সামরিক কমিশনের মতো কোনো জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধানের ভূমিকা দেয়া হতে পারে।

সামরিক বাহিনীর দাবিনামা এখনো পরিস্কারভাবে সামনে না এলেও বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক (ইতিমধ্যেই তা সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে গেছে) ক্রমবর্ধমান হারে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।

সূত্র: সাউথএশিয়ানমনিটর.কম

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

17 − thirteen =

আরও পড়ুন