রোহিঙ্গা সংকট আট বছর পেরিয়ে নয় বছর হতে চলল। এই দীর্ঘ সময়ে এই সংকট সমাধানের জন্য কোন কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করা যায়নি। এই সংকট সমাধানে বাংলাদেশ সব সময় আশাবাদী এবং সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সংকট সমাধানে বেশ কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আসিয়ানের ভুমিকা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মালয়েশিয়া আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস জানান যে, মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা ও প্রভাব এই সংকট সমাধানে কাজে লাগতে পারে। আশা করা যায় যে, মালয়েশিয়া তাদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়ার লক্ষ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধান শীর্ষক আলোচনাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশাপাশি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি আসিয়ান সদস্য রাষ্ট্রও সরাসরি সম্পৃক্ত। মানবিক কারণে মালয়েশিয়া প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গাকে সাময়িকভাবে আশ্রয় দিয়েছে। মিয়ানমারে শান্তি ফিরে না আসলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আরও প্রলম্বিত হবে তাই মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার। আসিয়ান বিগত দিনগুলোতে মিয়ানমারের শান্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেও এখনও সফলতার মুখ দেখেনি।
বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাখাইন অঞ্চলে আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তীব্র সংঘর্ষ চলছে। রাখাইন রাজ্যের বেসামরিক নাগরিকরা জান্তা বাহিনীর সাথে আরাকান আর্মির সংঘাতের মধ্যে আটকা পড়েছে। আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলোতে আরাকান আর্মির সদস্যরা রোহিঙ্গাদের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতন চালাচ্ছে। এর ফলে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা তাদের ভিটেমাটি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়ার জন্য ছুটে আসছে।
চলমান সংঘাত, চলাচলের সীমাবদ্ধতা এবং সেনাবাহিনীর বোমাবর্ষণ ও গোলাবর্ষণের কারণে হতাহতের ঘটনা ঘটছে এবং খাদ্য সরবরাহ এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির নৃশংসতার শিকার হচ্ছে এবং তাদের মানবিক সহায়তা পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ডব্লিউএফপির মতে, সক্রিয় সংঘাত এবং ত্রাণ সহায়তার প্রবেশ সীমিত হওয়ার কারণে রাখাইনে সামাজিক উত্তেজনা এবং মানব পাচার বেড়ে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইনে আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় এবং রোহিঙ্গাদের উপর আরাকান আর্মির অত্যাচারের কারনে পরিস্থিতির অবনতি হওয়ায় প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা তাদের ভিটেমাটি থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে। রোহিঙ্গাবিষয়ক জাতীয় টাস্কফোর্স আশংকা করছ যে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান সংঘাত ও পরিকল্পিত সহিংসতায় গত ১৮ মাসে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে। নতুন আগত এই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে, এর ফলে বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গার জন্য বরাদ্দকৃত ত্রাণ সহায়তার উপর চাপ ফেলছে।
বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণে বাংলাদেশের ওপর যে বোঝা চাপানো হয়েছে তা নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্বিগ্ন। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানায় যে, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য মালয়েশিয়া ও কয়েকটি আঞ্চলিক দেশ মিয়ানমারে একটি যৌথ প্রতিনিধিদল পাঠাবে। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে মিয়ানমারের এই মিশন সমন্বয় করবে।
মিয়ানমারে শান্তি নিশ্চিত করা এবং জাতিগত সংখ্যালঘুদের ওপর যে নৃশংসতা চলছে, তার একটি শান্তিপূর্ণ সমাধান খুঁজে বের করা এই মিশনের মূল উদ্দেশ্য। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসিয়ান চেয়ারম্যানের মিয়ানমার-বিষয়ক বিশেষ দূত ওথমান হাশিমের সঙ্গে বৈঠক করে মিয়ানমারের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা করেন এবং রাখাইন রাজ্যে মানবিক পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তা হ্রাসে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে।
আলোচনাকালে জাতিসংঘ সদর দফতরে অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের রোহিঙ্গাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করবে এবং বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
মিয়ানমারের চলমান সংকট নিয়ে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংককে বাংলাদেশ, চীন, ভারত, লাওস, মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড এই ছয় দেশ বৈঠক করেছে। এই বৈঠকে মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা, ভবিষ্যত রাজনীতি বা সীমান্ত ইস্যু নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশ ছাড়া কোনো দেশই রোহিঙ্গা নিয়ে কোন আলোচনা করেনি যা হতাশাব্যঞ্জক। এ থেকে বুঝতে হবে যে বাংলাদেশকেই এই সমস্যা বিশ্ব পরিমণ্ডলে কার্যকরী ভাবে তুলে ধরতে হবে এবং সমস্যা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যেতে হবে। এই বৈঠকে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান না হলে মিয়ানমারের সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না বলে জানায়।
জাতিসংঘ মহাসচিব ১৩ থেকে ১৫ মার্চ বাংলাদেশ সফরের সময় ১৪ মার্চ রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করে। জাতিসংঘের মহাসচিবের এই সফর রোহিঙ্গা সমস্যাকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি এনে দিয়েছে। রাখাইনে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবর্তন এবং তাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আরাকান আর্মির সঙ্গে সংলাপে বসা জরুরি এবং মিয়ানমারে সংঘাত বন্ধ ও পুনরায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মিয়ানমারের সব প্রতিবেশী দেশের চাপ বৃদ্ধি করা আবশ্যক বলে জাতিসংঘ মহাসচিব মনে করে।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে জাতিসংঘ, কাতার ও বাংলাদেশ তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য তহবিল নিশ্চিত করতে এবং তাদের রাখাইনে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বাড়াতে এই সম্মেলনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটা রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নেয়া নতুন বৈশ্বিক উদ্যোগ যা সমস্যা সমাধানে আশার সৃষ্টি করেছে। এই ধারাবাহিকতায় ২৫ আগস্ট কক্সবাজারে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তীতে ৬ ডিসেম্বর রোহিঙ্গাবিষয়ক তৃতীয় আন্তর্জাতিক সম্মেলন কাতারে অনুষ্ঠিত হবে। আশা করা যায় যে এই সম্মেলন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে সহায়ক হবে এবং বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা নিশ্চিত করবে।
রোহিঙ্গা সংকটে সহায়তাকারী রাষ্ট্র ও সংস্থাগুলো এই সংকট সমাধানে যে অর্থ সহায়তা দিয়ে থাকে তা বিশ্বের অন্যান্য মানবিক সংকটে সহায়তা দেয়ার কারনে কমে যাওয়াতে রোহিঙ্গা সংকটে তহবিল ঘাটতি দেখা দিয়েছে। তহবিল সংকটের কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু প্রকল্প স্থগিত হয়ে আছে, এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বিভিন্ন সংস্থার সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে এবং সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে।
তহবিল কমে যাওয়া ও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়াতে ইতিমধ্যে আমরা বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে, সামনের দিনগুলোতে আরও নানা রকম চ্যালেঞ্জের সম্মুখিত হতে হবে, সে সমস্ত সমস্যা মোকাবেলায় একটা কার্যকরী অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করে সে অনুসারে কাজ করতে হবে। তহবিল হ্রাসের প্রেক্ষিতে অগ্রাধিকারভিত্তিক বাজেট ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ঢাকা অবস্থানরত বিদেশি দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধানদেরকে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়ে ব্রিফ করা হয়েছে এবং তাঁদের কাছে রোহিঙ্গাদের জন্য আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার আবেদন জানানো হয়।
মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে অস্থিরতা বিরাজ করায় এই মুহূর্তে প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়, এজন্য মিয়ানমার পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়া দরকার এবং তখনই প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সক্রিয় কূটনীতি ও তথ্যভিত্তিক প্রচারণা বাড়ানো দরকার।
সচেতনতা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে সম্প্রীতি বাড়াতে আলোচনা ও গনমাধ্যমের ভুমিকা জরুরী। বাংলাদেশে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদেরকেও তাদের দাবী ও অধিকার আদায়ে সচেষ্ট হতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে রোহিঙ্গাদেরকে তাদের মধ্যেকার বিভক্তি গুছিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এবং তাদের মধ্যে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি ও প্রেষণার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য শিক্ষা ও কর্ম দক্ষতা বাড়িয়ে রোহিঙ্গাদেরকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তুলতে হবে।
মিয়ানমারে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গাদের অধিকার, স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আরাকান রোহিঙ্গা ন্যাশনাল কাউন্সিল নামে একটি নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠন করা হয়েছে। মিয়ানমার ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য একটি ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বর তৈরি করা এর মূল লক্ষ্য। রাখাইন রাজ্যের প্রায় সবকটি শহর থেকে এবং বাংলাদেশ ও অন্যান্য রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর নেতাদেরকে এর প্রতিনিধি হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে।
এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করা। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথেষ্ট উদ্যোগ না থাকায় এই সংকট আরও গভীর হয়েছে। রোহিঙ্গাদের অধিকার নিশ্চিত করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নেয়া কার্যক্রম গুলো ফলপ্রসূ সমাধানে সহায়তা করবে বলে আশা করা যায়। দীর্ঘদিন ধরে নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের দুর্দশার টেকসই ও স্থায়ী সমাধান আলোর মুখ দেখুক এটাই প্রত্যাশা।
লেখক : মিয়ানমার ও রোহিঙ্গা বিষয়ক গবেষক।
