parbattanews

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে

ছবি সংগৃহীত।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারত সফরে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও প্রত্যাশিতভাবেই ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদারদের” অন্যতম দেশ হিসেবে তুলে ধরেছেন। পাশাপাশি তিনি দুই দেশের অভিন্ন মূল্যবোধ, “জনগণের মধ্যে সম্পর্ক” এবং “ ভবিষ্যৎ বিশ্বকে সংজ্ঞায়িত করবে এমন সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে” কৌশলগত ঐক্যের কথা উল্লেখ করেন।

তবে, অংশীদারিত্বের এই পরিচিত ভাষাটি ক্রমশ অন্তঃসারশূন্য বলে মনে হচ্ছে।

এর কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য অপমান এবং শুল্ককে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের ফলে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ওপর যে প্রভাব পড়েছে, তা নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। তবে, দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হয়ে আসার অনেক আগে থেকেই ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক চাপের মধ্যে ছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত প্রভাবের কারণে ভারতের আঞ্চলিক মর্যাদা ক্রমাগত ক্ষুণ্ণ হওয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভারতের কৌশলগত অঙ্গনে এমন নীতি অনুসরণ করেছে যা ভারতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে এবং কখনও কখনও তা ভারত সরকারের সরাসরি পরিপন্থী হয়েছে।

বাংলাদেশ একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ২০২৪ সালে ছাত্র জনতার আন্দোলনে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর, যুক্তরাষ্ট্র শাসন পরিবর্তনে সমর্থন জানায়। তবে, ভারত বুঝতে পেরেছিলো যে এটি গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে, যা পরবর্তীকালে বাস্তবে পরিণত হয়েছে: বাংলাদেশ এখন ইসলামপন্থী সহিংসতায় জর্জরিত, যা ভারতের পূর্বাঞ্চলের স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করছে।

এরপর রয়েছে মিয়ানমার। ২০২১ সালে সামরিক বাহিনী কর্তৃক বেসামরিক সরকারকে উৎখাত করার পর থেকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জান্তার প্রতি একটি শাস্তিমূলক নীতি বজায় রেখেছে, যার মধ্যে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর জন্য “প্রাণঘাতী নয়” এমন সামরিক সহায়তা; যদিও এর ফলে ভারতের সংবেদনশীল উত্তর-পূর্ব সীমান্তে নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

মার্চ মাসে, একজন মার্কিন নাগরিক ও ছয়জন ইউক্রেনীয় নাগরিককে ভারতে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা অনুমতি ছাড়া দেশটির উত্তর-পূর্বে প্রবেশ করে ড্রোন যুদ্ধের জন্য সামরিক জান্তা-বিরোধী যোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্রসজ্জিত করার উদ্দেশ্যে মিয়ানমারে পাড়ি দিয়েছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রও ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভারতের সঙ্গে আবদ্ধ দেশ নেপালকে তার ভারত নীতির অংশ হিসেবে না দেখে, বরং একটি স্বতন্ত্র কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারা আরও ঘন ঘন কাঠমান্ডু সফর করছেন, এবং প্রায়শই নয়াদিল্লিতে একসময়ের প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী যাত্রাবিরতি না করেই যাচ্ছেন।

ট্রাম্প পরিস্থিতিকে আরও অনেক বেশি খারাপ করে তুলেছেন, বিশেষত পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে।

পাকিস্তান যে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়, সেইসাথে সামরিক ও গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে চলেছে, কিংবা গত বছরের নভেম্বরে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনির যে একটি সাংবিধানিক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিলেন—এসব কোনো বিষয়ই নয়।

ট্রাম্পের পরিবারের সদস্য ও ব্যবসায়িক সহযোগীরা দেশটিতে লাভজনক চুক্তি করেছেন এবং দৃশ্যত ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে উপমহাদেশে বিপজ্জনক কৌশলগত গতিপ্রকৃতি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এটাই যথেষ্ট কারণ।

যুক্তরাষ্ট্র এমনকি চীনের প্রতি আরও আপোষমূলক মনোভাব নিতে শুরু করেছে। যদিও দুই পরাশক্তির মধ্যে কৌশলগত প্রতিযোগিতা তীব্র রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক আপোষকামী মনোভাব যথেষ্ট অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে — বিশেষ করে ভারতের জন্য, যার গুরুত্ব যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দীর্ঘকাল ধরে চীনের আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ হিসেবে কাজ করার ক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল।

কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দীর্ঘদিন ধরে ভারতকে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনা আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দুর্গ হিসেবে দেখে আসছে, সেখানে তারা ভারতীয় আঞ্চলিক আধিপত্যের ধারণাতেও আপত্তি জানায়।

ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী সমীর পল কাপুর যেমনটি ব্যাখ্যা করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ায় কোনো একক শক্তির অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার রোধ করতে চাইছে। কাপুরের এই মন্তব্য ট্রাম্প প্রশাসনের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলের (এনএসএস) প্রতিধ্বনি করে, যা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশকে এতটা প্রভাবশালী হতে দিতে পারে না যে তা মার্কিন স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে এবং অবশ্যই বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে, কোনো একটি দেশের—এমনকি কোনো ঘনিষ্ঠ “কৌশলগত অংশীদারের”—আধিপত্যের চেয়ে একটি অধিক বহুত্ববাদী আঞ্চলিক ব্যবস্থা স্বভাবতই বেশি স্থিতিশীল এবং মার্কিন স্বার্থের জন্য অনুকূল। ২০১৭ সালের পূর্বসূরির বিপরীতে, এনএসএস-এ ভারতের কথা প্রায় উল্লেখই করা হয়নি; শুধু বলা হয়েছে যে, ভারতকে “ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তায় অবদান রাখতে” উৎসাহিত করার লক্ষ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেশটির সঙ্গে “বাণিজ্যিক (এবং অন্যান্য) সম্পর্ক উন্নত করতে” চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তি শুধু ভূ-রাজনৈতিক নয়। সম্প্রতি নয়াদিল্লি সফরে এসে মার্কিন উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফার ল্যান্ডাউ বলেন, “২০ বছর আগে চীনের সঙ্গে আমরা যে ভুল করেছিলাম, ভারতের সঙ্গে আমরা সেই একই ভুল করতে যাচ্ছি না।” তিনি বলেন, চীনকে “এইসব বাজার গড়ে তুলতে” এবং তারপর “অনেক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে” যুক্তরাষ্ট্রকে “হারিয়ে দিতে” দেওয়া হবে।

বার্তাটি স্পষ্ট: যুক্তরাষ্ট্র এখন ভারতকে লালন-পালন করার মতো কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখার চেয়ে, বরং নিয়ন্ত্রণ করার মতো এক আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে।

ভারতকে অবশ্যই এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে, যা তার কৌশলগত চিন্তাভাবনায় একটি মৌলিক পরিবর্তন দাবি করে। দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরে নিজের প্রভাব টিকিয়ে রাখার জন্য ভারত আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ওপর নির্ভর করতে পারে না।

এর পরিবর্তে, অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর প্রতি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং ছোট দেশগুলোকে আকর্ষণ করে এমন বাস্তব জনকল্যাণমূলক পরিষেবা প্রদানের মাধ্যমে এটিকে আঞ্চলিক প্রভাব গড়ে তুলতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রেরও তার দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্বিবেচনা করা উচিত। দেশটি হয়তো আরও বৈচিত্র্যময় একটি আঞ্চলিক ব্যবস্থা চায়, কিন্তু তা ভারতের সঙ্গে তার অংশীদারিত্বের বিনিময়ে হতে পারে না, যে দেশের সঙ্গে চীনের উত্থান মোকাবিলা থেকে শুরু করে ইন্দো-প্যাসিফিক জুড়ে স্থিতিশীলতা রক্ষা পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রয়েছে। যে নীতিগুলো পদ্ধতিগতভাবে নিজ প্রতিবেশী অঞ্চলে ভারতের অবস্থানকে দুর্বল করে, সেগুলো এই অভিন্ন উদ্দেশ্যগুলোকে ক্ষুণ্ণ করার ঝুঁকি তৈরি করে।

ট্রাম্প সরকার আশা করছে বলে মনে হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠলেও বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে থাকতে পারবে। তবে, এটি কোনো সহজ কাজ হবে না এবং এর ফলাফল শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎই নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরের কৌশলগত প্রেক্ষাপটকেও নির্ধারণ করবে।

লেখক : ব্রহ্মা চেলানি (নয়াদিল্লি-ভিত্তিক সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ-এর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ বিভাগের এমেরিটাস অধ্যাপক এবং বার্লিনের রবার্ট বোশ একাডেমির ফেলো ব্রহ্মা চেলানি ‘ওয়াটার, পিস, অ্যান্ড ওয়ার: কনফ্রন্টিং দ্য গ্লোবাল ওয়াটার ক্রাইসিস’ গ্রন্থটির লেখক)।

উৎস : TAIPEI TIMES থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে।

Exit mobile version