“ ১৯৯১ সালে যেসব রোহিঙ্গা শিশু মায়ের কোলে করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, আজ সে শিশুর বয়স ২৯ বছর।”

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কি আদৌ শুরু হবে?

ফাইল ছবি

 

২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যকার স্বাক্ষরিত রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তির ফলে কিছু ইতিবাচক প্রত্যাশা যেমন তৈরি হয়েছিল, ঠিক তেমনি তৈরি হয়েছিল কিছু নেতিবাচক আশঙ্কাও। চুক্তিতে দ্রুত সময়ের মধ্যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

তবে বাস্তবতা হলো, অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। ১৯৯১ সালে যেসব রোহিঙ্গা শিশু মায়ের কোলে করে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, আজ সে শিশুর বয়স ২৯ বছর। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টে নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা প্রায় ১১ লাখের মতো রোহিঙ্গা যদি সেখানে ফিরে যেতে চায়, তবে সবার আগে তাদের প্রয়োজন হবে একটি বাসযোগ্য পরিস্থিতির নিশ্চয়তা।

নৃশংসতার জেরে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত এসব রোহিঙ্গার মাতৃভূমি মিয়ানমার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তারা সেখানেই বসবাস করেছে। নিতান্ত বাধ্য না হলে তারা কেন বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে দিনাতিপাত করতে চাইবে। একটি দেশের আশ্রিত জনগোষ্ঠী হিসেবে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে নিজেদের এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য খুব বেশি কিছু আশা করতে পারে না। অন্তত পূর্ণ নাগরিক সুবিধা তো না-ই।

রোহিঙ্গারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং ইতিবাচক পরিবেশ পেলে মিয়ানমারেই ফিরে যেতে চাইবে। তবে এই ফিরে যাওয়া নিশ্চিত করার জন্য পরিবর্তন হওয়া লাগবে অনেক কিছুরই।

প্রথমত, সবার আগে তাদের শারীরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, রোহিঙ্গারা এখন একটি চরম ভীত-সন্ত্রস্ত জনগোষ্ঠী। তাদের অনেকেই যে পরিমাণ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অথবা তা প্রত্যক্ষ করেছেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না পেলে তারা খুব সহজেই মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাইবেন না। আর এই নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের অবস্থান বড় একটি ফাঁক তৈরি হয়েছে।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর য়ে ভয়াবহ সীমাহীন বর্বরতা হয়েছে, তা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বীকৃত। এই নৃশংসতাকে জাতি নিধনের স্পষ্ট উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কিংবা সাহায্যকারী সংস্থাগুলো রীতিমতো সমালোচনায় ধুয়ে ফেলেছে মিয়ানমারকে। সে দেশের নেত্রী অং সান সুচির আন্তর্জাতিক কিছু পুরস্কারও প্রত্যাহার করা হয়েছে।মোট কথা, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে যে কি পরিমাণ অনাচার আর অন্যায় করা হয়েছে, তা সারা বিশ্বই জানে।

তারপরও মিয়ানমারের সরকার ও সেনাবাহিনী এক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে। তারা দাবি করছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কোনো ধরনের নৃশংসতা ঘটেনি। সেখানে নাকি সাধারণ রোহিঙ্গাদের লক্ষ করে একটি গুলিও ছোড়া হয়নি। সেখানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সংবাদ সংস্থাগুলো নির্দিষ্ট প্রমাণ সাপেক্ষে মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যা, গণধর্ষণ ও সহিংসতাকে মানবতার লঙ্ঘন বলে প্রতিনিয়তই নিন্দা জানিয়ে আসছে, সেখানে মিয়ানমারের সরকার, সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম দাবি করছে-কোনো সহিংসতাই হয়নি।

উল্লেখ্য, এই সহিংসতায় মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জড়িত ছিল স্থানীয় উগ্রপন্থী বৌদ্ধরাও। তবে তাদের বিরুদ্ধে কিন্তু কোনো অভিযোগ নেই। কারণ, তারা সেনাবাহিনীর মদতপুষ্ট। সেখানে মিয়ানমারের সরকার পুরো নৃশংসতার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।  সেখানে রোহিঙ্গারা ফিরে গেলে তাদের ওপর আবার অত্যাচার করা হবে না- এমন নিশ্চয়তার আশা তারা নিশ্চয় করতে পারে না।

এমন এক পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গারা কি মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাইবে? দ্বিতীয়ত, মিয়ানমারে ফিরে গেলে সেখানে জীবনধারণের যাবতীয় সুবিধাপ্রাপ্তির সুযোগ দিতে হবে রোহিঙ্গাদের। স্বাক্ষরিত প্রত্যাবাসন চুক্তিমতে,  রোহিঙ্গাদের তাদের আবাসস্থলে ফিরে যেতে দেওয়া হবে। এখন যদি সত্যিই তাদের জমিজমা ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তবে মৌলিকভাবেই তাদের আবার চলাফেরার স্বাধীনতার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। জীবনধারণের জন্যে তাদের চাষাবাস এবং ব্যবসা বাণিজ্যে অংশ নিতে হবে। এ জন্যে সবার আগে তাদের শারীরিক নিরাপত্তা পুনঃনিশ্চিত করতে হবে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: আদৌ, প্রত্যাবাসন, রোহিঙ্গা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

sixteen − 4 =

আরও পড়ুন