যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন সেন্টমার্টিনবাসী: কী করবে বাংলাদেশ?

fec-image

বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মিয়ানমার। একমাত্র নৌ যোগাযোগের মাধ্যমেই বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে সাধারণ জনগণ টেকনাফে যাতায়াত করে থাকে। এর মধ্য দিয়েই সেখানে বসবাসকারী মানুষের জন্য খাদ্য ও অন্যান্য সহায়তা প্রেরণ করা হয়ে থাকে। মূল ভূখণ্ড টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপের দিকে যাতায়াতকারী সাধারণ নৌ-পরিবহনগুলোকে দেখলেই গুলি ছুঁড়ছে মিয়ানমারের সেনারা। আতঙ্কে সেখানে যাতায়াতকারী সব ধরনের সিভিল পরিবহনের যাতায়াত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সেন্টমার্টিনে বসবাসকারী ১০ হাজার মানুষ বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সেখানে সৃষ্টি হয়েছে খাদ্য ও অন্যান্য মানবিক সংকট। জনগণ প্রবল দুর্ভোগে থাকলেও প্রাণের ভয়ে নিকটবর্তী বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড টেকনাফের সাথে যোগাযোগ করতে পারছে না। গত ৫, ৮ ও ১১ জুন মিয়ানমারের জান্তাবাহিনী তিন দফায় টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপে চলাচলকারী সিভিল পরিবহনের উপর গুলি বর্ষণ করেছে।

এ ঘটনা নিয়ে জার্মান বার্তা সংস্থা ডয়েচে ভেলেকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পিডবোট মালিক সৈয়দ আলম বলেন, ‘আগের গুলির ঘটনার পর গত ৫ দিন আমরা নদীতে যাইনি। প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনার পর মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফেরত আসা অসুস্থ এক রোগীকে নিয়ে সেন্টমার্টিন যাচ্ছিল আমাদের একটি স্পিডবোট। সাগরের ঘোলচর এলাকায় পৌঁছালে মিয়ানমারের সীমান্তের একটি ট্রলার থেকে ওই স্পিডবোট লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ করা হয়। পরে স্পিডবোটটি কোনোরকমে সেন্টমার্টিন পৌঁছে যেতে সক্ষম হয়। এ ঘটনায় কেউ হতাহত হননি।’

কারা এই গুলি করছে জানতে চাইলে সৈয়দ আলম বলেন, ‘আগে আমরা নিশ্চিত ছিলাম না, কারা এটি করছে। কিন্তু আজকে যখন ছোট ছোট নৌযান নিয়ে আমাদের স্পিডবোটে গুলি করা হয় তখন সেখানে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জাহাজ ছিল। ফলে আমরা ধারণা করছি, জান্তার সৈন্যরাই এটা করছে। টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়ার পথে নাফ নদের মোহনার শেষে নাইক্ষ্যংডিয়া এলাকা অতিক্রম করার সময় মিয়ানমারের প্রান্ত থেকে বোটগুলো লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে। আমরা এখন সেন্টমার্টিনে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছি। কারণ, ওই এলাকায় আমাদের বিজিবি বা কোস্টগার্ডের কোনো টহল নেই। তারা উপকূলে চলে এসেছে। ফলে জান্তার সৈন্যরা চাইলে যে কোনো সময় আমাদের সেন্টমার্টিনেও চলে আসতে পারে বলে আমরা আশঙ্কা করছি। আমরা এখন খুবই নিরাপত্তাহীনতায় আছি।’

এ রিপোর্টে বলা হয়েছে, এ কারণে ৬ দিন ধরে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে দ্বীপের  প্রায় ১০ হাজার বাসিন্দা খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকটে পড়েছেন। সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান ওই সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, ‘সেন্টমার্টিনে অতিরিক্ত খাদ্য রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতিদিনই টেকনাফ থেকে ট্রলারে করে নানা ধরনের নিত্যপণ্য আসে। কিন্তু ৬ দিন হলো কিছুই আসছে না। এখন সেন্টমার্টিনে কাঁচামাল কিছুই নেই। চাল-ডাল দিয়ে কোনোভাবে দিন চলছে। আবার যা-ও আছে, তার দামও ব্যবসায়ীরা দ্বিগুণ-তিনগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে আমরা অনেক কষ্টে আছি। এভাবেও আর দুই-একদিন হয়ত চলা যাবে। এরপর আমাদের না খেয়ে থাকতে হবে। আমরা প্রশাসনকে বারবার ব্যবস্থা নিতে বলছি, কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাইনি।’

এই প্রতিবেদনে যদিও এ ঘটনার জন্য জান্তা বাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু এর পেছনে আরাকান আর্মির জড়িত থাকার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, আরাকান আর্মি তাদের খাদ্য ও অন্যান্য রসদ সহযোগিতা নাইক্ষ্যংছড়ি ও থানচি সীমান্ত দিয়ে চোরাচালানীদের মাধ্যমে সংগ্রহ করতো। কিন্তু বিগত কিছুদিন বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করায় বাংলাদেশ থেকে খাদ্য, জ্বালানী ও ওষুধ জাতীয় রসদগুলো সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে আরাকান আর্মি এ ঘটনা ঘটিয়ে থাকতে পারে। যদিও জান্তা বাহিনী ও আরাকান আর্মি উভয়ই এ ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছে।

গত ৯ জুন বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর ১৩৪ জনকে জাহাজে করে নিরাপদে ফেরত পাঠিয়েছে। এই নিয়ে মোট তিন দফায় বাংলাদেশ মিয়ানমারের প্রায় হাজার খানেক পালিয়ে আসা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে। বাংলাদেশ যে মুহূর্তে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সে দেশের সেনা সদস্য সীমান্ত রক্ষা বাহিনীর সদস্য ও অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের বাংলাদেশের জামাই আদর করছে এবং তাদের যথাযথ কূটনৈতিক মর্যাদা ও প্রোটোকল দিয়ে ফেরত পাঠাচ্ছে সেই মুহূর্তে জান্তা সরকার বাংলাদেশের সার্বভৌম ভূখণ্ড সেন্টমার্টিন দ্বীপে চলাচলকারী সিভিল পরিবহনগুলোর উপর গুলিবর্ষণ করে সেন্ট মার্টিনদ্বীপকে বাংলাদেশ থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। এই অবস্থায় বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ মৌখিক প্রতিবাদের মধ্যে নিজের দায়িত্ব শেষ করেছে।

শুধু মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী নয়, সে দেশের বিদ্রোহী আরাকান আর্মিও ইদানিং সুযোগ পেলেই বাংলাদেশি নাগরিকদের উপর গুলি করতে দ্বিধা করছে না। এতে বাংলাদেশের নাগরিকরা হতাহত হচ্ছে। মিয়ানমার সরকার ও আরাকান আর্মির মধ্যে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইতোমধ্যেই মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের গোলাবারুদের আঘাতে বাংলাদেশের বেশ কয়েকজন নাগরিক হতাহত হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তাদের সহায় সম্পদ। সীমান্তে বসবাসকারী সাধারণ মানুষ বেশ কয়েকবার আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে দূরবর্তী নিরাপদ স্থানে চলে এসেছে। তারা সীমান্ত এলাকায় তাদের ক্ষেতে কৃষি কাজ করতে যেতে পারছে না। প্রায় প্রতিনিয়ত মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান আর্মির মধ্যে প্রবল যুদ্ধে কেঁপে উঠছে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা। ফলে সীমান্ত এলাকার সাধারণ মানুষ প্রবল আতঙ্কের মধ্যে জীবন পার করছে। বাংলাদেশি নাগরিকদের জানমালের এহেন ক্ষয়ক্ষতিতে মিয়ানমার সরকার আজ পর্যন্ত কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়নি, এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশও করেনি। অবশ্য বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমারের কাছে এ ধরনের কোনো ক্ষতিপূরণের দাবি করেছে বলেও শোনা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে একটি গল্প মনে পড়ে গেল। একবার আমেরিকান ও জাপানি বন্ধুকে নিয়ে এক বাংলাদেশি জাহাজে করে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন যাচ্ছিল। এ সময় আমেরিকান বন্ধুটি তার হাতের আইফোন সমুদ্রে ফেলে দিয়ে বলল, এগুলো আমাদের দেশে অ্যাভেইলেবল দু-একটা ফেলে দিলে কোনো সমস্যা হয় না। জাপানি বন্ধুটি তার হাতে থাকা দামি ল্যাপটপটি সমুদ্রে ফেলে দিয়ে বলল, এগুলো আমাদের দেশে অ্যাভেলেবেল দুই একটি ফেলে দিলে কোনো সমস্যা হয় না। বাংলাদেশি লোকটি চিন্তা করল তাকেও তো কিছু একটা করতে হবে, না হলে ইজ্জত থাকে না। কিন্তু তিনি কী ফেলবেন? কোনো কিছু খুঁজে না পেয়ে সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়া একজন চা বিক্রেতাকে ধরে সমুদ্রে ফেলে দিয়ে বলল, এগুলো আমাদের দেশে অ্যাভেলেবল। দু’য়েকজন না থাকলে কিছু যায় আসে না।

আমাদের সীমান্তে প্রতিবেশী দেশের বিভিন্ন বাহিনীর গুলিতে প্রতিনিয়ত যেভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত হচ্ছে এবং এসবে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিক্রিয়া উল্লিখিত বাংলাদেশি নাগরিকের মতই। তিনদিকে বেষ্টিত ভারত সীমান্ত রক্ষী বাহিনী প্রায় প্রতি সপ্তাহেই গুলি করে বাংলাদেশের নাগরিকদের হতাহত করছে। এসবের প্রতিবাদের পরিবর্তে খোদ বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যারা হতাহত হচ্ছে তারা ‘চোরাকারবারি’, ‘দুষ্ট লোক’। এইভাবে দেশের নাগরিকদের ‘চোরাকারবারি’, ‘পাচারকারী’, ‘অপরাধী’, ‘দুষ্ট লোক’ আখ্যা দিয়ে ভারতীয়দের বাংলাদেশি নাগরিকদের উপর গুলি বর্ষণ ও হতাহত করার পরোক্ষ লাইসেন্স দিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশের অভ্যন্তর থেকেই।

শুধু ভারত নয় মিয়ানমার সীমান্তেও একইভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হতাহত হয়ে আসছে মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ছোঁড়া গোলাগুলিতে। বাংলাদেশ-ভারত ও বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের বেশিরভাগ জায়গায় সমতল ও কৃষি কাজের উপযোগী ভূমি রয়েছে। সীমান্তের বাসিন্দারা এসব ভূমিতে চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। উক্ত সীমান্তের উল্লেখযোগ্য অংশে রয়েছে অভিন্ন নদী প্রবাহ। দুই দেশের মানুষ এ সমস্ত অভিন্ন নদীতে মাছ শিকার ও নানা ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশগুলোতে সীমান্তে চলাচলকারী সাধারণ নাগরিকদের উপর প্রতিনিয়ত গুলিবর্ষণ করা হয়, যা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। কিন্তু বাংলাদেশ কখনোই এসবের জোরালো প্রতিবাদ করেনি। বরং তার নাগরিকদের দিকেই আঙ্গুল তুলেছে। যুক্তির খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয়, সীমান্তে চলাচলকারী এসব জনগণ চোরাকারবারি তবুও বলা প্রয়োজন এক পক্ষের মাধ্যমে চোরাচালান সম্ভব নয়। অর্থাৎ সীমান্তের ওপারেও এ সমস্ত চোরাচালানকারিদের সহযোগীরা বসবাস করে, যারা প্রতিবেশী দেশের নাগরিক। বাংলাদেশ যদি সীমান্তের অপরপারের চোরাকারবারিদের দিকে এরকম গুলি ছুঁড়তো তাহলে তাদের প্রতিক্রিয়া কী হতো? এদেশের ভিতরে অনেক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞই বলে থাকেন পিলখানা ম্যাসাকার পদুয়া-রৌমারীর প্রতিশোধ। এ থেকেই আমরা জবাবটা পেতে পারি।

সেন্টমার্টিন বঙ্গোপসাগরের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড। সামুদ্রিক অর্থনৈতিক (ব্লু-ইকোনমি) কারণে এই দ্বীপের অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। এছাড়াও কৌশলগত কারণে এই দ্বীপের গুরুত্ব বাংলাদেশের কাছে সীমাহীন। বিশ্ব রাজনীতির নতুন প্রপঞ্চ পশ্চিমাদের ইন্দোপ্যাসিফিক স্ট্রাটেজি, বার্মা অ্যাক্ট, জাপানের বে অফ বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট বা বিগ বি প্লান, চাইনিজ বি আর আই প্রভৃতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এই দ্বীপ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেশ কয়েকবার কোনো ব্যক্তি বা দেশের নাম উল্লেখ না করে, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের একটি দ্বীপে ঘাঁটি তৈরি করার পশ্চিমা বা সাদা চামড়ার মানুষের দেশের আগ্রহ ও চাপের কথা উল্লেখ করেছেন। এতে বোঝা যায়, ভৌগোলিকভাবে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অবস্থান বাংলাদেশ ও বিশ্ব রাজনীতির নতুন প্রপঞ্চে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মিয়ানমারের মানচিত্রে অন্তর্ভূক্ত বাংলাদেশ

 

রোহিঙ্গা সমস্যা, মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের অস্থিরতা এমনিতেই এই অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বকে লালায়িত করছে, হাতছানি দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, এই অঞ্চলে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র চলছে। এটা অনেক পুরাতন পরিকল্পনা। অন্তত ১৯৪১ সাল থেকে এই পরিকল্পনার দালিলিক প্রমাণ আমাদের সামনে উপস্থিত। এ লক্ষ্যে ইউরোপীয় মিশনারিরা দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলে উপস্থিত থেকে তাদের কার্যক্রম বহুমুখী সেবার কুইনাইন বোতলে বন্দি করে এ অঞ্চলের মানুষের কাছে ফেরি করে যাচ্ছে। এতকিছু জানার পরেও বাংলাদেশের এই নীরবতা অথবা নির্লিপ্ততা দেশবাসীকে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিদ্যমান রাজনীতিতে বর্তমানে বাংলাদেশ অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। কিন্তু এই সুবিধা থেকে বাংলাদেশ কোনো ফায়দা আদায় করতে পারছে না বা ফায়দা আদায় করার কোনো চেষ্টা দৃশ্যমান নয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান মূলত কিছু প্রভাবশালী দেশের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, চাওয়া-পাওয়া, পছন্দ-অপছন্দের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এটাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে এবং এর সাথে ক্ষমতার রাজনীতির বিনিময়ের ফলে বাংলাদেশ দুর্বলতর অবস্থানে পতিত হয়েছে। এটা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও স্বার্থের জন্য চরম ক্ষতিকর।

প্রতিবেশী কর্তৃক একের পর এক আমাদের সার্বভৌমত্ব ও সীমানা লঙ্ঘনকে আমরা কেবলমাত্র কূটনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখেছি। অথচ, সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তও যদি আমরা সামনে নিয়ে আসি তাহলে দেখতে পাই, পাকিস্তান ও ইরান দুই প্রতিবেশী দেশ নানামাত্রিক অত্যন্ত উষ্ণ সম্পর্কে আবদ্ধ। কিন্তু ইরান যখন পাকিস্তানের সার্বভৌম ভূখণ্ডে সে দেশের বিচ্ছিন্নতাবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপের উপরে হামলা চালিয়েছে, পাকিস্তান কোনো বিলম্ব না করেই তার যথোপযুক্ত জবাব দিয়ে জানিয়েছে, দেশের সীমানা সার্বভৌমত্বের সর্বশেষ লাইন। কিন্তু এই হামলা ও পাল্টা হামলা দুই দেশের সম্পর্কে কোনো চিড় ধরায়নি। দুই দেশ যথারীতি তাদের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বহাল রেখে চলেছে। একটি স্বাধীন দেশের মর্যাদা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশ যখন নিজ দেশের সার্বভৌমত্বের এই মর্যাদাকে নিজে সম্মান করে, তখন বিদেশিরাও তাকে সম্মান দেয় বা দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তান ও ইরান সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। ভারত ও চায়না দুই চির বৈরী দেশ। সীমান্ত নিয়ে তাদের বহুবিধ সমস্যা রয়েছে। এ সমস্যায় মাঝে মধ্যেই সীমান্তে ব্যাপক উত্তেজনা দেখা দেয়। শুধু সীমান্ত নয় অর্থনৈতিক ও ভূকৌশলগত সমস্যা ও প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে এই দুই দেশের মধ্যে। এসব সত্ত্বেও দুই দেশ অভিন্নভাবে ব্রিক্সে নেতৃত্ব দিচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকান্ড প্রতিবছরই পূর্ববর্তী বছরের থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এমনকি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কেন্দ্রিক পশ্চিমা পরিকল্পনার ব্যাপারেও অভিন্ন স্বার্থে এই দুই দেশের মধ্যে অনেক জায়গায় সহযোগিতামূলক আচরণ দৃশ্যমান। এ সমস্ত দৃষ্টান্ত এজন্য তুলে ধরা হলো যে, সার্বভৌমত্বের ব্যাপারে আপস না করেও বর্হিদেশের সাথে সম্পর্ক বজায়  রাখা সম্ভব। সেজন্য প্রয়োজন দেশপ্রেম, সততা ও কূটনৈতিক দক্ষতা। আমাদের মূল সংকট এখানেই।

কয়েক বছর আগে মিয়ানমার তাদের মানচিত্রে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাংলাদেশ এর তীব্র প্রতিবাদ জানালেও মিয়ানমার সেই অবস্থান থেকে সরে আসেনি বা সেই মানচিত্র সংশোধন করেনি। কূটনৈতিক অসংখ্য উদ্যোগ বাংলাদেশ গত ৭ বছরে একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে পারেনি। বরং ঘোষণা বিহীনভাবে লাখখানেক আরো রোহিঙ্গা এই সময়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। কূটনৈতিক ভাষা ও উদ্যোগ সবসময় যে সুফল বয়ে আনতে পারে না এ ঘটনাগুলো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রশ্ন হলো, এই প্রেক্ষিতে আমাদের করণীয় কী? উত্তরটা এভাবে দেয়া যায়, বালিতে মুখ গুঁজে যেমন মরুঝড় এড়ানো যায় না, তেমনি বন্ধু-বন্ধু, শান্তি-শান্তি বলে সব সময় সমাধান আসেনি পৃথিবীতে। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ সবসময় বন্ধুত্ব ও শান্তির পক্ষে ছিল এবং আছে। তবে যখন অস্তিত্বের সংকট উপস্থিত হয় তখন কর্তব্য এড়িয়ে যাওয়া, এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা পলায়নপর মানসিকতার পরিচয়ক। কবি হেলাল হাফিজের ভাষায়,

  • ‘শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে
  • অবশ্য আসতে হয় মাঝে মধ্যে
  • অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে।’

উপরোক্ত পংক্তিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো যখন অস্তিত্ব, সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও মর্যাদার প্রশ্ন সামনে আসে তখন সেটা নিশ্চিত করতে যা করা প্রয়োজন তা করতে দ্বিধান্বিত হলে চলবে না। যদি কূটনীতির ভাষা কাজ না করে তাহলে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে ভাষা ও পন্থা গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে তা গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়। মিয়ানমারের জান্তাবাহিনী ও তাদের বিদ্রোহীরা প্রতিদিন বাংলাদেশের জনগণের উপর গুলি করবে, বাংলাদেশের জনগণকে হতাহত করবে, জনগণের সহায় সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত করবে, বাংলাদেশের সার্বভৌম দ্বীপের সাথে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেবে, আর বাংলাদেশ শুধু নীরব দর্শক হবে এটা একটা স্বাধীন দেশের জন্য মর্যাদাকর নয়। কোনো দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে অর্জন করা হয় না।

অবস্থানগত কারণে সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে মিয়ানমারের দূরত্ব বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের দূরত্বের চেয়ে কম। এটি মিয়ানমারের আর্টিলারি ফায়ার রেঞ্জের মধ্যেই রয়েছে। কিন্তু তার বিপরীতে বাংলাদেশও যে নীরব রয়েছে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। তুবও কয়েক রাউন্ড গুলি চালিয়ে যদি সেন্টমার্টিনকে বাংলাদেশের মূল ভূ-খণ্ডের সাথে বেসামরিক ও স্বাভাবিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যায় তাহলে এটি সেন্টমার্টিনের নিরাপত্তার ব্যাপারে চরম উদ্বেগজনক খবর। এ ঘটনা সেন্টমার্টিনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় দুর্বলতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। কাজেই সময় থাকতে সংশ্লিষ্ট মহল বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, এটা দেশবাসীর প্রত্যাশা। কেননা, একটি দেশের জন্য সার্বভৌমত্বের থেকে অগ্রাধিকার আর কোনো কিছু পেতে পারে না।

♦ লেখক: সম্পাদক, পার্বত্যনিউজ; চেয়ারম্যান, সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশন


লেখকের আরো কিছু লেখা

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আরাকান আর্মি, বঙ্গোপসাগর, মিয়ানমার
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন