মেজর সিনহা হত্যার অভিযোগপত্র: আগেই ‘হুমকি দিয়েছিলেন ওসি প্রদীপ’, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

fec-image

গত ৩১শে জুলাই কক্সবাজারের টেকনাফে পুলিশের গুলিতে নিহত হন সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। বাংলাদেশে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে (রোববার) আদালতে চার্জশিট জমা দেয়া হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের চার মাস পর আদালতে আজ এ মামলার চার্জশিট বা অভিযোগপত্র জমা দেন র‌্যাবের তদন্তকারী কর্মকর্তা। হত্যার আগে ‘গোপন বৈঠকে টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার তাকে হত্যার মূল পরিকল্পনা করে’ বলেও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানায় র‌্যাব।

চার্জশিটের বিষয় নিয়ে দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলন র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ এসব কথা জানিয়েছেন।

এর আগে সকালে কক্সবাজার আদালতে ২৬ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দেন র‍্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, অভিযোগ পত্রে ১৫ জনকে আসামী করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৪ জনকেই গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তারা এখন কারাগারে রয়েছে।

এদের মধ্যে রয়েছেন টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমার, বাহারছড়া ক্যাম্পের বরখাস্তকৃত পরিদর্শক লিয়াকত আলী, এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, টেকনাফ থানার কয়েক জন পুলিশ সদস্য, আর্মড ব্যাটালিয়ন পুলিশের তিন সদস্য, স্থানীয় তিন বাসিন্দা, এবং বাকি একজন পলাতক। তিনি টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত ওসি প্রদীপ কুমারের দেহরক্ষী সাগর দেব।

কারাগারে থাকা ১৪ জনের মধ্যে ১২ জন স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছে।

গত ৩১শে জুলাই রাতে কক্সবাজারের একটি পুলিশ চেকপোস্টে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোঃ রাশেদ। সেই ঘটনায় পুলিশ দুইটি মামলা করে।

পাঁচই অগাস্ট এই ঘটনায় নয়জন পুলিশ সদস্যকে অভিযুক্ত করে আদালতে একটি হত্যা মামলা করেন মেজর (অব) সিনহার বোন শারমিন শাহরিয়ার। এই মামলা ও পুলিশের মামলা দুইটির তদন্তভার র‍্যাবকে দেয়া হয়। এর পরের দিন অর্থাৎ ৬ই অগাস্ট ওসি প্রদীপ ও লিয়াকতসহ ৭ জন আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

চার্জশিটে কী আছে?

র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আশিক বিল্লাহ সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ পত্রের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।  তিনি বলেন, মেজর সিনহা হত্যার ঘটনায় সব মিলিয়ে মোটি ৪টি মামলা দায়ের করা হয়। আদালতের নির্দেশনায় সব গুলো মামলার তদন্ত করে র‍্যাব।

এর মধ্যে একটি মামলা টেকনাফ থানায় মাদক সংক্রান্ত যা শহীদুল ইসলাম সিফাতকে আসামী করা হয়, পুলিশ ও সরকারি কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে মেজর সিনহা এবং সিফাতের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়। আরেকটি মামলা রামু থানায় শিপ্রা দেবনাথকে আসামী করে দায়ের করা হয়।

এই মামলা তিনটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন আদালতে দেয়া হয়েছে। সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় এবং মামলার স্বপক্ষে কোন সাক্ষী প্রমাণ না থাকায় তাদের দায়মুক্তি দেয়ার জন্য চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। চার নম্বর মামলাটি সিনহা মো. রাশেদ খানের বড় বোন টেকনাফ আদালতে দায়ের করেন যা র‍্যাবের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

এই হত্যাকাণ্ডের মামলা র‍্যাবের সহকারী পুলিশ সুপার খায়রুল ইসলাম তদন্ত করেন। চার মাস ১০ দিন সময় নিয়ে এই মামলার তদন্ত করে এরইমধ্যে অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। এতে সর্বমোট ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জ গঠন করা হয়েছে। এদের মধ্যে ৯ জন টেকনাফ থানার বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য, ০৩ জন এপিবি এর সদস্য এবং ০৩ জন বেসামরিক ব্যক্তি।

কনস্টেবল সাগর দেব নামে একজন পলাতক রয়েছেন। এছাড়া দুজনকে নাম-ঠিকানা সঠিক না থাকার কারণে তাদের অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ১২ জন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন বলে অভিযোগ পত্রে বলা হয়েছে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা ৮৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়েছেন। বিভিন্ন ধরণের আলামত ও ডিজিটাল কন্টেন্ট আমলে এনে হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযোগপত্র প্রদান করেছে।

কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন., বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন সাক্ষী, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষী, আলামত, জবানবন্দি নিয়ে নিশ্চিত হয়েছেন যে, এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।এর মূল পরিকল্পনাকারী টেকনাফ থানার তৎকালীন ওসি প্রদীপ কুমার দাস। তিনি হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত বিষয়গুলোকে ধামাচাপা ও ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করেছেন।

ঘটনাপ্রবাহ কী ছিল?

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জুলাই মাসের ৭ তারিখে সিনহা মো. রাশেদ খান, শিপ্রা দেবনাথ, সিফাত ও রুফতি নীলিমা রিসোর্টে অবস্থান করে। সেসময় ইউটিউবে একটি ভিডিও চ্যানেল নিয়ে কাজ করার সময় আঞ্চলিক বাসিন্দাদের সাথে তাদের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

কর্নেল আশিক বিল্লাহ বলেন, সেখানে সাধারণ মানুষের সাথে মিশে গিয়ে তাদের জিম্মি হওয়া, অত্যাচারের ঘটনা সম্পর্কে তিনি জানতে পারেন যা মেজর সিনহাকে পীড়িত করে।

অভিযোগ পত্রে বলা হয়, কক্সবাজারের টেকনাফ ওসি প্রদীপের অভয়ারণ্য ছিল। কথিত রাজ্য ছিল। মূলত এই স্বেচ্ছাচারিতা, আইন অমান্য করে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, এবং তার ব্যবসা বাণিজ্যের জন্য সিনহা ও তার সঙ্গীরা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ওসি প্রদীপ সরকারি অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার করেছেন এবং ইয়াবা কেন্দ্রিক বাণিজ্যের সাথে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়।

এসব বিষয়ে ওসি প্রদীপের কাছে জানার জন্য ক্যামেরা ও ডিভাইসসহ তারা তিনজন (সিনহা, শিপ্রা ও সিফাত) যখন থানায় যায়।

র‌্যাবের অভিযোগপত্রে বলা হয়, থানায় তাদেরকে অনতিবিলম্বে টেকনাফ বা কক্সবাজার ছেড়ে যেতে বলা হয়। তা না হলে “তোমাদের আমি ধ্বংস করে দেবো” বলে হুমকি দেয়া হয়।

শিপ্রা ও সিফাতের বক্তব্যে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ল্যাপটপে স্পর্শকাতর কিছু ছিল। তবে সেগুলো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

তবে ওসি প্রদীপের হুমকি উপেক্ষা করে কাজ চালিয়ে যাওয়ার কারণেই ষড়যন্ত্র করে মেজর সিনহাকে হত্যা করা হয়েছে বলে বলছে র‌্যাব।

৩১শে জুলাই রাতে হত্যাকাণ্ডের কিছুক্ষণ পরেই প্রদীপ কুমার দাশ যখন ঘটনাস্থলে যান, তখনো মেজর সিনহা জীবিত ছিলেন।

র‌্যাব বলছে, ওসি প্রদীপ তখন তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পরে লোক দেখানো ভাবে তাকে একটি হাসপাতালে নেয়া হয়। ওই রাতেই তার মাকে ফোন করা হয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ওসি প্রদীপ, মেজর সিনহা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

fourteen − 10 =

আরও পড়ুন