parbattanews

মোগল জমিদারী থেকে চাকমা রাজবংশের উত্থান

এই প্রবন্ধের লেখক এ এইচ এম ফারুক।

পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর চট্টগ্রামের গুরুত্ব বাংলাদেশের ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতির ইতিহাসে অপরিসীম। চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক প্রশাসনিক একক নয়, এটি বাংলাদেশের প্রবেশদ্বার। এখানে রয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ সামুদ্রিক বন্দর, যা প্রাচীনকাল থেকেই বৈশ্বিক বাণিজ্যের সাথে এই জনপদকে যুক্ত করেছে। অন্যদিকে, কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অরণ্যঘেরা সুউচ্চ পাহাড় ও সুনীল জলধারা এই অঞ্চলকে দিয়েছে এক অতুলনীয় নৈসর্গিক রূপ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষত্ব কেবল তার ভূ-প্রকৃতিতে নয়, বরং এর জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্য, ভাষার ভিন্নতা এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে নিহিত। তবে এই অঞ্চলের ইতিহাস যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এর পরতে পরতে লুকিয়ে আছে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ। রহস্যে ঘেরা এই পার্বত্য জনপদ নিয়ে ইতিহাস রচনা করা অত্যন্ত কঠিন কাজ। এর প্রধান কারণ হলো, প্রাচীনকাল থেকে এই অঞ্চলে কোনো স্থায়ী জনবসতির সুনির্দিষ্ট ধারাবাহিক ইতিহাস পাওয়া যায় না। এখানকার অধিকাংশ জনগোষ্ঠী ছিল যাযাবর প্রকৃতির, যারা পাহাড়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে জুম চাষের উদ্দেশ্যে বিচরণ করত।

পণ্ডিত পরিব্রাজক ড. ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগে এই অঞ্চল পরিভ্রমণ করে এখানকার জনগোষ্ঠীর নৃ-তত্ত্ব ও জীবনযাত্রা সম্বন্ধে মূল্যবান আলোচনা করেছেন। পরবর্তীকালে ১৮৬০ সালে জেলা হিসেবে গঠিত হওয়ার পর ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ও পিয়ের বেসেইগনেটের মতো জেলা প্রশাসকেরা এখানকার সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক জীবন নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। পার্বত্য জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাকমারা প্রধান, যাদের ইতিহাস নিয়ে সতীশ চন্দ্র ঘোষ ও ইতিহাসবিদ জামাল উদ্দিন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন।

সেসব ইতিহাস ঘেটে জানাযায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবেই বৃহত্তর চট্টগ্রামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গণ্য হয়ে আসছে। এটি কখনো স্বতন্ত্র কোনো রাষ্ট্র ছিল না। যদিও বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেশী ত্রিপুরা বা আরাকানের রাজারা এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করেছে, কিন্তু তারা কখনোই চট্টগ্রামকে স্থায়ীভাবে তাদের মূল ভূখণ্ডের অংশ করতে সক্ষম হয়নি।

আধুনিক গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীগুলোর কেউই এই অঞ্চলের “আদিবাসী” নন। তারা বিভিন্ন সময় প্রতিবেশী আরাকান, ত্রিপুরা বা মিজোরাম থেকে এখানে এসে বসতি স্থাপন করেছেন। যেমন, চাকমারা মূলত অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে চট্টগ্রামে প্রবেশ করে। ঐতিহাসিক তথ্য ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাদের আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতির দাবিটি ঐতিহাসিক সত্যের পরিপন্থী এবং এটি সার্বভৌমত্বের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক কাঠামোর মূলে রয়েছে মোগল শাসনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব। ১৬৬০ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে দিল্লির সিংহাসন নিয়ে যে ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ শুরু হয়েছিল, তার ঢেউ আছড়ে পড়ে সুদূর চট্টগ্রামের পূর্বপ্রান্তে। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাংলার সুবেদার শাহজাদা সুজা যখন সপরিবারে আরাকানের দিকে পাড়ি জমান, তখন তাঁর সাথে ছিল এক বিশাল মোগল বাহিনী, যার মধ্যে দুর্ধর্ষ অশ্বারোহী সৈন্য এবং ব্যক্তিগত দেহরক্ষী দলও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আরাকানে সুজার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর রামুতে অবস্থানরত তাঁর মোগল সেনারা জীবন বাঁচাতে গভীর অরণ্যে আশ্রয় নেয়, যা আজকের আলীকদম নামে পরিচিত।

এই মোগল যোদ্ধারা ছিলেন মূলত ইরান বংশোদ্ভূত শিয়া মুসলিম। তাঁরা হযরত আলীকে (রাঃ) অধিকগুরুত্ব দিয়ে মান্য করতেন এবং সেই ভক্তি থেকেই তাঁদের নতুন বসতির নাম রাখেন ‘আলীকদম’ বা আলীর পদচিহ্ন। সেখানে তাঁরা স্থানীয় নৃ-গোষ্ঠীর নারীদের বিয়ে করে এক নতুন আভিজাত্যের সূচনা করেন এবং স্থানীয় জুম চাষীরা তাঁদের ‘রাজা’ হিসেবে মেনে নেয়। এভাবে একটা জমিদারি গড়ে উঠে। যেহেতু তাদের প্রজারা অধিকাংশ চাকমা ছিল, তাই চাকমা রাজ্য হিসেবে পরিচিতি পায়।

১৬৬৬ সালে বুজুর্গ উমেদ খাঁ চট্টগ্রাম জয় করলে আলীকদমের এই মোগল জমিদাররা মোগল প্রশাসনের বশ্যতা স্বীকার করেন এবং ‘কার্পাস কর’ প্রদানের চুক্তিতে আবদ্ধ হন। মূলত এই চুক্তির মাধ্যমেই পার্বত্য চট্টগ্রামে মোগল জমিদারীর প্রাতিষ্ঠানিক রূপ শুরু হয় এবং এই মোগল বংশীয় শাসকরা দীর্ঘকাল এই অঞ্চলে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে রাখেন।

১৭২৪ খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন মোগল জমিদার জালাল খাঁ কর প্রদান বন্ধ করে দিয়ে নিজেকে স্বাধীন ঘোষণা করার চেষ্টা করেন। নবাবের নির্দেশে দোহাজারী দুর্গের সৈন্যরা আলীকদমে অভিযান চালিয়ে তাঁর দুর্গ ধ্বংস করে দেয়। জালাল খাঁ পালিয়ে আরাকানে আশ্রয় নিলেও মোগল আভিজাত্যের প্রভাব এই অঞ্চলে অম্লান থাকে।

১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দে শেরমস্ত খাঁ’র আবির্ভাবের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ পুনরায় মোগল ঐতিহ্যের দিকে মোড় নেয়। তিনি পদুয়া-কোদালার বন্দোবস্ত লাভ করেন এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মোগল যোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করেন। তাঁর নেতৃত্বে এই অঞ্চল একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক কাঠামো লাভ করে।

শেরমস্ত খাঁ তাঁর জমিদারী পরিচালনা করতেন মোগল রাজদরবারের হুবহু অনুকরণে। তিনি তাঁর অনুগত প্রজাদের মোগলীয় প্রথা অনুযায়ী ‘দেওয়ান’ উপাধি প্রদান করেন। এই ‘দেওয়ান’ উপাধিটি আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সমাজে এক অভিজাত বংশীয় পরিচয় হিসেবে টিকে আছে, যা তাদের মোগল সংযোগের অকাট্য প্রমাণ।

মোগল আমলের এই খাজনা আদায়ের পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। জমিদাররা বাৎসরিক নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্পাস তুলা নবাবের কোষাগারে জমা দিতেন। জুম চাষীরা এই জমিদারদের ‘তুলা রাজা’ বা ‘কার্পাস রাজা’ হিসেবে অভিহিত করত। এই কর ব্যবস্থার মাধ্যমেই পাহাড় ও সমতলের মধ্যে প্রথম বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সেতুবন্ধন তৈরি হয়।

১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রামের শাসনভার ব্রিটিশদের হাতে চলে যায়। ব্রিটিশরা মোগল আমলের শিথিল ‘কার্পাস কর’ ভিত্তিক সম্পর্কের বদলে কঠোর রাজস্ব আদায়ের নীতি গ্রহণ করে। এর ফলে মোগল বংশীয় জমিদারদের সাথে ব্রিটিশদের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত শুরু হয়।

১৭৮২ সালে জানবক্স খাঁ জমিদারীর দায়িত্ব নেন এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন। তাঁর সেনাপতি রণ খাঁ’র নেতৃত্বে মোগল বাহিনী ইংরেজদের নাজেহাল করে তোলে, যা ইতিহাসে ‘কার্পাস বিদ্রোহ’ নামেও পরিচিত। তবে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশদের অবরোধের মুখে ১৭৮৫ সালে জানবক্স খাঁ গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন।

চুক্তির শর্তানুসারে তিনি পদুয়া-কোদালা ত্যাগ করে সমতলের ‘রাজনগরে’ জমিদারী স্থানান্তর করেন। ব্রিটিশদের কড়া নজরদারিতে তাঁকে চট্টগ্রাম শহরের একটি বাড়িতে থাকতে দেওয়া হতো, যা আজ ‘রাজাপুর’ নামে পরিচিত। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে ধরমবক্স খাঁ (১৮১২-১৮৩২) জমিদারীর দায়িত্ব পালন করেন।

১৮৩২ সালে ধরমবক্স খাঁ মাত্র ২০ বছর বয়সে রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করলে জমিদারীর উত্তরাধিকার নিয়ে মোগল পরিবারের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ধরমবক্স খাঁর স্ত্রী কালিন্দী রাণী ব্রিটিশ প্রশাসনের সহায়তায় কলকাতা কোর্টে আইনী লড়াই শুরু করেন। দীর্ঘ ১২ বছর আইনী যুদ্ধের পর ১৮৪৪ সালে ব্রিটিশদের সমর্থনে তিনি জমিদারীর অধিকার লাভ করেন।

এই রায়ের মাধ্যমেই মোগলদের দেড়শ বছরের রাজনৈতিক আধিপত্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটে এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু নৃ-তাত্ত্বিক ‘চাকমা’ পরিচয়ে স্থানান্তরিত হয়। রাণী কালিন্দী ক্ষমতায় আসার পর মোগল চিহ্নগুলো মুছে ফেলতে শুরু করেন। তিনি মোগল আমলের ‘দেওয়ান’ পদবি বাতিল করে ‘তালুকদার’ পদবি চালু করেন এবং দাপ্তরিক ভাষা ফারসির বদলে ইংরেজি প্রবর্তন করেন। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ছিল ধর্মীয় ক্ষেত্রে; রাণী কালিন্দী আনুষ্ঠানিকভাবে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হলে তাঁর নেতৃত্বেই জুমিয়া চাকমারা বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করতে শুরু করে। এভাবেই দেড়শ বছরের মোগল-মুসলিম আভিজাত্যের অবসান ঘটে এবং চাকমা রাজবংশের নৃ-তাত্ত্বিক ও ধর্মীয় নতুন পরিচয়ের সূচনা হয়।

“পাহাড়ের ক্ষমতার পালাবদল: মোগল জমিদারী থেকে চাকমা রাজবংশের উত্থান” কেবল একটি রাজবংশের পরিবর্তনের ইতিহাস নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক ও প্রশাসনিক রূপান্তরের দলিল। মোগল যোদ্ধাদের হাত ধরে যে প্রশাসনিক কাঠামোর শুরু হয়েছিল, ব্রিটিশদের সুদূরপ্রসারী ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি এবং রাণী কালিন্দীর কৌশলী ভূমিকার কারণে তা নৃ-তাত্ত্বিক ও ধর্মীয়ভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ লাভ করে। বর্তমান পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল পরিস্থিতি ও জাতীয় নিরাপত্তার প্রেক্ষাপট বোঝার জন্য এই ঐতিহাসিক বিবর্তনকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করা অপরিহার্য।

তথ্যসূত্র:
১. পার্বত্য আঞ্চলিক পরিষদ: একক রাষ্ট্রে দ্বৈত কাঠামো, দৈনিক নয়া দিগন্ত।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, জামাল উদ্দিন; বলাকা প্রকাশন।
৩. চাকমা জাতি, সতীশ চন্দ্র ঘোষ, কোলকাতা (আদি সংস্করণ)।
৪. Serajuddin, Dr. M.A.; The Rajas of the Chittagong Hill Tracts and their relation with the Mughals and the East India Company in the eighteenth century।
৫. “পাহাড়ে শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পুনর্বাসন টাস্কফোর্সের কাজ কি?”, অক্টোবর ১৮, ২০২৫, পার্বত্য নিউজ।
৬. Saigal, Omesh; Tripura, Concept Publishing Company, New Delhi।
৭. গবেষণাপত্র-১; পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা: প্রশাসনিক কাঠামো, শরণার্থী সংকট এবং সার্বভৌমত্বের চ্যালেঞ্জ।
৮. ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার; পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা গেজেটিয়ার।
৯. আহাদিসুল খাওয়ানিন (১৮৭১), হামিদুল্লাহ খান।
১০. ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার; এ স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অফ বেঙ্গল: চিটাগাং হিল ট্রাক্টস (১৮৭৬)।
১১. “পাহাড় থেকে সেনা হটাও আন্দোলনের নেপথ্যে”, প্রতিবেদন, দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ।
১২. হ্যামিল্টন, ফ্রান্সিস বুকানন; চিটাগাং হিল ট্রাক্টস সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিবরণী (১৭৯৮-১৮০০)।

লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
ইমেইল: ahmfarukcht@gmail.com

Exit mobile version