যেন এক হ্যামিলনের বংশীবাদক


কাজী জাফর আহমেদ ১৯৮২ সালের সম্ভবত জুলাই মাসে হোটেল সাইমনে আমার পাশের রুমে অবস্থান করছিলেন। একদিন বিকেলে আমার রুমে আসলেন অলস সময় কাটানোর জন্য। আমি চা নাস্তা অর্ডার করলাম। চা পান করতে করতে রাজনৈতিক আলোচনা শুরু হলো একসময়। প্রসঙ্গক্রমে প্রেসিডেন্ট জিয়ার কথা উঠল। আমি ও আমার এক বন্ধু বললাম তিনি তো অবশ্যই একজন দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি কিছুটা হেঁয়ালিপূর্ণভাবে বললেন দেশপ্রেম থাকুক বা না থাকুক মানুষ যে বিশ্বাস করেছিল তাঁর দেশপ্রেম আছে সেটাই বড় কথা। দেশপ্রেম কাজী জাফর এর কি কম আছে? কিন্তু কেউ তো জিজ্ঞেসও করে না জানতে ও চায়না। আসলে মানুষ যে বিস্বাস করে জিয়ার দেশপ্রেম ছিল সেটাই মূল কথা।
তবে তিনি কঠোর পরিশ্রমী একজন মানুষ ছিলেন এবং এনার্জেটিক মানুষ ছিলেন। এটা একবারে শত ভাগ ঠিক। হি মেইড পলিটিকস ডিফিক্যালট ফর পলিটিশিয়নস। তাঁর সাথে তাল মিলিয়ে চলা আমাদের মতো ট্রেডিশনাল পলিটিশিয়সনদের জন্য কঠিন হয়ে গিয়েছিল। তিনি একদিনে পথ চলতে চলতে চার/পাঁচটা জনসভা করতেন। আর আমরা রাজনীতিবিদরা এক সপ্তাহ আগে ঘোষণা দিয়ে সারাদিনে একটা মিটিং করে ঢাকা ফিরে আসতাম। ফলে তিনি আমাদের অনেক পেছনে ফেলে সামনে এগিয়ে গেলেন। এক সময় আমরা হেরে গেলাম তাঁর গতির সাথে তাল মেলাতে না পেরে।
এতদিন পর তারেক জিয়ার ঝটিকা মিটিং দেখে জেনারেল জিয়ার সেই পুরনো এনার্জেটিক রাজনীতির কথা নুতন করে মনে পরে গেল আবার। তারেক রহমান যেন জিয়াউর রহমানেরএক ডুপ্লিকেট কপি। চলনে বলনে স্মার্টনেস এনার্জি লেভেল সবকিছু যেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার কার্বন কপি। আজ সকালে তিনি চট্টগ্রামে প্রথমে তরুণ শিক্ষার্থীদের সাথে মত বিনিময় করলেন। দুপুরে পলোগ্রাউন্ডে বিশাল জনসভা করলেন। তারপরই ছুটলেন ফেনীর দিকে। সেখানে মিটিং শেষ করে কুমিল্লার চৌদ্দ গ্রাম এবং সর্বশেষ ঢাকার কাছাকাছি কোথাও। এটা কি কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নাকি তিনি কোন রোবট?
যাই হউক অন্তত প্রফেসর ইউনুস এর উপদেষ্টাদের মতো কোনো লেথারজিক অলস অপদার্থ মানুষ তিনি নন। ভবিষ্যতে কি হবে জানি না বর্তমানে তার যে অফুরন্ত এনার্জি লেভেল তা অবশ্যই আশা জাগানিয়া। তাঁর মাঝে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর ছায়া দেখা যায়।
আগামীর বাংলাদেশ একজন তরুণ উদ্যমী কর্মবীরকে এদেশের মানুষ তাদের নেতা হিসেবে পাবেন আশা করা যায়। মানুষ এখন হুমড়ি খেয়ে পড়ছে তাঁকে এক নজর দেখার জন্য। রাত যত গভীর হউক তাঁর জনসমাবেশে মানুষের কোনো কমতি নেই।
আসলে বিএনপি এবং তারেক জিয়ার কাছে মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার লিগেসি এখন তাঁকে বয়ে নিয়ে যেতে হবে। প্রতিটা মূহুর্তে প্রতিটি পদক্ষেপে মানুষ তুলনা করবে তাঁক তাঁর উত্তরসুরিদের সাথে।
তারেক জিয়া এই মুহূর্তে বাংলাদেশে তারুণ্যের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। পরিণত হয়েছেন ভরসার কেন্দ্র হিসেবে। তাঁর সমকক্ষ এখন বাংলাদেশে আর কোনো নেতা আছে কি? মনে হয় না। তিনি এখন হ্যামিলনের এক বংশীবাদক। তার পেছনে ছুটছে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ, কিশোর তরুণ। তিনি এখন বাংলাদেশের তারুণ্যের প্রতীক। তিনি পুরনো সব ট্রেডিশন ভেঙে চুরমার করে দেবেন মনে হয়। বাংলাদেশর জরাজীর্ণ রাজনীতির ময়দানে তিনি এক ধূমকেতু।
তাঁর বিরুদ্ধে কিছু সমালোচনা আছে এবং ভবিষ্যতে ও থাকবে। বিগত দিনের সমালোচনাগুলো বেশির ভাগ কল্প কাহিনি যেগুলোর কোন ভিত্তি নেই বলে আমার ধারণা। প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, জনকণ্ঠের মতো সংবাদপত্র এসব অপপ্রচার চালিয়েছিল বিরতিহীনভাবে একটি বৈরী দেশ একটি তাবেদার গোষ্ঠীর রাজনৈতিক স্বার্থে। তবে আলী আসগর লবী, লুৎফজ্জামান বাবর ও গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, বগুড়ার শোকরানার মতো কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি বিগত দিনে তাঁর ইমেজ নষ্ট করার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছিল বলে আমার মনে হয় ।
গিয়াসউদ্দিন আল মামুন, শোকরানা, মেজর সাইদ ইস্কান্দারের সাথে এক সময় আমার ভালো পরিচয় ছিল। এদের চরিত্র কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। মামা মেজর সাইদ ইস্কান্দারের উচ্চবিলাস এবং জেনারেল মঈন ইউ আহমদের সাথে গোপন ষড়যন্ত্র তাঁর চরিত্র হননে বড় ভুমিকা রেখেছিল বলে আমার ধারণা। সাঈদ ইসকান্দরের জাতীয়তাবদী কল্যাণ সংগঠনের সাথে কিছু সময় জড়িত হয়ে তার আভাস পেয়ে সরে এসেছিলাম।
তারেক রহমান হয়ত এতদিনে বুঝতে পেরেছেন তাঁর ভুলটা কোথায় ছিল। সোনা আগুনে পুড়লে নিখাদ হয়। আমেরিকান কবি মেরিয়েন মুর এর কথা- A truth is not perfect unless it is tested in the fire of dispute. বিতর্কের আগুনে দগ্ধ না হলে কোন সত্যই পরিপূর্ণতা পায় না।
আমাদের প্রত্যাশা বিতর্কের আগুনে পুড়ে তারেক রহমান একসময় খাঁটি সোনায় পরিণত হবেন। প্রয়াত পিতা শহীদ জিয়াউর রহমান এবং মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সম্মান ও মর্যাদার আসনকে তিনি অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হবেন। এটা একটি দেশ একটি জাতির প্রত্যাশা। তারেক রহমানের অগ্রযাত্রা সফল হউক, এই শুভকামনা করি।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও ইনসুরেন্স কোম্পানির শীর্ষ নির্বাহী।
ফেইসবুক পোস্ট

















