মেটাভার্স কী এবং মেটাভার্স বিশ্বে কী পরিবর্তন আনতে চলেছে

fec-image

ধরে নিন, কোনো না কোনো ব্যস্ততার কারণে আপনি টি- টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলা দেখতে আরব আমিরাতে যেতে পারেননি। কিন্তু তাতে, কোনো সমস্যা নেই। আগামী দিনে আপনার আর যাওয়ার প্রয়োজনও হবে না। কেননা আপনি চাইলেই ঘরে বসে শারজাহ বা দুবাইয়ের স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার অবিকল আনন্দ ও অভিজ্ঞতা পেতে পারেন ঘরে বসেই। কিম্বা ধরুন আপনি মার্কিন কোনো বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে একটি পোশাক কিনতে চান। আগামী পাঁচ বছর পরে বাংলাদেশে বসেই আপনি সেই পোশাক গায়ে দিয়ে দেখে পছন্দ করে তারপর অর্ডার দিতে পারবেন।

আপনার বন্ধু সাজেক ভ্রমণে যাচ্ছে, কিন্তু আপনি যেতে পারছেন না। তাতেও সমস্যা নেই। আপনি চাইলেই সশরীরে সাজেক না গিয়েও বন্ধুর সাথে সাজেক ভ্রমণের অভিজ্ঞতা পেতে পারবেন ঘরে বসেই। কোভিডের কারণে এখন যে অনলাইন ক্লাস হচ্ছে সেখানে আপনি শিক্ষকদের সামনাসামনি দেখতে পারছেন, কিন্তু খুব শীঘ্রই এমন দিন আসছে যখন বাংলাদেশে বসেই হার্ভাড, অক্সফোর্ডের ক্লাস রুমে বসে বন্ধুদের সাথে ক্লাস করার অভিজ্ঞতা পাবেন। অথবা আপনি বিশ্বের নামকরা কোনো ডাক্তারের দেখাতে চান নিজের ধরে বসে। ডাক্তার আপনার সামনে হাজির। আপনার গায়ে হাত দিয়ে পালস, ব্লাড প্রেসার মেপে দেখছে। এমনকি সার্জারির দরকার হলে তাও করে দিচ্ছে।

শুনলে অবাক হবেন, আপনার মৃত্যুর পর আপনার সন্তান আপনার সাথে কথা বলতে চাইলে, সময় কাটাতে চাইলে সেটাও সম্ভব হবে খুব বেশী দেরি নেই। আপনি এই যে প্রতিদিন অনলাইনে দীর্ঘ সময় ব্যয় করছেন, আপনার সব আচরণ, কর্মকাণ্ড গুগল. ফেসবুক রিয়েল টাইমে সংরক্ষণ করছে। আপনার মৃত্যুর পর যখন আপনার সন্তান আপনাকে স্মরণ করবে তখনই আপনি এসে সন্তানের পাশে বসে গল্প করতে পারবেন। গুগল, ফেসবুক তাদের সংরক্ষিত তথ্য থেকে আপনার আচরণ, বক্তব্য আপনার ভয়েসে আপনার সন্তানের প্রশ্নের উত্তর দিতে সহায়তা করবে।


লেখকের আরো লেখা-

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইনসার্জেন্সি মোকাবিলায় আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে


আজকের সময়ে অনেকের কাছেই এটা আজগুবি, গাঁজাখুরি মনে হলেও সেই দিন খুব বেশী দুরে নয় যেদিন এসব কল্পনা বাস্তব হয়ে আপনার সামনে হাজির হবে। এবং যে প্রযুক্তি এই কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দেবে তার নাম মেটাভার্স- ইন্টারনেটের পরবর্তী সংস্করণ।

মেটাভার্স  কী

সামাজিক যোগাযোগ এর মাধ্যম ‘ফেসবুক’, ‘হোয়াটসঅ্যাপ’, ‘ইন্সটাগ্রাম’, ‘ম্যাসেঞ্জার’সহ ‘ওকুলাস’, ‘ম্যাপিলারী’, ‘ওয়ার্কপ্লেস’, ‘পোর্টাল’ এবং ‘ডিয়েম’ এর মতো আইটি খাতের ব্র্যান্ডগুলোর মালিকানায় থাকা মূল কোম্পানি Facebook Inc এর নাম গত ২৮ অক্টোবর ২০২১ তারিখে কোম্পানির সিইও মার্ক জাকারবার্গ কর্তৃক `Meta Platforms Inc’তে পরিবর্তনের ঘোষণা দেওয়ার পর হতে পৃথিবী জুড়ে ‘Mataverse’ নিয়ে নতুন আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।

১৯৯২ সালে বৈজ্ঞানিক কল্প কাহিনির লেখক নেইল স্টিফেনসন তাঁর “স্নো ক্রাশ” বইয়ে সর্ব প্রথম ‘মেটাভার্স’ শব্দটি ব্যবহার করেন। মেটাভার্স বলতে সাধারণত বুঝানো হতো এমন একটি অপার্থিব বাস্তবতার স্থান যেখানে ব্যবহারকারীরা কম্পিউটার দ্বারা সৃষ্ট পরিবেশ এবং অন্যান্য ব্যবহারকারীদের সাথে ভাব বিনিময় করতে সক্ষম। কিন্তু বর্তমানে মেটাভার্স বা মেটা- এর অর্থ ও পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। শুধু ভাব বিনিময় বা গেমিং এর মধ্যে তা সীমাবদ্ধ নয়।

ফেসবুক (বর্তমানে মেটা) সিইও মার্ক জাকারবার্গ বলেন “একটি কোম্পানির নামকরণ অনেক কঠিন, আমি ‘Meta’ নির্বাচন করেছি কারণ এই গ্রীক শব্দটির অর্থ হলো ‘Beyond’ ও এটা ‘Metaverse’ এর দিকে ইঙ্গিত করে।” জাকারবার্গ মেটাভার্স বলতে একটি নেটওয়ার্কভিত্তিক অপার্থিব মরুদ্যান বুঝাচ্ছেন, যেটা তিনি গড়ে তুলতে চাচ্ছেন। এবং এর অংশ হিসেবে তিনি কোম্পানির একটি নতুন পরিচয় তৈরী করতে চান, যা তাঁর কোম্পানি কী এবং তারা কী তৈরী করতে আশাবাদী নামেই  তা প্রতিফলিত করবে। জাকারবার্গের মতে “মেটাভার্স হলো একটি অনলাইন জগৎ যেখানে মানুষ খেলতে পারবে, কাজ করতে পারবে এবং যোগাযোগ করতে পারবে অপার্থিব পরিবেশে ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি (ভিআর) হেডসেটের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে।”

চায়নিজ প্রাযুক্তিক কোম্পানি এইচটিসি এর প্রেসিডেন্ট এ্যালভিন ওয়াং গ্রেইলিন এর মতে “মেটাভার্স হলো ভি আর প্রযুক্তিভিত্তিক একটি সমান্তরাল অপার্থিব জগৎ, সহজলভ্য হলে যেখানে শিক্ষা, ভ্রমণ, যোগাযোগসহ পার্থিব জগতের প্রায় সকল কাজ করা যাবে।” তিনি আরো যোগ করেন “মেটাভার্স সম্পর্কে এই নতুন ঝোঁক মানুষকে এসম্পর্কে অবহিত করবে, সবাই বুঝতে পারবে মেটাভার্স মানে শুধু গেমিং নয়, বরং আমাদের জীবনের অধিকাংশ বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত।”

মেটাভার্স উন্নয়নে কার অবস্থান কোথায়?

মেটাভার্স কি শুধুমাত্র একটি ফেসবুক প্রজেক্ট? না। অন্যান্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এনিয়ে কাজ করছে ও কথা বলছে, টেক জায়ান্ট মাইক্রোসফট এবং মাইক্রো চিফ প্রস্তুতকারক এনভিডিয়া এর কোম্পানিগুলো এর অন্তর্ভুক্ত। এনভিডিয়া এর ওমনিভার্স প্লাটফর্ম এর ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড কেরিস বলেন, “আমরা মনে করি মেটাভার্সের মাধ্যমে অসংখ্য কোম্পানি অপার্থিব জগৎ ও পরিবেশ তৈরি করছে, যেমনটা কোম্পানিগুলো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েভে(WWW.) করছে। এটা মুক্ত এবং বর্ধিতকরণযোগ্য হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি মুহুর্তে এক জগৎ থেকে অন্য জগতে যেতে পারেন, ঠিক ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েভে এক পেজ হতে অন্য পেজে যাওয়ার মতো।

কিছু কিছু ভিডিও গেমস্ কোম্পানিও সম্মুখ ভূমিকা নিচ্ছে মেটাভার্সের উন্নয়নে, এপিক গেমস্ বিনিয়োগকারীদের নিকট হতে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে মেটাভার্সে বিনিয়োগের জন্য। গেমস্ প্লাটফর্ম ববলক্স ও ইটালিয়ান ফ্যাশন হাউস গুচি এবং কোকাকোলা ও ক্লিনিক যৌথভাবে ভবিষ্যতে মেটাভার্সে পণ্য বিক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করছে।

টেক ড্রাগন চীনের প্রাচীরেও জাকারবার্গের এই তড়িঘড়ি নাম পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। প্রচারণায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ে চীনা সংবাদ মাধ্যম সিজিটিএন প্রচার করেছে এইচটিসি প্রেসিডেন্ট এ্যালভিন ওয়াং গ্রেইলিন এর সাক্ষাৎকার, যেটা জাকারবার্গের নাম পরিবর্তনের প্রচারণার চেয়েও অনেক বেশি পরিপাটি ও সহজবোধ্য এবং বাস্ততবিক। গ্রেইলিন মেটাভার্স নিয়ে তার মতামত প্রদানের পাশাপাশি চীনা কোম্পানিগুলোর অবস্থান বাস্তবিক ও নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, “বিশ্বের ৯৫ শতাংশ ভিআর ডিভাইস সরবরাহ করে চীন। একটি ছোট ভিআর চশমা নিজে প্রদর্শন করে গ্রেইলিন বলেন, এটা আমরা গত সপ্তাহে বাজারে এনেছি, আশাকরি তরুণরা ভারী ও বড় ডিভাইসের পরিবর্তে এটা অনেক বেশি পছন্দ করবে। তাঁর মতে চীন হার্ডওয়্যারে অনেক এগিয়ে আছে এবং সফটওয়্যার তৈরীতে এখনো পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা পিছিয়ে আছে, যেটা কাটিয়ে ওঠতে কিছুটা সময় লাগবে এবং চীন এই পার্থক্য দূর করতে সমর্থ হবে।

চীনের ৫০(!) মেটাভার্স কোম্পানির মধ্যে শীর্ষ হিসেবে এইচটিসি প্রেসিডেন্ট এর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে বলে সিজিটিএন উল্লেখ করে। সে অনুযায়ী বাইডেন্স এর মতো চায়নিজ টেক জায়ান্টগুলোতে কী চলছে চিন্তা করলে মেটাভার্স উন্নয়নে চীন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে না থাকলেও পিছিয়ে হয়তো নেই মোটেই। যদি প্রযুক্তি উন্নত এশীয় দেশ জাপান, ইসরাইল, দক্ষিণ কোরিয়া এবং পরাশক্তি রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানিসহ শিল্পোন্নত ইউরোপীয় দেশসমূহে মেটাভার্সের উন্নয়ন নিয়ে কিছু না কিছু হলেও চলছে বলে ধরে নিই, নিশ্চিতভাবে মানব সভ্যতা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত মেটাভার্সের ভিন্ন ভিন্ন অপার্থিব বাস্তবতার জগতসমূহে প্রবেশের অতীব সন্নিকটে। জাকারবার্গের ভাষ্যমতে, আমরা আগামী ৫-১০ বছরের মধ্যেই মেটাভার্সে প্রবেশ করবো।

মেটাভার্সে কী কী করা যাবে?

মেটাভার্সে সামগ্রিকভাবে কী কী করা যাবে তা মার্ক জাকারবার্গ ও এ্যাভলিন ওয়াং গ্রেইলিন এর প্রদত্ত মেটাভার্সের সংজ্ঞা বা ব্যাখায় ফুটে ওঠেছে। জাকারবার্গ তাঁর কোম্পানির নাম পরিবর্তনকারী বক্তব্যে আরো বিস্তারিত উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেন, মেটাভার্সে ভিআর হেডসেট/চশমা বা মোবাইলের নির্দিষ্ট অ্যাপস এর মাধ্যমে যুক্ত হয়ে আপনি পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা আপনার বন্ধুর সাথে সামনাসামনি বসে খেলার মতো করে দাবা খেলতে পারবেন, দূরদূরান্তের মিটিং ও কনসার্টে না গিয়েও ঠিক শরীরে হাজির হওয়ার মতোভাবে যোগ দিতে পারবেন, সুনির্দিষ্টভাবে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে থাকা কোন কাপড় পড়ে দেখতে পারবেন, ঘরে বসেই দূরদূরান্তের দাপ্তরিক কাজ সমূহ ঐ স্থানে হাজির থাকার আদলে শেষ করতে পারবেন।

পরবর্তীতে ফেসবুক (বর্তমানে মেটা) এর চিফ টেকনিক্যাল অফিসার মাইক শ্রোফফার ফেসবুক রিয়্যালিটি রিসার্চ ল্যাব এর একটি ভিডিও উদাহরণসহ ১৪ টুইটের একটি টুইট থ্রেড পোস্ট করে মেটাভার্স সম্পর্কে আরো সুনির্দিষ্ট ধারণা প্রকাশ করেন। শ্রোফফার এর টুইটের উল্লেখযোগ্য বিষয়াবলি হচ্ছে:

  • ♦   কিবোর্ড বা স্ক্রীন ব্যতীত টাইপিং, হাতের কবজিতে লাগানো ডিভাইস এর মাধ্যমে স্নায়বিক অবস্থা পর্যবেক্ষিত হয়ে টাইপ হয়ে যাওয়া।
  • ♦   বাস্তব অবস্থার থ্রিডি প্রতিরূপ সৃষ্টি করে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত হতে একত্রিত হয়ে ঘরে বসে সবাই একই অবস্থানে কাজ করতে পারা।
  • ♦  কোন সংস্পর্শ ব্যতীত শুধুমাত্র দৃষ্টির মাধ্যমে বস্তু নিয়ন্ত্রণ।
  • ♦   প্রতিটি ব্যক্তির জন্য পৃথক পৃথক কৃত্রিম সুপার মেমোরি চালু করা, যেখানে তার সমস্ত কর্মকাণ্ড ও তথ্য সংরক্ষিত থাকবে এবং সে কখনো কোন কিছু ভুলে যাবে না বা হারিয়ে ফেলবে না।
  • ♦  মানুষের হুবহু অপার্থিব বাস্তবিক প্রতিরূপ তৈরী করা এবং এর প্রতিটি কর্মকাণ্ড ও নড়াচড়া হবে বাস্তবের অনুরূপ। অর্থাৎ মেটাভার্সের মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর যুগে বাস্তবিকভাবে প্রবেশ করতে চলছে মানবজাতি।

বর্ণিত প্রতিটি ধারণায় এখনো পরীক্ষামূলক স্তরে রয়েছে ও অধিকাংশ পরীক্ষার ফলাফল এখনো অতোটা আশানুরূপ ভালো নয়। শ্রোফফার এর টুইটগুলোর বিপরীতে এক ব্যক্তি কত শত শত কোটি ডলার খরচ হবে এসব ডিভাইস বিশ্বব্যাপী সবার হাতে হাতে পৌঁছে দিতে প্রশ্ন করলে, শ্রোফফার জবাব দেন স্বল্পমূল্যে এগুলো সবার নিকট পৌঁছে দেওয়ার উপায় বের করা গবেষণার অন্যতম অংশ এবং এনাগাদ বড় ধরণের কোন প্রতিবন্ধকতা তাঁরা খুঁজে পাননি। ফেসবুক (বর্তমানে মেটা) এর চিফ টেকনিক্যাল অফিসারের এই উত্তর থেকেই পরিস্কার মেটাভার্সেও মূলতঃ প্রতিযোগিতা হবে মার্কিন ও চায়নিজ টেক জায়ান্টগুলোর মধ্যে, যেহেতু চীনের চেয়ে কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করতে পারার নজির বিশ্বে খুবই কম।

মেটাভার্স সহজলভ্য হলে জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করতে পারে?

মেটাভার্স সহজলভ্য হলে মানুষের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন সাধিত হবে। যানবাহন শিল্প ও সকল ধরনের পরিবহন (রেল, সড়ক, বিমান ও নৌ) ব্যবসায় এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হতে পারে এবং যানবাহন শিল্প ও পরিবহন ব্যবসার অকল্পনীয় পরিবর্তন সাধিত হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় দূর শিক্ষণ শিক্ষা লাভের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সহজলভ্য প্রক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে মেটাভার্স সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। পৃথিবীর এক প্রান্তে নিজের ঘরে অবস্থান করে অন্য প্রান্তের উন্নত চিকিৎসা লাভের দ্বার উন্মোচিত হবে। দাপ্তরিক কাজকর্ম ও নথিপত্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে দৃশ্যমান বস্তুর ব্যবহার অনেক কমে যাবে, বিশেষ করে কাগজ ও কলমের ব্যবহার। শারীরিক উপস্থিতি প্রয়োজন এ ধরনের অধিকাংশ কাজ ঘরে বসেই সম্পন্ন করা যাবে।

পর্যটন ও বিনোদন শিল্পের আঙ্গিকে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। সিনেমা হল, ট্যুরিস্ট গাইড, কাগজে ছাপানো পত্রিকা ইত্যাদির মতো বহু প্রতিষ্ঠান, বস্তু ও পেশা নিষ্প্রয়োজন হয়ে যেতে পারে। সমাজে ধর্মান্ধতা, কুসংস্কার ও সাম্প্রদায়িকতা দূরীকরণে মেটাভার্সের সৎ ব্যবহার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানুষ মেটাভার্সের আগমনে পুরোপুরি বৈশ্বিক নাগরিকে পরিণত হবে, সমাজের দৃশ্যমান আকারের চেয়ে অপার্থিব জগৎ বিদ্যমান আকার বহুগুণ বড় হবে এবং দৃশ্যমান সমাজ অপার্থিব জগতে বিদ্যমান সমাজ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে। মেটাভার্সের সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিচার এবং শাসন ব্যবস্থাকে গতিশীল করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনয়ন করে সাম্যতা প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর হবে।

মেটাভার্সের নেতিবাচক প্রভাব

মেটাভার্সের যে কোন ধরণের অপব্যবহার মারাত্মক বিপর্যয় ঘটিয়ে দিবে। যানবাহন ও পরিবহন খাতের পাশাপাশি মেটাভার্স সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করবে এমন আরো দুটি খাত হলো ব্যবসা ও বাণিজ্য। মেটাভার্সের আগমনে ব্যবসা ও বাণিজ্যের পদ্ধতিগত এবং কাঠামোগত অকল্পনীয় পরিবর্তন সাধিত হবে। ব্যাংকিং, বীমা, বিনিয়োগ এবং জনশক্তি নিয়োগের ধরণ সম্পূর্ণ পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। ক্রিপ্টো কারেন্সি এর নিয়ন্ত্রণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শ্রেষ্ঠত্বের সমন্বয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি, জনশক্তি ও মেধা স্বত্ব মূলতঃ পুরোপুরি উন্নত দেশ সমূহ এবং বৈশ্বিক কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। খুচরা পণ্যের দোকানের প্রয়োজনীয়তা ক্রমশ মারাত্মক হারে হ্রাস পাবে এবং ই-কমার্সের অসম প্রতিযোগিতায় স্থানীয় ক্ষুদ্র শিল্পের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যেতে পারে।

মেটাভার্স কি তথ্য চুরি ও ঘৃণা ছড়ানোর আরো শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে আবির্ভূত হবে?

সম্প্রতি ফেসবুকের তথ্য ফাঁসকারী ফ্রান্সেস হাউজেন এর ফাঁস করা তথ্যের উপর ভিত্তি করে সিএনএন দাবী করেছে ফেসবুক মূলতঃ ঘৃণা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম ছড়ানোর আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়েছে। যার বাস্তবতা আমরা বাংলাদেশীরা এবারের শারদীয় দূর্গোৎসব চলাকালে টের পেয়েছি হাড়েহাড়ে! মুনাফাকে নিরাপত্তার উপর স্থান দেওয়ার ইতিহাস ফেসবুকের অনেক পুরনো। মায়ানমার, ভারত, শ্রীলঙ্কা, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন দেশে ঘৃণা ছড়িয়ে যেতে দিয়ে দাঙ্গা ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংগঠিত হওয়াতে পরোক্ষ ভূমিকা পালনের অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে ফেসবুকের বিরুদ্ধে।

ফেসবুকের আয়ের অন্যতম উৎস হলো বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন প্রাপ্তির জন্য গ্রাহকদের তথ্য বিনা অনুমতিতে বিজ্ঞাপন প্রদানকারী সংস্থাসমূহের নিকট বিক্রি করে ফেসবুক। ঘৃণা এবং ভুল ও অসত্য তথ্য ছড়াতে নিরবতার ক্ষেত্রে ইউটিউব, টিকটক এর মতো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সমূহের ভূমিকাও প্রায় ফেসবুকের ন্যায়। মেটাভার্সে যেহেতু ভিআর চশমা, স্নায়বিক ক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং শক্তিশালী ভিআর অ্যাপস ব্যবহার করার কথা বলা হচ্ছে, এক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যবহারকারীর রেটিনা স্ক্যান, হ্রদ স্পন্দন ও স্বাস্থ্যগত গোপনীয়তার মতো আরো অনেক সূক্ষ্ম এবং জটিল তথ্যসমূহ প্রযুক্তি কোম্পানি গুলোর নিকট চলে যাবে। যার অপব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তা অতীতের ন্যায় এখনো প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিকট মুখ্য কোন বিষয় নয়।

ফেসবুকের নাম পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী প্রতিক্রিয়া কি?

ফেসবুকের এই হঠাৎ নাম পরিবর্তনে বিশ্বব্যাপী বহু বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ ও ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক এবং সাধারণ ব্যবহারকারী নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। যেগুলোর মধ্য হতে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য টুইটারের সিইও জ্যাক ড্রাওসি এর জাকারবার্গের প্রদত্ত মেটা এর ধারণা কে অসম্পূর্ণ ইঙ্গিত করে করা টুইট। তিনি টুইটারে লিখেন “মেটা- নিজেকে উদ্ধৃত করছে বা নিজের  রীতির প্রথা সমূহকে উদ্ধৃত করছে, স্ব-উদ্ধৃত একটি বিষয়।”

টুইট করে ফেসবুকের প্রতি মারাত্মক আঘাত হেনেছেন মার্কিন কংগ্রেস ওম্যান আলেকজান্ডার ওকাসিও-কর্তেজ। মার্ক জাকারবার্গের নতুন নাম ঘোষণাকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেন, “মেটা হিসেবে- আমরা একটি গণতন্ত্রের জন্য ক্যান্সার স্বরূপ, বিশ্বব্যাপী একনায়কতান্ত্রিক শাসকদের শক্তিশালী ও নাগরিক সমাজকে ধ্বংস করার জন্য পরিণত হয়েছি নজরদারি এবং মিথ্যা তথ্য প্রচারের মেশিনে।”

মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এর মন্তব্য ফেসবুকের জন্য আরো বিপর্যয়কর, “ফেসবুক নাম পরিবর্তন করছে বলে সব অন্তর্নিহিত বিষয়সমূহ পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছে না। ফেসবুক একক কর্তৃত্ববাদী ও প্রতিযোগিতাকে ধ্বংস করেছে। এবং ভুল তথ্য ও ক্ষতিকর বিষয়াদি ছড়িয়ে যাওয়া নিয়ন্ত্রণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। আমাদের ফেসবুককে ভেঙ্গে দিতে হবে।”

বৈশ্বিক কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতা ধ্বংস ও একক কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত উল্লেখ করে বিখ্যাত প্রযুক্তি বিষয়ক লেখক ফরহাদ মানজো ‘এ্যামাজন’ ‘ফেসবুক’ ‘মাইক্রোসফট’ ‘এ্যাপল’ এবং ‘গুগল’ কে `ভয়ংকর পাঁচ’ বলে অবহিত করে সুস্থ ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত করেন। অগণিত সাধারণ ব্যবহারকারীর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যক্ত করা মতামতের সারমর্ম অনেকটা এরকম, “ফেসবুক এতোদিন সাধারণত আমাদের সহজলভ্য ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও চুরি করেছে এবং তা হতে মুনাফা অর্জন করেছে, এখন আমাদের জীবনের প্রতিটি মূহুর্ত নজরদারির আওতায় আনতে চায় এবং আরো সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম ব্যক্তিগত গোপনীয় তথ্য সংগ্রহ করে তা হতে মুনাফা অর্জন করতে চায়।”

মোটাদাগে এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান মিথ্যা প্রতিরোধে অস্বীকৃতি, মুনাফাকে নিরাপত্তার উপর স্থান দেওয়া এবং বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের প্রতি হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে অস্তিত্ব সংকটে পড়া ফেসবুক সবার দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এই নাম পরিবর্তন করেছে।

বৈশ্বিক কোম্পানির নাম পরিবর্তন ফলপ্রসূ নয় গুগল এর মূল কোম্পানির নাম “অ্যালফাবেট” করার মাধ্যমে ২০১৫ সালে প্রমাণিত হয়েছে, মানুষ উল্টো মূল কোম্পানিকে গুগলের নামে চিনে। ফেসবুক (বর্তমানে মেটা) মূলতঃ  নিজেদেরকে আমেরিকার আগামী দিনের প্রযুক্তিক ভবিষ্যৎ হিসাবে উপস্থাপন করে সহানুভূতি লাভের নোংরা খেলায় নেমেছে।

এতো কিছুর মধ্যে ফেসবুকের জন্য আশার আলোও রয়েছে, গত ২৯ অক্টোবর ২০২১ তারিখে ইজরাইলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গান্টজ্ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, “শুভ সন্ধ্যা মেটা”। মার্কিন প্রশাসনে ইজরাইলি প্রভাব এবং প্রযুক্তিক বিশ্বে ইজরাইলের অবস্থান ও ফেসবুকের সাথে ইজরাইলি সরকারের সম্পর্ক বিবেচনায় এটা ফেসবুক (বর্তমানে মেটা) এর জন্য নতুন লাইফ লাইনের চেয়েও বড় কিছু।

মানুষের মানুষিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর কি ধরনের প্রভাব ফেলবে মেটাভার্স? 

প্রকৃতপক্ষে মেটাভার্সের নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে বিশ্বে এখনো খুব বেশী আলোচিত হচ্ছে না। মানব শরীরের উপর মেটাভার্সের প্রভাবে বিরূপ প্রতিক্রিয়া, কিম্বা মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সার্বিক নিরাপত্তার ব্যাপারে মেটাভার্স ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কেউ হয়তো চাইলো, এই মুহুর্তে তার কাঙ্ক্ষিত কোনো নারীর সাথে একান্ত সময় কাটাতে চাইলে মেটাভার্সে সেটা সম্ভব হবে খুব সহজেই। মনে রাখা প্রয়োজন, ইন্টারনেট যুগে আর্থিক বিচারে বিশ্বে সবচেয়ে বড় বাণিজ্য পর্ণো ব্যবসা।

আগেই বলেছি সংগৃহীত তথ্যের অপব্যবহার না হওয়ার নিশ্চয়তা এবং নিরাপত্তার মতো মেটাভার্স মানুষের মানুষিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের উপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে মোটেই কোন আগ্রহ দেখাচ্ছে না টেক জায়ান্টগুলো। এবিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে মেটাভার্স চালু করতে দিলে পুরো মানবতার জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে। তাই এখন থেকেই মেটাভার্সের আগমনে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য হুমকিসমূহ চিহ্নিত করা উচিত এবং এবিষয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা ও জনমত গড়ে তোল উচিত।

মেটাভার্স যুগে প্রবেশের জন্য বাংলাদেশের করণীয়?

আগামীর বিশ্বে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগতভাবে বাংলাদেশের গুরুত্ব প্রতিনিয়ত শুধু বৃদ্ধিই পেতে থাকবে। এমনকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে গেলে উল্টো এই গুরুত্ব রাতারাতি পৌঁছে যাবে অকল্পনীয় উচ্চতাতে। ধীরে ধীরে বিশ্বের সকল টেক জায়ান্টগুলো তাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি ও আরো সুসংহত করবে বাংলাদেশে। তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত মেটাভার্স যুগে বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর যুগে প্রবেশের পূর্ব মূহুর্ত হিসেবে বর্তমান সময় বাংলাদেশের জন্য খুবই নাজুক বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কার্যক্রমকে আমাদের দেশের সংস্কৃতি, আইন ও ঐতিহ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পদক্ষেপ এখনই না নিলে জাতির চিন্তা, চেতনা, অর্থনীতি ও আগামীর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরিভাবে চলে যাবে বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি, তথা প্রযুক্তি উন্নত দেশসমূহের কাছে। তাই বাংলাদেশের আরো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করে একেবারে প্রান্তিক পর্যায় হতে প্রযুক্তি সচেতনতা, প্রযুক্তি সহায়ক অবকাঠামো ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি গবেষণায় আরো অধিক বিনিয়োগ করা উচিত। অবশ্যই এক্ষেত্রে জাতির ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দূর্নীতি মুক্তভাবে সমহারে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।

  • তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, সিজিটিএন, এপি, এনপিআর, টুইটার, ফেসবুক
  • লেখক: প্রতিরক্ষা বিষয়ক তথ্য সংগ্রাহক

 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × four =

আরও পড়ুন