রক্তের ঝর্ণা বইছে পার্বত্য জনপদে ॥ উপদলীয় সংঘাতে ১৪ মাসে নিহত ৪৯ জন

তোফাজ্জল হোসেন কামাল :
সবুজ পাহাড় আবার রক্তে লাল হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের মধ্যে যে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত শুরু হয়েছিল, তার সর্বশেষটা ঘটেছে ৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ে। সেদিন দূর্বৃত্তদের গুলীতে উপজেলার রাইখালীর কারিগর পাড়ায় দু’জন নিহত হয়েছেন। এর আগে গত ২৯ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুরে একই জেলার লংগদুতে। এ নিয়ে গত ১৪ মাসে পাহাড়ের সন্ত্রাসপ্রবণ জেলা রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে ৪৯ জনের অকাল মৃত্যু ঘটেছে।

প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পর পরই বিবদমান গ্রুফগুলো ঘটনার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করে আসছে। সর্বশেষ কাপ্তাইয়ের ঘটনার জন্যও পাহাড়ের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। তবে জেএসএস অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

জানা গেছে, রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার রাইখালী ইউনিয়নে কারিগড় পাড়ায় দুর্বৃত্তদের গুলীতে সোমবার বিকেলে নিহত দুজনের মধ্যে একজন জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কর্মী। অন্যজন স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা। তবে কাপ্তাইর রাইখালী ইউনিয়েনর কারিগর পাড়ায় নিহত দুইজনকে আওয়ামী লীগের কর্মী বল দাবি করা হয়েছে। সোমবার রাতে রাঙামাটি জেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক রফিক আহম্মদ তালুকদার স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি করা হয়। এ সময় জেএসএস (সন্তু লারমা) গ্রুপের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা গুলী করে তাদেরকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করা হয়।

এর আগে ২৯ জানুয়ারির ঘটনার জন্য ইউপিডিএফ জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা)কে দায়ী করেছিল। তবে এমএন লারমা তা অস্বীকার করে। এর আগে ১৯ জানুয়ারি খাগড়াছড়ির জেলা সদরে পেরাছড়া গ্রামে রনীক ত্রিপুরা নামে ইউপিডিএফের কর্মী নিহত হন।

এর আগে গত ৪ জানুয়ারি শুক্রবার রাঙামাটির বাঘাইছড়িতে জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) এক কর্মী নিহত হন।

আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) ও ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে এই সংঘাত চলে আসছে। এক একটি হত্যাকাণ্ডের পর দলগুলো পরস্পরের ওপর দায় চাপায়।

জানতে চাইলে পার্বত্য নাগরিক কমিটির সভাপতি গৌতম দেওয়ান বলেন, ‘পার্বত্য নাগরিক কমিটির উদ্যোগে পাহাড়ে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত বন্ধের চেষ্টা করা হচ্ছে। আমরা আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে যাচ্ছি। সংঘাত চলমান থাকায় আমরা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছি।’

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তির পর জেএসএস ভেঙে পর্যায়ক্রমে কয়েকটি দল গঠিত হয়। এরপর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে অশান্ত হয়ে পড়ে পাহাড়। ২০১৫ সালে আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে একটি সমঝোতা হয়। এরপর সংঘাত প্রায় আড়াই বছর বন্ধ ছিল। কিন্তু ২০১৭ সালে ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফ ভেঙে ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নামে অপর একটি দল গঠিত হওয়ার ২০ দিনের মাথায় পুনরায় সংঘাত শুরু হয়।

তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত কিছুটা কমে আসে। নির্বাচনে ইউপিডিএফ খাগড়াছড়িতে ও জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) রাঙামাটিতে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। নির্বাচনকে সামনে রেখে এই দুই দলের মধ্যে একটা অলিখিত ঐক্যও হয় বলে সে সময় গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়।

আর এই দুই দল ভেঙে গঠিত জেএসএস এমএন লারমা এবং ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেয়। দুই জেলায় তারা ইউপিডিএফ এবং জেএসএস প্রার্থীর সরাসরি বিপক্ষে কাজ করে। এই দ্বন্ধ থেকে নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে পানছড়িতে হামলায় দুজন নিহত হন। তাঁদের একজন ইউপিডিএফ সমর্থক।

এ নিয়ে দল দুটির ওপর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী আঞ্চলিক দল দুটি ক্ষুব্ধ হয়। নির্বাচনের পর রাঙামাটিতে কারচুপির অভিযোগ এনে জেএসএস প্রার্থী এবং দশম সংসদের সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন।

১ জানুয়ারির ওই সংবাদ সম্মেলনে জেএসএস (এমএন লারমা) ও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোটকেন্দ্র দখল এবং জাল ভোট দেয়ার অভিযোগ করা হয়। এ সব কারণে নির্বাচন শেষ হতে না হতেই আবারও সহিংসতা শুরু হয় বলে বিভিন্ন মহল ধারণা করছে। ৪ জানুয়ারি বাঘাইছড়িতে এমএন লারমার কর্মী বসু চাকমা হত্যার ঘটনায় জেএসএসকে দায়ী করে দলটি।

অভিযোগ অস্বীকার করে জেএসএস কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য গুনেন্দু বিকাশ চাকমা বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচনে সাধারণ মানুষের ভোট কেড়ে নিয়েছে এমএন লারমা। বাঘাইছড়ি উপজেলার তুলাবান ও পাবলাখালী গ্রামে ভোটারদের সঙ্গে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সাধারণ মানুষ ক্ষেপে গিয়ে হয়তো বসু চাকমাকে হত্যা করেছে। এঘটনায় জেএসএস দায়ী নয়।

তবে সংঘাতের জন্য আঞ্চলিক দলগুলো প্রশাসন এবং সরকারকে দায়ী করছে। ইউপিডিএফের মুখপাত্র মাইকেল চাকমা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শাসকগোষ্ঠীরা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত জিইয়ে রেখেছে। সরকার চাইলে যেকোনো সময় সংঘাত বন্ধ করতে পারে।

জানতে চাইলে রাঙামাটির পুলিশ সুপার আলমগীর কবির বলেন, ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে হচ্ছে। হত্যাকা-গুলো নিয়ে তদন্ত চলছে। সংঘাত কমিয়ে আনতে পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে।

কাপ্তাই’র রাইখালিতে যে দু’জন প্রাণ হারিয়েছেন, তারা পাহাড়ে স্থানীয় বিববদমান রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাতের বলি। নিহত দু’জনের মধ্যে একজন জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কর্মী। অন্যজন স্থানীয় বাঙালি বাসিন্দা।

গত সোমবার বিকেলের এ ঘটনার জন্য পাহাড়ের আঞ্চলিক দল জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতিকে (জেএসএস) দায়ী করেছে। তবে জেএসএস অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ নিয়ে রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বিবদমান এসব গোষ্ঠীর সংঘাতে গত ১৪ মাসে ৪৯ জন নিহত হলেন।

সর্বশেষ গত ২৯ জানুয়ারি রাঙামাটির লংগদু উপজেলার লংগদু সদর ইউনিয়নের ভুইয়োছড়া গ্রামে ইউপিডিএফের কর্মী পবিত্র চাকমা নিহত হন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বেলা তিনটার দিকে রাইখালীর কারিগড় পাড়ার ফরেস্ট অফিস এলাকায় একটি চা-দোকানে বসে জেএসএসের (এমএন লারমা) কর্মী মংসানু মারমা কয়েক বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন। এ সময় হঠাৎ করে ৮ থেকে ১০ জন দুর্বৃত্তের দল তাঁদের ঘেরাও করে। পরে পালানোর চেষ্টা করলে এলোপাতাড়ি ব্রাশফায়ার করা হয়।

মংসানু মারমা (৪০) ও ট্রাকচালকের সহকারী মো. জাহিদুল ইসলাম (৩২) গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। নিহত জাহিদুলের বাড়ি নোয়াখালীতে। তিনি রাইখালি ইউনিয়নের নারানগিরি গ্রামে থাকতেন। ঘটনার পর কারিগড় পাড়ার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

রাইখালী এলাকাবাসী জানান, দীর্ঘ সময় ধরে কাপ্তাই উপজেলায় জনসংহতি সমিতির ( জেএসএস) আধিপত্য ছিল। গত একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কিছু নেতা-কর্মী রাইখালী এলাকায় এসে দলীয় কর্মকান্ড শুরু করেন। তাঁরা সেখান থেকে রাজস্থলীর বাঙালহালিয়া বাজারেও দলীয় কাজ করতেন।

ঘটনার দিন সকালে সাংগঠনিক কাজে জনসংহতি সতিমির (এমএন লারমা) কর্মী মংসানু মারমা কারিগড়পাড়ায় যান। মংসানু মারমার বাড়ি একই ইউনিয়নের নারানগিরিমুখ গ্রামে। ঘটনাস্থল থেকে তাঁর বাড়ি চার থেকে পাঁচ কিলোমিটার।

জনসংহতি সমিতির (এমএন লারমা) কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরা বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবে কাপ্তাইয়ে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সশস্ত্র সদস্যরা এ হামলা চালিয়েছে। ঘটনায় আমাদের একজন সক্রিয় কর্মী ও একজন সাধারণ বাঙালি নিহত হয়েছেন।’

এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে ও প্রকৃত অপরাধীকে আইনে আওতায় এনে শাস্তিও দাবি করেন তিনি।
এ অভিযোগের বিষয়ে জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) তথ্য ও প্রচার বিভাগের সদস্য দীপায়ন খীসা বলেন, এ ঘটনায় জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) সম্পৃক্ততার প্রশ্নই আসে না এটা তাদের বিরোধের ফসল।

সূত্র: দৈনিক সংগ্রাম

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: ইউপিডিএফ, উপদলীয় কোন্দল, জেএসএস
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

20 − three =

আরও পড়ুন