রাষ্ট্রকে যারা চ্যালেঞ্জ করে তারা আহাম্মক- রাঙামাটিতে আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ

fec-image

১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি সাক্ষরিত হয় এবং তারপরে এ অঞ্চলের শান্তিকে স্থায়ী করার জন্য সরকার এবং আমি মনে করি এ অঞ্চলের যারা জনপ্রতিনিধি আছেন, শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ আছেন, যারা প্রত্যেকে পজিটিভ। আমরা দেখছি সাম্প্রতিককালে এ অঞ্চলকে আবারো হুমকির মধ্যে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে। খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজিকে এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করে এলাকার মানুষকে বিভিন্নভাবে অত্যাচার করার চেষ্টা, অপপ্রয়াস আমরা লক্ষ্য করছি।

গত ৫ বছরে এ অঞ্চলে শুধুমাত্র রাজনৈতিক খুন ও উপদলীয় কোন্দলের কারণে খুন হয়েছে ১৩৫টি। উপদলীয় কোন্দলের কারণে গড়ে প্রতি ২ মাসে ৫ জন করে খুন হয়েছে। এবং যারা খুন হয়েছেন তারা অনেকে রাজনীতি করেন। তারা অনেকে গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং অনেকে খুন হয়েছেন। শুধুমাত্র দেশের জন্য কাজ করেন তারা, জনগণের সর্মথনে তারা নেতা- সে কারণে খুন হয়েছেন।

এখানে অপহরণকে নিত্যনৈমিত্তিক একটা কাজে, পেশায় অনেকে পরিণত করার চেষ্টা করছে। চাঁদাবাজির কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ১৯৯৭ সালে যে শান্তিচুক্তি করা হয়েছিল তার মূল লক্ষ হচ্ছে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন। প্রাণহানি, অশান্তি, রক্তপাত, হানাহানি খুনাখুনির পরিবর্তে এ অঞ্চলের মানুষকে বাংলাদেশের উন্নয়নের যে মেইনস্ট্রিম , সেই মেইনস্ট্রিম এর সঙ্গে একাত্ম করে এগিয়ে যাওয়াই এ শান্তি চুক্তির উদ্দেশ্য।

আমি মনে করি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য এটি পরম সৌভাগ্য যে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনি, যিনি ১৯৯৭ সালে এই শান্তি চুক্তির রূপকার হিসেবে এ অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যিনি তখনকার সময়ে প্রধানমন্ত্রী এবং এখন আবার প্রধানমন্ত্রী, সেই জন্য আমি মনে করি এটি এ অঞ্চলের মানুষের জন্য বিরাট সুযোগ।

এবং এই যে বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে এ অঞ্চলের অগ্রগতিকে, উন্নয়নকে ঠেকিয়ে দেয়ার একটা চেষ্টা হচ্ছে, সেটাকে আমরা সবাই মিলে এ এলাকার শান্তিপ্রিয় নিরীহ মানুষ, সকল মানুষ, জনপ্রতিনিধি, সকল শ্রেণি পেশার যারা নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন, সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিয়ে এই অপশক্তিকে পরাজিত করার সময় এসেছে। আমরা চাই বাংলাদেশের অন্য ১০টা জেলার মত, বাংলাদেশের অন্য সকল জেলার মত পার্বত্য অঞ্চলেও শানৈ শানৈ উন্নতি হবে। এবং সেই উন্নয়নে যেই অভিযাত্রা, সেই অভিযাত্রায় আপনারা সবাই সঙ্গী হবেন।

আপনারা যদি দেখে থাকেন শান্তি চুক্তির আগে এ অঞ্চলের রাস্তাঘাটের কী অবস্থা ছিল, এখন কি অবস্থা। সেই সময় কয়টা স্কুল ছিল, এখন কয়টা স্কুল আছে। সেই সময় কয়টা হসপিটাল ছিল, এখন কয়টা হসপিটাল আছে। এখন এখানে যদি আমরা এই খুনাখুনি, অপহরণ, চাঁদাবাজীকে স্তব্ধ করে দিতে পারি। খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে। এ অঞ্চলকে বলা হয় সুইজারল্যান্ড অব দ্যা ইস্ট, অপরূপ প্রকৃতির লীলাভূমি এই ৩ টা পার্বত্য জেলা।

যদিও আমাদের সমস্যা রয়েছে তারপরেও দেখেন এখানে যেভাবে রিসোর্টগুলো হচ্ছে, ট্যুরিজম গড়ে উঠছে, যেকোন দেশে যখন ট্যুরিজম হয়, ডেভেলপ করে, তখন স্থানীয় জনগণরা প্রথম ক্লায়েন্ট হয়। এবং স্থানীয় জনগণরা ট্যুরিজমকে ডেভেলপ করার পরে আন্তর্জাতিক ট্যুরিস্টরা আসে।

বাংলাদেশে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যখন ক্ষমতা নেন ২০০৯ সালে, তখন এ দেশের পার কেপিটা ইনকাম ছিল মাত্র ৫৬০ ডলার, যেটি এখন প্রায় ২৯০০ ডলারের কাছাকাছি। মানুষের কাছে এখন প্রচুর, পর্যাপ্ত টাকা আছে, ইংরেজিতে যেটাকে বলে ডিসপোজেবল মানি । ডিসপোজেবল মানিকে তারা খরচ করতে প্রস্তুত। ঢাকায় শুক্রবার, শনিবার হলেই ৩ দিন ছুটি থাকলে ঢাকা ফাঁকা হয়ে যায়, সব বাইরে চলে আসে। এখন এ অঞ্চলে আস্তে আস্তে ট্যুরিজম ডেভেলপ করছে।

আপনারা জানেন যে, আপনাদের এই পাহাড়ের মধ্যে প্রতি রাতে ২৫ হাজার টাকা ভাড়া দিয়ে মানুষ থাকে। তার মনে এ অঞ্চলে পর্যটনের একটা বিশাল খাত তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে। এবং সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। এবং এটার মাধ্যমে শুধু এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন নয় বাংলাদেশের জিডিপিতেও এ পার্বত্যাঞ্চল একটা বিশাল অবদান রাখতে পারে।

আমরা চাই যে এ অঞ্চলে যে অর্থনীতির সুযোগ রয়েছে সেই সুযোকে বাস্তবায়ন আমরা সবাই মিলে করব। যাতে করে যেটা বলছিলাম, এখানকার মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হওয়া চাই। এবং এই ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে হলে এ অঞ্চলে  বসবাসকারী প্রত্যেকটি মানুষকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে না বলতে হবে। খুনাখুনির বিরুদ্ধে না বলতে হবে। অপহরণের বিরুদ্ধে না বলতে হবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি। বাংলাদেশ সরকার আপনাদের সঙ্গে আছে। এদেশের ১৮ কোটি মানুষ আপনাদের সঙ্গে আছে। প্রধানমন্ত্রীর পূর্ণাঙ্গ সমর্থন আপনাদের জন্য আছে।

আগামীতে আপনারা ঐক্যদ্ধ হবেন এবং আমরা সবাই মিলে, এই যে এখানে আপনাদের সদস্য বাহিনী কাজ করে, এখানে আমাদের পুলিশ বাহিনী কাজ করে, প্রশাসন কাজ করে, সরকারের বিভিন্ন বিভাগ এখানে কাজ করে। এবং সবাই পাহাড়ের উন্নয়নের জন্য সরকার প্রদত্ত নির্দেশনা আছে সেগুলো বাস্তবায়ন করছে। আমরা চাই এই সম্মিলিত উদ্যোগকে আমরা সামনে এগিয়ে নেবো। মাত্র গুটিকয়েক লোক, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হিসেবে এই সন্ত্রাসীদের সংখ্যা ইভেন দুই হাজার হবে না।

আর এ এলাকার ৩ জেলায় আপনারা ১৬ লক্ষ লোক বসবাস করেন, আর বাংলাদেশে বসবাস করেন হচ্ছেন ১৮ কোটি। এখানে বসবাস করেন ১.৬ মিলিয়ন আর বাংলাদেশে বসবাস করে ১৮০ মিলিয়ন। ১৮০ মিলিয়নের বাইরে এই অঞ্চলের মানুষ নন। অতএব রেস্ট অব দি কান্ট্রি, সেখানে যদি চাঁদাবাজি প্রতিহত করা যায়, সেখানে যদি এধরনের সংঘবদ্ধ অপহরণ অপরাধ প্রতিহত করা যায়। হোয়াই নট ইন চিটাগং হিল ট্রাক্টস।

অতএব আমরা এই ক্ষমতা, এটির যে সুযোগ, সেটি আমাদের সবার রয়েছে। এবং আমি সবসময় বলি, সন্ত্রাসীদের বলি, নেভার আন্ডার এস্টিমেট দ্যা পাওয়ার অব দি গভার্নমেন্ট, এন্ড দ্যা পাওয়ার অব দ্যা পিপল। জনগণের ক্ষমতা এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা যারা অবজ্ঞা করার দুঃসাহস দেখায় তারা আহম্মক। রাষ্ট্রের কাছে এই সমস্ত অপশক্তি, জনগণের কাছে এই সমস্ত অপশক্তি অতি তুচ্ছ।

আপনাদের সহযোগিতা নিয়ে এই হাজার দুয়েক লোককে টুকায়ে নিয়ে আসব আমরা, বাড়ি বাড়ি গিয়ে টুকায়ে নিয়ে আসব আমরা, মাটির তলে ঢুকলে সেখান থেকে বের করে নিয়ে আসব। এবং আপনাদের সমর্থন নিয়েই আমরা এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের যে লড়াই, সেই লড়াইয়ে ইনশাল্লাহ, এ অঞ্চলের জনগণের সক্রিয় সমর্থনে আমরা বিজয়ী হবো। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, অপরাধের বিরুদ্ধে, অপহরণের বিরুদ্ধে, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে, উন্নয়ন বিরোধী ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একটাই আমাদের কাজ সেটা হলো বিজয়ী হওয়া। সমস্ত অপশক্তির বিরুদ্ধে বিজয়ী হওয়া। সেই বিজয়ী হবার বিকল্প একটাই সেটা হচ্ছে শুধুমাত্র বিজয়ী হওয়া।

আমরা যারা বসে আছি এখানে, আপনারা সামনে বসে আছেন, আমাদের হাত একত্রিত হলে আমরা সকল অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলব ইনশাআল্লাহ। কোন অসম্ভবই আমরা অসম্ভব থাকতে দেবোনা। যখন এ অঞ্চলে অশান্তি ছিল ১৯৯৬ বা তার আগে তখন বাংলাদেশ একটি খুবই দরিদ্র দেশ ছিল, খাদ্যাভাব ছিল এখানে, চিকিৎসার অভাব ছিল এখানে, আমরা ছিলাম ঝড়ের দেশ, বন্যার দেশ, অপঘাতের দেশ, স্বাস্থ্যখাতে শিশু মারা যেত হাজারে ৪০০/৫০০ এর মতো, গড় আয়ু ছিল ৪০ এর নিচে।

আজকের বাংলাদেশ ভিন্ন বাংলাদেশ। আগে ৪০০ ডলারের বাংলাদেশ হলেও আপনারা যারা এখানে বসে আছেন আপনারা এমন একটা দেশের জনগণ যাদে মাসিক আয় প্রায় ৩০০০ ডলার। সকল সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যগণ সেই ডলার আয়ের সদস্য। যোগ্যতা, দক্ষতা, ক্যাপাসিটি বহু বহু গুণ বেশি।

অতএব আমরা মনে করি, সময় এসেছে, আমাদের সুযোগ নিতে হবে। রাস্তা উন্নয়ন করতে গেলে চাঁদা নিতে আসে। পাহাড়ের লোকজন কলা বেচতে গেলেও চাঁদা নিতে আসে। শ্রদ্ধেয় এক নেতা-মন্ত্রী সাহেব বলছিলেন যে, এক পাহাড়ি নাগরিক পুলিশের চাকরি করতো, অপরেশনাল কাজে গিয়ে তার মৃত্যু হয় , সরকার তার পরিবারকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা করলে সেখান থেকেও চাঁদাবাজি করতে আসে। কত নির্মম এই লোকগুলো! কত নিষ্ঠুর এই লোকগুলো !

আর আরেকটা বিষয়ে বলব, যারা এ সমস্ত কাজে আছেন, ছেড়ে দেন, ফিরে আসেন , স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লড়াইয়ে এই পাবর্তাঞ্চলের উন্নয়নের লড়াইয়ে আপনারা শামিল হয়ে যান। এ সমস্ত অপকর্ম আপনাদের ছাড়তে হবে এবং না ছাড়লে এলাকার জনগণ আপনাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে। সুতরাং সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি নিজ উদ্যোগে এই সকল পাপ কর্ম, অপকর্ম ছাড়বেন কি না আপনারা সিদ্ধান্ত নিন। না ছাড়লে এলাকার জনগণ আপনাদের ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবে। এবং তার সঙ্গে আছি, জনগণের সঙ্গে আছি। আমরা পর্যায়ক্রমে এই পাহাড়ে যেখানে যেটা প্রয়োজন সেখানে সেটার স্টল নিয়েছে এবং সেটা শান্তিচুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ সেখানে পুলিশ বাহিনীকে পদায়ন করা হবে। সকল সিকিউরিটি ফোর্স সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার, বিজিবি মিলে আপনাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করব।

আপনারা আমাদের সমর্থন যোগাবেন। ভয় পাবেন না! এখানে অসংখ্য পলিটিক্যাল মার্ডার হয়েছে। তদন্ত করতে গেলে আপনারা ভয়ে আপনারা এগিয়ে আসেন না। দরকার হলে প্রত্যেক সাক্ষীর জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হবে। মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক ব্যক্তিকে আমরা নিরাপত্তা দিব। কিন্তু এই দুষ্টু খুনাখুনির সার্কেল থেকে আপনাদের বেড়িয়ে আসতে হবে। যারা এ ধরনের অপকর্ম করছেন তাদেরকে আমরা সবাই মিলে বিচারের মুখোমুখি করব। এ দেশ একটি সভ্য গণতান্ত্রিক দেশ, আমরা তাদের প্রত্যেককে আইনের মুখে দাঁড় করাবো। আমাদের আর অপচয় করার সময় নাই।

আমাদের এ অঞ্চলের মানুষদের দেশের অন্যান্য মানুষদের সাথে সমন্বয় করতে হলে তারা যদি হেঁটে হেঁটে সামনে যায়, তাহলে এ এলাকার মানুষদের দৌঁড়ে দৌঁড়ে সামনে এগোতে হবে অগ্রসরমান অগ্রযাত্রায়। সে অগ্রযাত্রায় একত্রিত হয়ে কর্তব্য পালন করবো আপনাদের।  আপনারা যারা বসে আছেন এবং সরকারি সকল ফোর্স ও সিকিউরিটি মিলে এই অপশক্তিকে পরাজিত করে শান্তিকে চূড়ান্তভাবে, স্থায়ীভাবে এখানে প্রতিষ্ঠা করব ইনশাআল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে। এবং আপনারা প্রত্যেকেই দেশের বাকি এলাকার মত উন্নয়নের অভিযাত্রায় সমান শরিক এবং শামিল হবেন।

আমরা চাইব আগামী দিনে এই চিটাগং এর হিল ট্রাক্টসে আমাদের এই অহংকারের অঞ্চল, সেখানে উন্নয়ন ঘটবে, সমৃদ্ধি ঘটবে, বিকাশ ঘটবে, অর্থনীতির নানান অগ্রগতি হবে। আর আপনারা প্রত্যেকে এর অংশীদার হবেন। এতে এ এলাকার মানুষের ভাগ্যের ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন হবে। স্কুল, কলেজ সহ অবকাঠামো উন্নয়নে তাক লাগানো পরিবর্তন চাই। সে পরিবর্তনে আপনারা শামিল থাকবেন।

 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 4 =

আরও পড়ুন