ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে পড়ায় যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় উঠে এসেছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদের নাম। জেফ্রি এপস্টাইনের ফাইল সংক্রান্ত বিতর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত হিসেবে পিটার ম্যান্ডেলসনের নিয়োগকে ঘিরে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে, মুসলিম এই নারী নেত্রীর সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীত্ব নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।
টাইমস অব ইসলামাবাদ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ একজন সিনিয়র লেবার নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে আলোচনায় উঠে এসেছেন এবং এর মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের প্রথম মুসলিম প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনের সঙ্গে সম্পর্কিত নথিতে নাম উঠে আসা এবং সেই সূত্রে পিটার ম্যান্ডেলসনকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার চাপে পড়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, ম্যান্ডেলসনের সঙ্গে এপস্টাইনের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও যাচাই-বাছাই ছাড়াই তাকে শীর্ষ কূটনৈতিক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বিষয়টি সামনে আসার পর স্টারমার এপস্টাইনের ভুক্তভোগীদের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চান এবং নিয়োগের জন্য অনুশোচনা প্রকাশ করেন।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ পর্যায়ক্রমে প্রকাশ করা এপস্টাইন ফাইলের মাধ্যমে গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময় ম্যান্ডেলসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি এপস্টাইনের জন্য বাজার-সংবেদনশীল ও সংবেদনশীল সরকারি তথ্য ফাঁস করেছিলেন। এর জেরে সরকারি দায়িত্বে অসদাচরণের অভিযোগে পুলিশি তদন্ত শুরু হয়েছে এবং ম্যান্ডেলসনের সম্পত্তিতে অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে এপস্টাইন ইস্যুতে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রীর চিফ অব স্টাফ মরগান ম্যাকসুইনির পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। লেবার পার্টির ভেতর থেকে নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবি জোরালো হচ্ছে, আর স্টারমার এই সংকট সামাল দিতে পারবেন কি না, নাকি তাকে পদত্যাগে বাধ্য হতে হবে—সে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ওয়েস্টমিনস্টারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পদত্যাগ অবশ্যম্ভাবী না হলেও এই কেলেঙ্কারি সরকারের স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ ঐক্য নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
ব্রিটিশ প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর ধারাবাহিক প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে শাবানা মাহমুদের নাম। তিনি ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে লেবার পার্টির নির্বাচনী জয়ের পর লর্ড চ্যান্সেলর ও বিচারমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কঠোর অভিবাসন সংস্কার বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিনি মন্ত্রিসভায় একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
১৯৮০ সালে বার্মিংহামে পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত বাবা-মায়ের ঘরে জন্ম নেওয়া শাবানা মাহমুদ ২০১০ সাল থেকে লেবার পার্টির এমপি হিসেবে বার্মিংহাম লেডিউডের প্রতিনিধিত্ব করে আসছেন। পেশায় ব্যারিস্টার হিসেবে তিনি সততার জন্য পরিচিত। জেরেমি করবিনের নেতৃত্বের সময় পদত্যাগ করলেও পরবর্তীতে কিয়ার স্টারমারের অধীনে আবার লেবার পার্টিতে ফিরে আসেন। যুক্তরাজ্যের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তার নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
বর্তমান রাজনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং ও উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনারের পাশাপাশি শাবানা মাহমুদও প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে থাকবেন। তবে সবকিছুই এখনো নির্ভর করছে কিয়ার স্টারমারের ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্তের ওপর।
শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী হলে তা যুক্তরাজ্যের বহুসংস্কৃতি ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে গভীর প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে। লন্ডনের মুসলিম মেয়র সাদিক খানের পর একজন মুসলিম প্রধানমন্ত্রীর আবির্ভাব দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বে বৈচিত্র্যের অগ্রগতির প্রতীক হতে পারে। তবে দলীয় অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অভিবাসন ইস্যুতে জনমত এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কসহ নানা চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।
এখনো পর্যন্ত কিয়ার স্টারমার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেননি। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এপস্টাইন–ম্যান্ডেলসন ইস্যু সরাসরি বিচারব্যবস্থার ব্যর্থতার ইঙ্গিত দিলেও এটি স্টারমারের নেতৃত্বের ধরন ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে বিদ্যমান সমালোচনাকে আরও তীব্র করেছে।
বর্তমান সংকট সমসাময়িক ব্রিটিশ রাজনীতির অস্থির বাস্তবতাকে তুলে ধরছে, যেখানে কেলেঙ্কারি মুহূর্তেই রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে। ওয়েস্টমিনস্টার যখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে, তখন সম্ভাব্য এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এই মুসলিম নারী শাবানা মাহমুদ।
(টাইমস অব ইসলামাবাদ থেকে অনূদিত)
