রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ভবিষ্যৎ কী?

fec-image

মিয়ানমারের সেনাবাহিনী একটি ঠান্ডা এবং নিখুঁত সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গত সোমবার মিয়ানমারের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে। ফলে মিয়ানমার এখন পরিপূর্ণভাবে একটি সেনাশাসিত রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে একটি সামরিক সরকার। ১৯৬২ সাল থেকে ৪৯ বছরের একটানা সেনাশাসনে পিষ্ট গণতন্ত্র ২০১১ সালে এসে সাময়িক দম ফেলার সুযোগ পেলেও ঠিক ১০ বছর পর আবারও সেই গণতন্ত্র পুনরায় সেনাশাসনের বাক্সবন্দী হয়ে পড়েছে।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর দীর্ঘ ৭২ বছরে মিয়ানমারে বেসামরিক লোকজন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছেন মাত্র ১৫ বছর; এর মধ্যে বিগত ১০ বছর মিয়ানমার শাসিত হয়েছে বেসামরিক শাসকের আদলে কিন্তু শাসন করেছে সামরিক শাসক। ফলে, মিয়ানমার আসলে ১৯৬২ সালের পর থেকেই সামরিক শাসনের আওতায় পরিচালিত হয়েছে। তা ছাড়া ২০০৮ সালে সংবিধানে সে সংস্কার করা হয় (পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন, তিনটা মন্ত্রণালয় এবং মিয়ানমারের কমান্ডার-ইন-চিফ হবেন সেনাপ্রধান প্রভৃতি) যার হাত ধরে সেনাবাহিনীর অবস্থান রাষ্ট্র পরিচালনায় কাঠামোগতভাবে পাকাপোক্ত হয়ে যায়। নতুন সেনা অভ্যুত্থান নতুন সেনসেশন তৈরি করলেও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় চরিত্রের খুব একটা এদিক-ওদিক হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু এ সেনা অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মানুষের একটা বড় জিজ্ঞাসা হচ্ছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ কী?

আমরা জানি ২০১৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখের পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, নিষ্ঠুর নির্যাতন, নির্বিচার ধর্ষণ এবং পাইকারি অগ্নিসংযোগ থেকে বাঁচতে ‘জানটা’ হাতে নিয়ে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় গ্রহণ করে। পুরোনো আর নতুন মিলে বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাস করে।
বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য শুরু থেকেই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালের নভেম্বরের ২৩ তারিখ বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে একটা প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরের ১৯ তারিখ একটা টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে একটা ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ চুক্তি হয়, যার শর্ত অনুযায়ী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে দুই বছরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হবে। তার ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১৫ নভেম্বরের এবং ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট দুই দফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার সব ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হলেও সেটা ব্যর্থ হয়, কারণ রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে রাজি হয়নি।

রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরতে রাজি না হওয়ার কারণ হচ্ছে, মিয়ানমার তাদের কোথায় নিয়ে যাবে, তাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া হবে কি না, তাদের জীবনের নিরাপত্তা দেওয়া হবে কি না, তাদের মানবিক মর্যাদা দেওয়া হবে কি না, তাদের ফেলে আসা বসতভিটা ফেরত দেওয়া হবে কি না তার কোনো বিশ্বাসযোগ্য আশ্বাস তারা দেশটির পক্ষ থেকে পায়নি। ফলে প্রথম এবং দ্বিতীয় দফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হয়।

২০২০ সালে করোনাভাইরাসের প্রকোপের কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ ছিল কিন্তু ২০২১ সালের জানুয়ারির ১৯ তারিখ চীনের দূতিয়ালিতে আবার প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য বাংলাদেশের ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু হঠাৎ করে মিয়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে কি না, তা নিয়ে একটা শঙ্কা ও সংশয় তৈরি হয়েছে।

সেনা অভ্যুত্থানের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে বলে মনে হয় না। কারণ সু চির সরকার রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে যেভাবে এগোচ্ছিল এবং বাংলাদেশের সঙ্গে যে চুক্তি করেছিল তাতে সামরিক বাহিনীর সমর্থন ছিল। সুতরাং সামরিক সরকারও সে প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে বলে মনে হয়। তা ছাড়া ২০১৭ সালের নভেম্বরের ২৩ তারিখ যে প্রত্যাবাসন চুক্তি হয়েছিল, সেটা ব্যক্তি সু চির সঙ্গে হয়নি কিংবা সু চির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে হয়নি, চুক্তি হয়েছিল মিয়ানমার রাষ্ট্রের সঙ্গে। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের কারণে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়াটি যেহেতু আবার নতুন সরকারের সঙ্গে করতে হবে, তাই প্রক্রিয়াগত কারণে সামান্য ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

বরং নতুন পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনী যদি স্বপ্রণোদিত হয়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে চায়, তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। সামরিক শাসনের বৈধতা নেওয়ার জন্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নিজেদের ইতিবাচক ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুকে মিয়ানমারের সামরিক সরকার ব্যবহার করতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশের কাজ হবে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে এ সুযোগটা গ্রহণ করা, যাতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা যায়।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে সু চির সরকারও তেমন কিছু করেনি। কিছু চুক্তি, কয়েকবার বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় সফর এবং প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার ‘নাটক’ করা ছাড়া প্রত্যাবাসন ইস্যুতে তেমন উল্লেখযোগ্য এবং কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি মিয়ানমার। এখন বাংলাদেশের কাজ হবে মিয়ানমারের সঙ্গে চলমান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সক্রিয় রাখা এবং সেটাকে বেগবান করা।

ড. রাহমান নাসির উদ্দিন নৃবিজ্ঞানী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 6 =

আরও পড়ুন