পার্বত্য মেলা

রাজধানীতে যেন এক টুকরো পাহাড়

fec-image

রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ যেন পরিণত হয়েছে এক টুকরো পাহাড়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী মানুষের জীবন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা এবং পাহাড়ে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর প্রচার ও বিপণনের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে জন্য প্রতিবছর পার্বত্য মেলার আয়োজন করা হয়।

গত বৃহস্পতিবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নন্দনমঞ্চে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত চার দিনব্যাপী (১২-১৫ জানুয়ারি) ‘পার্বত্য মেলা-২০২৩’ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভপতিত্ব করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পার্বত্য মেলায় সারিসারি স্টলে সাজানো পাহাড়ি নানা ধরনের পোশাক, খাবার ও পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা ফলমূল। এছাড়াও রয়েছে পাহাড়রে নানান পণ্যসামগ্রী। যা দেখে মুহূর্তেই মনে এ যেন রাজধানীর বুকে জন্ম নেওয়া এক টুকরো পাহাড়। তবে পার্বত্য মেলা হলেও পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী জনগণের পাশাপাশি দেখা যায় বাঙালি জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি ।

পার্বত্য মেলায় ঘুরতে আসা কয়েকজন বাঙালি জনগোষ্ঠীর সাথেে পার্বত্যনিউজের কথা হয়। তারা জানান, মূলত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীদের জীবন ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পার্বত্য মেলায় আসা। এছাড়া পাহাড় থেকে সংগ্রহ করা বিশুদ্ধ ফলমূল যা ঢাকায় পাওয়া যায় না সেসব কেনার জন্যই এখানে এসছি।

তিনি আরো জানান, পাহাড়ের বিখ্যাত খাবার বাঁশ কোড়ল যা পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙালি জনগোষ্ঠীর খুবই পছন্দ। তাই পাহাড়ের জনপ্রিয় কিছু খাবারের দোকান ঘুরে খাবার কিনবেন বলেও জানান তিনি।

স্টল নম্বর ৯৩ রাঙামাটির বিলাইছড়ি থেকে আসা পাংখোয়া পাড়া তাঁত শিল্প সমিতির ক্রসনেম পাংখোয়া জানান, এবার মেলার বিক্রির জন্য নিজে হাতে বোনা থামি, উৎরি, মাফলার, শাল, শীতের কম্বল, মুতি গামছা, টপস, অনপিস, মহিলা-পুরুষদের ব্যাগ, মানিব্যাগ, লুঙ্গি, ফতুয়া, ওড়না এনেছি। তবে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী কিছু পোশাক যা দেখে বাঙালি জনগোষ্ঠী আকৃষ্ট হচ্ছে এবং তারা সেগুলি সংগ্রহ করছে।

তবে এবার মেলায় বেচাকেনা ভালো হলেও আগের তুলনায় খরচ বেশি হওয়ার লাভবান হওয়া কঠিন হয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।

খাগড়াছড়ি থেকে আসা তুমবাজ কাঁচা বাজার স্টলের মালিক মিত্র চাকমা জানান, পাহাড়ের গহীন বন থেকে সংগ্রহ করা ফল নিয়ে আসা হয়েছে পার্বত্য মেলায়। মূলত পাহাড়ের খাঁটি ফলমূল দেশবাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য এমন উদ্যোগ। এখানে থানকুনি পাতা থেকে শুরু করে কলার মোচা, বাঁশ কোড়ল, তারাগাছ, কচুশাক, কচুলতি, কাঁচা-পাকা পেঁপে, কলাসহ অনেক কিছুই পাওয়া যাবে। যেগুলোর অধিকাংশই প্রকৃতি থেকে সংগৃহীত। আর এসব সবজি কীটনাশক, রাসায়নিক এবং ফরমালিনমুক্ত বলে তাজা এবং ভেজালমুক্ত সবজি কিনতে প্রতিদিন মেলায় ভিড় করছে ক্রেতারা।

এই স্টলে গহীন বন থেকে সংগ্রহ করা প্রতি কেজি মধু ১৮শ টাকা, পেঁপে ১শ, আমলকি ১৫০ টাকা, কাঁচ কলা ১০ টাকা পিস, চম্পা কলা ১ হালি ৯০ টাকা, আনারস ৫০ টাকা পিস, মিষ্টি কুমড়া ৮০ টাকা কেজি, বেগুন ১শ টাকা কেজি, মিষ্টি আলু ১শ টাকা কেজি, খাচাবা আলু ৮০ টাকা কেজি, শসা, আলু, চিকন কচু, মরিচ, কাঁঠাল বিক্রি হতে দেখা যায়।

পাহাড়ি খাবারের স্টল বান্দরবান সাঙ্গু সেন্টারের মালিক পুইসিং মারমা বলেন, পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী সকল খাবার এই স্টলে রাখার চেষ্টা করেছি। তবে এখানে ব্যাম্বু চিকন বা বাঁশ মুরগি, থানকুনি পাতার সালাদ, কচিবাঁশের ভাজি, সবজি সিদ্ধ সঙ্গে সুচ মরিচের ভর্তা, মাছের কাবাব, মাশরুমের তরকারি, মাছের কাঠি কাবাব, মিষ্টি কুমড়ার ফুলের তরকারি বাঁশ কোড়ল পাওয়া যাবে। এছাড়াও এ স্টলে পাহাড়ের দেশি মোরগ, হাঁসের মাংস ও বাহারি ভর্তা মিলবে।

পার্বত্য মেলায় অংশ নিয়েছে বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। মেলায় অধিদপ্তরের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা গোপন চৌধুরী জানান, সমতলের মানুষের কাছে পাহাড়ের উৎপাদিত কৃষি পণ্য সম্পর্কে জানাতে আমাদের এই আয়োজন। এই স্টলে রয়েছে আলু, জুম আলু, ধানি মরিচ, তেতুঁল, হরিতকি, গাছ আলুর ছড়া, মানকচু, জলপাই, তিত বেগুন, সফেদা, তিল সাদা, আঁশ কচু, মাচ ফল, লাল বিন্নি চাউল, সাদা বিন্নি চাউল, সবজি হলুদ, কাজু বাদাম, কমলা, কফি, মিষ্টি কুমড়া, মাদ্রাজী, অগ্নিশ্বর কলা, জুমের চাল, কুমড়া, কাসাভা পেঁপে, আনারস, জাম্বুরা, লেবু, নারিকেল, পঞ্চমুখ কঁচু, মেটে আলু, মিষ্টি ভুট্রা। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের পাহাড়ি কৃষি পণ্য। এগুলো বিক্রির জন্য নয়, মূলত প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে ।

এসব কৃষি পণ্য যা জুমে উৎপাদিত হয় এবং সম্পন্ন ফরমালিন মুক্ত। তবে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনের কষ্টের মাধ্যমে এই বিশুদ্ধ কৃষি পণ্য উৎপাদিত হয়ে থাকে বলেও তিনি জানান।

উল্লেখ্য, ২০১৪ সাল থেকে পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রাণালয়ের আয়োজনে পাহাড়িদের জীবন, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং পাহাড়ে উৎপাদিত পণ্য সামগ্রীর প্রচার ও বিপণনের মাধ্যমে তাদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার লক্ষ্যে পার্বত্য মেলার আয়োজন করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন