মুহিবুল্লাহ কিলিং স্কোয়াডের ৪ সদস্য গ্রেফতার, মিলেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য

fec-image

রোহিঙ্গাদের শীর্ষ নেতা ও আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের (এআরএসপিএইচ) চেয়ারম্যান মুহিবুল্লাহ হত্যার ঘটনায় চারজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন আজিজুল হক। তিনি সশস্ত্র সন্ত্রাসী এবং কিলিং স্কোয়াডের সক্রিয় সদস্য।

শনিবার (২৩ অক্টোবর) ভোর ৪টার দিকে লাম্বাশিয়া পুলিশ ক্যাম্পের অধীন লোহার ব্রীজ এলাকা থেকে আজিজুল হককে গ্রেফতার করে এপিবিএন সদস্যরা। এ সময় তার নিকট থেকে ১টি ওয়ান শুটারগান এবং ১ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে তার প্রদত্ত তথ্য মতে আরও ৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

তারা হলেন- ব্লক-ডি-৮, ক্যাম্প- ১/ইস্ট এর আব্দুল মাবুদের ছেলে মো. রশিদ প্রকাশ মুরশিদ আমিন, ব্লক-বি, ক্যাম্প-১/ওয়েস্ট এর ফজল হকের ছেলে মো. আনাছ এবং ব্লক-বি, ক্যাম্প-১/ওয়েস্টের নুর সালামের ছেলে নুর মোহাম্মদ।

এদিকে, মুহিবুল্লাহ কিলিং স্কোয়াডের সদস্য আজিজুল হককে গ্রেফতারের পর প্রেস ব্রিফিং ডেকে বিস্তারিত প্রকাশ করেছেন ১৪ আমর্ড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) অধিনায়ক এসপি মো. নাইমুল হক। এ সময় মুহিব্বুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের চাঞ্চল্যকর তথ্যও দেন তিনি।

অধিনায়ক এসপি মো. নাইমুল হক বলেন, কিলিং মিশনে অংশ নেয়া ধৃত আসামি আজিজুল হক জিজ্ঞাসাবাদে জানায়, মাস্টার মহিবুল্লাহকে হত্যার দুইদিন আগে অর্থাৎ ২৭ সেপ্টেম্বর রাত অনুমান ১০টায় লাম্বাশিয়া মরকজ পাহাড়ে একটি মিটিং হয়। ওই মিটিংয়ে কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া ধৃত আসামি আজিজুল হকসহ আরও ৪ (চার) জন উপস্থিত ছিল। তথাকথিত দুর্বৃত্তদের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ মহিবুল্লাহকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছে মর্মে ওই মিটিং এ আলোচনা হয়। কারণ হিসেবে বলা হয় যে, মাস্টার মহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের বড় নেতা হয়ে উঠেছে। রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন সংক্রান্তে বিশেষ ভূমিকা পালন করায় দিনে দিনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়ে উঠেছে। তাকে থামাতে হবে। পরবর্তীতে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী এশার নামাজের পর মাস্টার মহিবুল্লাহ তার শেডে ফিরে গেলে মুরশিদ আমিন তাকে নিজ শেডের বাইরে ডেকে নিয়ে প্রত্যাবাসন বিষয়ে কথা বলে এবং কিছু লোক তার সাথে অফিসে কথা বলবে মর্মে অফিসে ডেকে নিয়ে যায়।

তারপর ধৃত আসামি মুরশিদ আমিন মহিবুল্লাহর নিজ অফিসে অবস্থান সম্পর্কে ধৃত অপর দুই আসামি মো. আনাছ ও নুর মোহাম্মদ এর নিকট নিশ্চিত করে অফিস এলাকা দ্রুত ত্যাগ করে। এ দুইজনই মাস্টার মহিবল্লাহকে হত্যা করার জন্য দুর্বৃত্তদের ঘটনাস্থলে আসার সংকেত প্রদান করে। দুর্বৃত্তদের দলটি ১/ডব্লিউ সিআইসি অফিসের পাশে আরটিসিসি অফিস সংলগ্ন সি/৮ ব্লকের মধ্য দিয়ে চিকন গলি ব্যবহার করে কুইয়া বাগানের (পেঁপে বাগান) দিকে একটি শেডে আগে থেকেই অবস্থান করছিল। ধৃত আসামীদের নিকট হতে সংকেত পাওয়ার পর পূর্ব হতে অবস্থান নেওয়া দুর্বৃত্তদের দলটি ক্যাম্প ১/ইস্ট এর ডি/৮ ব্লকের রাস্তা ব্যবহার করে মাস্টার মহিবুল্লাহর অফিসে চলে আসে।

এ সময় মুখোশধারী ৭ জন তাদের সঙ্গ নেয়। দুর্বৃত্তদের দলটির মধ্য থেকে ৩ জন অস্ত্রধারী মহিবুল্লাহর অফিস কক্ষের ভিতরে প্রবেশ করে। এ সময় মো. আনাছ এবং নুর মোহাম্মদ অপর অস্ত্রধারী আসামী আজিজুল হক ও অপর একজন অস্ত্রধারীসহ মোট ৪ জন মহিবুল্লাহর অফিস কক্ষের প্রবেশ দরজায় অবস্থান নেয়। ঘটনার সময় মাস্টার মহিবুল্লাহ ১০/১৫ জন লোকসহ তার অফিস রুমে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসেছিলেন। এ সময় অফিস কক্ষে প্রবেশকারী অস্ত্রধারীদের মাঝে একজন মাস্টার মহিবুল্লাহকে বলেন “মহিবুল্লাহ উঠ।” মহিবুল্লাহ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালে মোট ৪টি গুলি করে। গুলিবিদ্ধ হয়ে মাস্টার মহিবুল্লাহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। হত্যার মিশন শেষে আজিজুল হক, মো. আনাছ এবং নুর মোহাম্মদসহ বাকি সন্ত্রাসীরা মহিবুল্লাহর অফিস সংলগ্ন পিছনের রাস্তা দিয়ে পেঁপে বাগান হয়ে পালিয়ে যায়।

হত্যাকাণ্ডের পরে দৃর্বৃত্তরা পুলিশের গ্রেফতার এড়ানোর জন্য ভিন্নভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে চলে যায় এবং সকলেই নিজ নিজ মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেয়। কিলিং স্কোয়াডে ৫ জন অস্ত্রধারী ছিল। যারা মাত্র ২ মিনিটেই মুহিবুল্লাহর হত্যার মিশন শেষ করে পালিয়ে যান। এ হত্যাকাণ্ডে সর্বমোট ১৯ জন কাজ করেছে। হত্যাকাণ্ডটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পিত।

অধিনায়ক মো. নাইমুল হক বলেন, মুহিব্বুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পরপরই আইজিপির নির্দেশক্রমে ‘ছায়াতদন্ত’ পরিচালনা করে ১৪ এপিবিএন। তারা ইতোমধ্যে ৪ জন সন্দিগ্ধ আসামি গ্রেফতার করে। তন্মধ্যে গ্রেফতারকৃত আসামি মো. ইলিয়াস বিজ্ঞ আদালতে ফৌঃ কাঃ বিঃ ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি প্রদান করে।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্প-১ ইস্ট-ওয়েস্ট (ডি ব্লকে) নিজ অফিসে অবস্থান করছিলেন মুহিবুল্লাহ। এ সময় বন্দুকধারীরা গুলি করে তাকে হত্যা করেন। এখন পর্যন্ত এ হত্যা মামলায় ৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়। তার মধ্যে মোহাম্মদ ইলিয়াছ নামে একজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, মুহিবুল্লাহর মূল উত্থান হয় ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা আগমনের বর্ষপূর্তিতে। ওই দিন তিনি লাখো রোহিঙ্গার সমাবেশ ঘটিয়ে আলোচনার তুঙ্গে এনেছিলেন নিজেকে। সেদিন তার নেতৃত্বে ছিলো ৩ থেকে ৫ লাখ রোহিঙ্গার মহাসমাবেশ। এরপর তিনি উখিয়া-টেকনাফের ৩২ রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগে দক্ষ মুহিবুল্লাহ ধীরে ধীরে প্রিয়পাত্র হয়ে ওঠেন। মাস্টার মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের পরপরই রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় সাড়াশী অভিযান পরিচালনা করে আসছে এপিবিএন সদস্যরা।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রফিকুল ইসলাম জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সমন্বিতভাবে কাজ করছেন। ইতোমধ্যে হত্যায় জড়িত ৪ জন গ্রেফতার হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। তিনি জানান, মাস্টার মহিবুল্লাহ হত্যার সাথে জড়িতদের গ্রেফতারে প্রশাসন কঠোর। শুক্রবার ভোরে ৬ রোহিঙ্গাকে ব্রাশফায়ারে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত আছে। কোন অপরাধী পার পাবে না।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × five =

আরও পড়ুন