রোহিঙ্গাদের সামাজিকভাবে অন্তর্ভুক্তকরণের বিশ্বব্যাংকের প্রস্তাব মানার শর্ত দিয়েছে জাতিসংঘও

fec-image

সামাজিকভাবে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার ব্যাপারে বিশ্বব্যাংক যে প্রস্তাব দিয়েছে, সেটি মেনে নিতে বলেছে জাতিসঙ্ঘের উদ্বাস্তুবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে এক লাখ রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরে বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন এবং স্থানান্তরিত করতে রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে বিশ্বব্যাংকের দেয়া প্রস্তাব মেনে নেয়ার এই শর্ত দিয়েছে ইউএনএইচসিআর।

বিশ্বব্যাংক উদ্বাস্তুনীতি পর্যালোচনা রূপরেখায় বিশেষ তহবিল থেকে অর্থায়নের জন্য সরকারকে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সমাজের সাথে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের এ প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সাথে ইউএনএইচিআরকে এ শর্ত থেকে সরে এসে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমানে উভয়পক্ষ অন্যান্য শর্তে কিছু ছাড় দিয়ে এমওইউ সইয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি মাসে এই এমওইউ সই হলে সেপ্টেম্বর থেকে ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রম শুরু করবে ইউএনএইচিআর।

রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় চীনের রাষ্ট্রদূতের সাথে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেন বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি শরণার্থী আশ্রয়দানকারী দেশের জন্য বিশ্বব্যাংক একটি রিপোর্ট তৈরি করেছে। এ রিপোর্টের লক্ষ্য হচ্ছে শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ কমানো এবং তাদের আশ্রয়দানকারী দেশের সমাজে ইন্টিগ্রেট (অন্তর্ভুক্ত) করে নেয়া। শরণার্থীদের জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করা। তবে বাংলাদেশের অবস্থান হচ্ছে, সরকার নির্ধারিত সংজ্ঞায় রোহিঙ্গাদের শরণার্থী বলা সুযোগ নেই।

মিয়ানমারের বাস্তুচ্যুত ও নিপীড়িত জনগোষ্ঠী হিসেবে তাদের অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বাংলাদেশের অগ্রাধিকার। মিয়ানমার তাদের ফিরিয়ে নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এ প্রতিশ্রুতির চার বছর পরও তারা একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি। তবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়া হবে না- এ কথা মিয়ানমার কখনো বলেনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট সম্পর্কে আমরা অবগত ছিলাম না। ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সেবা দেয়ার শর্ত হিসেবে বিশ্বব্যাংকের রিপোর্টের রেফারেন্স দিয়েছে ইউএনএইচসিআর। এ রিপোর্টে অনেক ইস্যু রয়েছে। এর মধ্য উল্লেখযোগ্য হলো স্থানীয়দের মতো কাজ করার জন্য উদ্বাস্তুদের সব আইনি অধিকার দিতে হবে। তাদের জন্ম, মৃত্যু প্রভৃতি নিবন্ধন করতে হবে। উদ্বাস্তুদের জন্য অবাধ চলাচলের স্বাধীনতা, জমি কেনার ক্ষমতা ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার দিতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশী নাগরিকদের মতো প্রতিনিধি নির্বাচনের অধিকারও তাদের দিতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশী নাগরিকদের সাথে উদ্বাস্তুদের বৈষম্য করা যাবে না। এসব উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাংক ২০০ কোটি ডলারের একটি তহবিল গঠন করেছে। প্রস্তাবে রাজি হলে বিশ্বব্যাংক এই তহবিল থেকে সংশ্লিষ্ট দেশকে অর্থ সরবরাহ করবে।

শরণার্থী না হওয়ায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সমাজে অন্তর্ভুুক্তির প্রস্তাব সরকার সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে উল্লেখ করে ড. মোমেন বলেন, এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের সাথে আমাদের চিন্তাভাবনার মোটেই মিল নেই। আমরা চাই, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য রোহিঙ্গারা মিয়ানমার ফিরে যাক। আর বিশ্বব্যাংকসহ জাতিসঙ্ঘের সংস্থাগুলো এতে সহায়তা দিক।

তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশী সরকারগুলো দীর্ঘকালীন কর্মসূচি হাতে নেয়ার চেষ্টা করছে। আমরা এ ধরনের প্রচেষ্টার বিপক্ষে। আমরা মনে করি, রোহিঙ্গাদের অস্থায়ীভাবে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়া হয়েছে এবং তাদের জন্য কর্মসূচিগুলোও হতে হবে স্বল্পমেয়াদি। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছি। এ দু’টি অবস্থানের মধ্যে কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট হয়তো হবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে আমাদের ওপর চাপ অব্যাহত রাখবে।

বাংলাদেশের ওপর বিশ্বব্যাংক কী ধরনের চাপ প্রয়োগ করতে পারে- জানতে চাওয়া হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভবিষ্যতে তার হয়তো টাকা-পয়সা দিতে ঝামেলা করবে। তবে রোহিঙ্গাদের নামে বাংলাদেশে যে অর্থ বাইরে থেকে আসে, তার চেহারাটাও আমরা দেখি না। ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই অর্থ খরচ করে। বিশ্বের নানা দেশ বাংলাদেশের নামে টাকা পাঠায়। কিন্তু তা বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জন্য বরাদ্দ হয়। এসব সংস্থা কোন খাতে কত খরচ করে, তার বিস্তারিত আমরা পাই না।

ড. মোমেন বলেন, কিছু দিন আগে অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে আলাপ হয়েছিল। তিনি জানালেন, রোহিঙ্গাদের জন্য অস্ট্রেলিয়া অনেক টাকা-পয়সা দিচ্ছে। আমি বললাম, আপনারা রোহিঙ্গাদের জন্য যে অর্থ পাঠান তার একটি ক্ষুদ্র অংশ স্থানীয়দের উন্নয়নের জন্য সরকারের মাধ্যমে ব্যয় হয়। অস্ট্রেলিয়া রোহিঙ্গাদের জন্য ১৩৩ মিলিয়ন ডলার দিয়েছে। এর মধ্যে মাত্র পাঁচ অথবা ছয় মিলিয়ন ডলার স্থানীয়দের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এটি স্থানীয়দের চাহিদার চেয়ে কিছুই না।

‘রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের একার দায়িত্ব না’ মন্তব্য করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই দায়িত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের, যা সবাইকে ভাগ করে নিতে হবে। কিন্তু এখন তারা রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের সমাজে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার প্রস্তাব দিচ্ছে। এটি আমরা পছন্দ করছি না।

বাংলাদেশের আপত্তির পর বিশ্বব্যাংক বা ইউএনএইচসিআরের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেছে কি না- প্রশ্ন করা হলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ভাসানচরে স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে ইউএনএইচসিআরের শর্তের মধ্যে আমাদের অপছন্দের বিষয়গুলো বাদ দিয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হচ্ছে।

তিনি বলেন, আমাদের দেশে কিছু লোক আছে যারা বলছেন বিশ্বব্যাংক প্রস্তাব দিয়েছে, অর্থকড়িও দেবে। অসুবিধাটা কী? এরা বিশ্বব্যাংক বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে এসব কথাবার্তা বলছে। এদের সম্পর্কে সবার সাবধান হওয়া উচিত।

ইউএনএইচসিআরের সাথে সমঝোতার অপেক্ষা না করে কক্সবাজারের ওপর চাপ কমানোর জন্য ভাসানচরে অবকাঠামো তৈরি করে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর প্রক্রিয়া আগেই শুরু করে দিয়েছিল সরকার। শুরুতে ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করেছিল। এরপর জাতিসঙ্ঘ, ওআইসি ও পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালায় বাংলাদেশ।

নিউ ইয়র্কে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের সাথে দেখা করে ভাসানচরে মানবিক সেবা শুরুর আহ্বান জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ওআইসি মহাসচিবকে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরের পাশাপাশি ভাসানচরও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পশ্চিমা কূটনীতিকদের জন্য ভাসানচর সফরের ব্যবস্থা করা হয়। মিডিয়ায় চালানো হয় ব্যাপক প্রচারণা। এরপর তিন দফা আলোচনা শেষে কক্সবাজার থেকে ভাসানচরে রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরে সরকারের উদ্যোগকে সমর্থন এবং স্থানান্তরিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিতে বাংলাদেশের সাথে এমওইউ সইয়ে সম্মত হয় ইউএনএইচসিআর।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

four − 3 =

আরও পড়ুন