রাঙামাটি সরকারি কলেজ: অধ্যক্ষের দায়িত্বহীনতা, জায়গা দখল করে বাড়ি নির্মাণ লাইব্রেরিয়ানের

fec-image

রাঙামাটি সরকারি কলেজ পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যের বৃহত্তর পাঠশালার নাম। এ কলেজ থেকে দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি শিক্ষা অর্জন করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ কাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। ১৯৬৫সালের পহেলা জুলাই রাঙামাটি সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। কলেজটি বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য স্বপ্নের ঠিকানা।

কলেজটিতে স্বাধীনতার পর থেকে শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন কোন উন্নতি না ঘটলেও বর্তমান আ’লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে দেশের এ প্রাচীন কলেজটির দিকে সুনজর দেয়। এ সরকারের আমলে বর্তমানে কলেজে ১৭টি বিষয়ে অনার্স, মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়েছে। কলেজে ১৩২ শয্যার ছাত্রীবাস, ৫তলা বিশিষ্ট পরিক্ষা হল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নির্মিত হচ্ছে স্বাধীন দেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল।

ঐতিহ্যর স্বাক্ষী কলেজটির বর্তমান অধ্যক্ষের দায়িত্বহীনতার সুযোগ নিয়ে নিজের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কলেজের জায়গা জবর-দখল নিয়ে স্থায়ী বসতি নির্মাণ করেছে কলেজের লাইব্রেরিয়ান মঈনুদ্দীন তারেক। শুধু তাই নয়; তিনি তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও প্রভাষকদের জন্য বরাদ্ধকৃত কোয়ার্টারে বসবাস করেন পরিবার-পরিজন নিয়ে।

বাড়ি নির্মাণকে কেন্দ্র করে কলেজের এক প্রভাষক তাকে মৌখিকভাবে বাধা দিলে তিনি ওই প্রভাষককেও গালাগাল এবং মারার জন্য উদ্যত হন। কলেজের মাসিক সভায় বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা হলেও কলেজের অধ্যক্ষ সুকৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে যান। বিষয়টি তিনি দেখছেন এবং সুরাহ করবেন বলে সময় ক্ষেপন করতে থাকেন।

কলেজের একাধিক শিক্ষক এবং কর্মচারীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লাইব্রিয়ান মঈনুদ্দীন তারেক সব সময় ক্ষমতার দাপট এবং দাম্বিকতা নিয়ে কথা বলেন। তার ভয়ে তটস্থ থাকে কলেজের প্রশাসন। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষকদের জন্য বরাদ্ধকৃত কোয়াটার দখল করে নিজ পরিবার নিয়ে বাস করছেন। শুধু তাই নয়; তিনি কলেজের জায়গা দখল করে স্থায়ী বসতি নির্মাণ করেছেন। এ নিয়ে শিক্ষক-কর্মচারীরা কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বনতাকে দুষছেন।

তারা বলেন, অধ্যক্ষ মহোদয় যদি লাইব্রেরিয়ান মঈনুদ্দীন তারেককে বাড়ি নির্মাণ করতে বাধা দিতেন এবং শিক্ষকদের কোয়াটারে বসবাসের সুযোগ না দিতেন তাহলে তিনি এ ধরণের দু:সাহস দেখাতে পারতেন না। তারা ক্ষোভের সাথে আরও বলেন, এই লাইব্রেরিয়ান বাড়ি নির্মাণের সময় এক প্রভাষক বাধা দিলে তাকেও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল এবং মারার জন্য উদ্যত্ত হন। এ বিষয়ে কলেজের অধ্যক্ষকে অবহিত করলে তিনি মীমাংসা করবেন বলে আশ্বস্থ করেন।

এদিকে অত্র কলেজের শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, কলেজে যেসব বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স কোর্স চালু হয়েছে তার জন্য অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন, কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ জাফর আহম্মেদ এবং উপাধ্যক্ষ বিধান চন্দ্র বড়য়া। তারা উভয়ই প্রচেষ্টা চালিয়েছে কলেজের উন্নয়নে। শুধু তাই; তাদের দায়িত্বপালনকালীন সময়ে কলেজের পাকা সড়কও নির্মাণ করে দিয়ে গেছেন।

কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ বছর ধরে কোন পরিবহন ছিলো না। এ নিয়ে বেশিরভাগ সময়ে কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন-সংগ্রাম করেছিলো। আর কলেজের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আশায় প্রদীপ জ্বালাতে পরিবহন ক্রয়ের জন্য একটি ফান্ড রেখে গেছেন অধ্যক্ষ জাফর আহম্মেদ এবং উপাধ্যক্ষ বিধান চন্দ্র বড়ুয়ার ।

কিন্তু তাদের বিদায়ের পর দায়িত্ব নিয়ে আসা কলেজের অধ্যক্ষ মো. মঈন উদ্দীন শিক্ষার্থীদের ফান্ডের টাকা দিয়ে কলেজের জন্য মাইক্রোবাস ক্রয় করে শিক্ষার্থীদের আশার প্রদীপটা নিভিয়ে দেন। এ নিয়ে তৎকালীন সময়ে কলেজের ছাত্র সংগঠনগুলো মানববন্ধন, মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে তুখোড় প্রতিবাদ জানান এবং স্থানীয়, জাতীয় গণমাধ্যমে এ বিষয়ে ফলাও করে রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছিলো।

মাইক্রোবাসটি নিয়ে কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ একাধিবার বলেছেন, বাসটিকে কলেজের অফিসিয়াল কাজে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু এ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তিনি বাসটি ক্রয় করে নিজের ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করেছেন। সচেতন শিক্ষার্থীদের অভিমত- মাইক্রো বাসটি কলেজ কর্তৃপক্ষ ক্রয় করে শিক্ষার্থীদের টাকা নষ্ট করেছেন। শিক্ষার্থীদের কোন উপকার হয়নি।

কলেজের একটি সূত্র জানায়, অধ্যক্ষের বাস ভবনটি সরকার অনেক আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করলেও বর্তমান অধ্যক্ষ সেখানে বসবাস করেন এবং কোন রকম অনুমতি ছাড়া নিজের জন্য একটি গভীর নলকূপ স্থাপনও করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত লাইব্রেরিয়ান মঈনুদ্দীন তারেকের অফিসিয়াল মুঠোফোন বেসরকারি টেলিযোগাযোগ সংস্থা বাংলালিংক নাম্বারে একাধিকবার কল করে চেষ্টা চালালেও তাকে পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মো. মঈন উদ্দীন বলেন, আমি লাইব্রেরিয়ান মঈনুদ্দীন তারেকের বিষয়ে অবগত আছি। তাকে বলেছি কলেজের জায়গায় নির্মিত ঘরটি ভেঙ্গে ফেলতে। এ ব্যাপারে তাকে একটি নোটিশও দেওয়া হয়েছে।

অধ্যক্ষ আরও বলেন, লাইব্রেরিয়ানের স্ত্রী গর্ভবতী। লাইব্রেরিয়ান আমাকে বলেছেন, খুব দ্রুত ঘরটি ভেঙ্গে ফেলবেন এবং এখান থেকে বদলি নিয়ে চলে যাবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যক্ষ জানান, কলেজের উন্নয়নের জন্য চেষ্টা করেছি। বাকী যেজন আসবেন তিনি আমার রেখে যাওয়া কাজগুলোর পরিসমাপ্তি ঘটাবেন।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাঙামাটি
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

18 − 2 =

আরও পড়ুন