রোহিঙ্গা সঙ্কটের ২ বছর : সমস্যায় জর্জরিত কক্সবাজার

fec-image

বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সঙ্কটের ২ বছর পূর্ণ হয়েছে রবিবার (২৫ আগস্ট)। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যা-নির্যাতনের শিকার হয়ে টেকনাফের ১২টি পয়েন্ট দিয়ে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। তারা আশ্রয় নেয় উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার ১৬টি আশ্রয় শিবিরে। সরকারি হিসাবমতে, প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বায়োমেট্টিক নিবন্ধন করা হয়েছে। বর্তমানে উখিয়া-টেকনাফ ও কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাস করছে রোহিঙ্গারা। সবকিছুর হিসেব অনুযায়ী সবচেয়ে বড় শরণার্থী শিবিরে পরিণত হয় উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প।

আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে মাঝে মধ্যে বেশ তোড়জোড় হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি এখন পর্যন্ত। শুধু চুক্তি আর চিঠি আদান-প্রদানেই রয়ে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনের পরিবর্তে বারবার উপহার দিচ্ছে বাংলাদেশী লাশ।

ইতিমধ্যে ২০১৮ সালের ২১ নভেম্বর ও ২০১৯ সালের ২২ আগস্ট রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসের প্রক্রিয়া বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সম্পন্ন করলেও রোহিঙ্গারা যেতে রাজি না হওয়ায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া ভেস্তে যায়। এতে করে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে যায় স্থানীয়রা। যার ফলে উখিয়া-টেকনাফসহ পুরো জেলায় নানামূখি সমস্যায় জর্জরিত হয়ে উঠেছে। এভাবে চলতে থাকলে স্থানীয়দের চলাচলে চরম অস্থিরতা দেখা দিবে। বিপর্যয়ে পড়বে সাধারণ মানুষ। এখন পর্যন্ত কক্সবাজার-টেকনাফ-উখিয়া সড়কের কাহিল অবস্থা, শ্রমবাজার রোহিঙ্গাদের দখল ও সমস্ত পণ্যের দাম আকাশচুম্বি হয়ে উঠেছে। বলতে গেলে-রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে সবকিছু।

স্থানীয়দের দাবি, বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে ইতোমধ্যে সামাজিক, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যয় ঘটেছে। খুব দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। এ অবস্থায় কক্সবাজারের জন্য আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে বলে মনে করে সচেতন মহল। তাদের দাবি, দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

উখিয়া-টেকনাফ এলাকার সচেতন লোকজন জানিয়েছেন, ১৯৮০ সালের দিকে যে রোহিঙ্গারা এসেছে, তারাই এখনো ফেরত যায়নি। কাগজে কলমে কিছু ফেরত গেলেও বাস্তবে অন্তত ৫ লাখ রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে গেছে। এবারও মনে হয় আর প্রত্যাবাসন হবে না।

টেকনাফের সমাজসেবক ও রাজনীতিবীদ সরওয়ার আলম বলেন, সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য যে নির্দিষ্ট ক্যাম্প করে দিয়েছে, সেখানে সঙ্কুলান না হওয়ায় শত শত রোহিঙ্গা দল বেঁধে রাতের আঁধারে স্থানীয়দের ফসলি জমি এবং পাহাড়ি বন দখল করে জোরপূর্বক ঘর নির্মাণ করছে। স্থানীয়রা প্রশাসনের কাছে বিচার দিলে বিচার পাচ্ছে না। এ ছাড়া প্রশাসন চেষ্টা করলেও তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না। তারা জেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। চালাচ্ছে সন্ত্রাসী কার্যক্রম। সম্প্রতি হ্নীলা জাদিমোরায় স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগনেতা ওমর ফারুককে নির্মমভাবে হত্যা করেছে রোহিঙ্গারা। এভাবে তো তাদের লালন পালন করে এদেশে রাখা যাবেনা।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, প্রথম থেকে দেখছি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার মিয়ানমারকে ফেরত নেওয়ার জন্য তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে। মিয়ানমারও কয়েক দফা সময় দিয়েছিল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং এখন দেখছি প্রত্যাবাসন নিয়ে কোনো আলোচনাই হচ্ছে না। যা হচ্ছে সব নাটক। বাস্তবে এসব রোহিঙ্গারা আরো স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে।
কক্সবাজার সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ একেএম ফজলুল করিম বলেন, রোহিঙ্গা আসার ফলে অনেক স্থানীয় মানুষ বা ছেলেমেয়েরা চাকরি বা অন্যান্য কারণে কিছু আর্থিক সুবিধা পেলেও সেটা অস্থায়ী। বরং তারা যেভাবে স্বাভাবিক জীবনের অর্থনৈতিক প্রবাহকে ঘুরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে, সেটার রেশ আমাদের দীর্ঘমেয়াদি টানতে হবে। রোহিঙ্গাদের কারণে কক্সবাজারের আঞ্চলিক অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেটা পোষাতে অনেক সময় লাগবে।

বন বিভাগ সুত্রে জানা গেছে, নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে প্রায় ৯/১০ হাজার একর বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প বিস্তৃত হয়েছে। রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে পাহাড়, জঙ্গল সংরক্ষিত বনভূমি সবকিছুর বিশাল ক্ষতি হয়েছে। রোহিঙ্গারা যদি দীর্ঘমেয়াদি হয় তাহলে কক্সবাজার জেলার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্যসহ আনুষঙ্গিক অনেক কিছুর জন্য সমস্যা হবে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এবিএম মাসুদ হোসেন বলেন, কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের জন্য এ পর্যন্ত অনেক মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনেক আসামিকে। হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৫টির মত। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা মাদক, চোরাচালান, ধর্ষণ, পাচার, পতিতাবৃত্তিসহ নানা অপরাধে জড়িত আছে। তবে সবাই এক নয়। আর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইতোমধ্যে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থায়ী এবং বিশেষ পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে, সেখানে থেকে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার কারণে পৃথিবীর সব দেশের কাছে আমাদের সম্মান বেড়েছে। তবে এটা ঠিক যে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে আমাদের বিশেষ করে কক্সবাজারের জন্য বেশ কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে সরকার এবং এনজিও গুলো ইতোমধ্যে স্থানীয়দের জন্য বিশেষ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এ সময় তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে চাইছি রোহিঙ্গারা দ্রুত তাদের নিজ দেশে ফেরত যাক।

Print Friendly, PDF & Email
ঘটনাপ্রবাহ: মিয়ানমার, রাখাইন, রোহিঙ্গা
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

one × five =

আরও পড়ুন