শহীদদের নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও স্থাপনার নামকরণ করব : তারেক রহমান


বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আজ থেকে এক যুগেরও আগে আমি বলেছিলাম, আজ আবারও এই স্বজনহারা মানুষগুলোর সামনে তুলে ধরতে চাই, আমাদের দল মানুষের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা এই শহীদদের নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, কিংবা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি বেসরকারি স্থাপনার নামকরণ করব। যাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই শহীদদেরকে গৌরবের সাথে স্মরণ রাখতে পারে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে গুম ও খুনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দেয়া বক্তব্যে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ১১টায় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’ ও ‘মায়ের ডাক’-এর উদ্যোগে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা ১১টা থেকে দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় গুম-খুনের শিকার পরিবারের সদস্যদের কথা এবং আকুতি শুনে তিনি অশ্রুসজল হন।
তারেক রহমান বলেন, আমাকে বাধ্য হয়ে বহুবছর দেশ, স্বজন ও নেতাকর্মীদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। দূর থেকে যতটুকু সম্ভব নেতাকর্মী এবং সারাদেশে ছড়িয়ে থাকা স্বজনহারা মানুষদের নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে থেকে প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তুলেছি। সাধ্য অনুযায়ী স্বজনহারা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছি। সীমাবদ্ধতা থাকার পরও আমরা প্রতিটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছি।
ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে অত্যাচার, গুম, নির্যাতন ও হত্যা করা হয়েছে উল্লেখ করে বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির দেড় লক্ষাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হয়। যার বোঝা প্রায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে বয়ে বেড়াতে হয়েছিল। দিনের পর দিন ঘরবাড়ি ছাড়া থাকতে হয়েছে। স্বজন থেকে দূরে থাকতে হয়েছে। এসব মামলা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন, সরকারবিরোধী আন্দোলন কখনো উত্তাল হয়েছে, কখনো স্থিমিত হয়েছে। কিন্তু কৌশলের নামে গুপ্ত বা সুপ্ত বেশ ধারণ করেনি বিএনপির কর্মীরা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থেকেছে সবসময়। গুম-খুনের শিকার পরিবারের প্রতি আগামীর গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কখনও আপনাদের ত্যাগ ভুলে যেতে পারে না।
তারেক রহমান আরো বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে যারা গুম হয়েছেন, শহীদ হয়েছেন, তাদের ভেতর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের যে আকাঙ্ক্ষা আমরা দেখছি, সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং সরকারের অনেক অনেক দায়-দায়িত্ব রয়েছে। রাষ্ট্র কখনো আপনাদের ভুলে যেতে পারে না।
সকল শহীদের আত্মত্যাগকে জনমতে সম্মোহিত রাখতে আগামী দিনে বিএনপি কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জানিয়ে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনের বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে এই মুহূর্তে সেগুলো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরো বলেন যে, এখানেই শেষ নয়। রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর প্রতি রাষ্ট্রের সাধ্যমত সহায়তার হাত বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে বলেও আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি। সুতরাং স্বাধীনতাপ্রিয়, গণতন্ত্রপ্রিয় প্রতিটি মানুষের সামনে জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল একটি মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুযোগ এসেছে।
নানা রকম কথা বলে আসন্ন নির্বাচন ব্যাহত করার চেষ্টা হচ্ছে এবং সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, কেউ কেউ বিভিন্ন রকম কথা বলে একটি অবস্থার তৈরি করার চেষ্টা করছে যেখানে আজ গণতন্ত্রের যে পথ তৈরি হয়েছে সেটি যাতে বাধাগ্রস্ত হয়। আমি অনুরোধ করব, বাংলাদেশের দলমত নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষকে সজাগ থাকার জন্য। যারা বিভিন্ন উছিলার মধ্য দিয়ে বিতর্কের তৈরি করে গণতন্ত্রের পথকে আবার নষ্ট করার চেষ্টা করছে তারা যাতে সফল না হয়।
গুম-খুনের শিকার পরিবারগুলোর সদস্য ছাড়াও সভায় অন্যান্যদের মধ্যে সিলনে মানসিক হাসপাতালের সেই হৃদয়বিদারক দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে বক্তব্য রাখেন গুম হওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি সংগ্রামী গান ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে কত প্রাণ হলো বলিদান, লেখা আছে অশ্রু জলে’, ‘যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনও জানেন স্বর্গের চেয়ে প্রিয় মাতৃভূমি’ উল্লেখ করে বলেন, এটি কেবল গান বা কবিতা নয়, এটি আমাদের বাস্তবতা। আমি মহান রব্বুল আলামীনের দরবারে হাত তুলে মোনাজাত করতাম সেই মৃত্যু গুহায় যে, আমার কবরের ঠিকানা কি আমার ওয়ারিশরা পাবে না। সিলনের সেই মানসিক হাসপাতালের সেই বন্দিশালায়, যেটি কলাপসিবল গেইট দিয়ে বন্ধ করে রাখা, আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম, পাগল হিসেবে আমার জীবন অবসান হবে, রব্বুল আলামীন আমার সন্তানরা, আমার পরিবার কি আমার কবরের ঠিকানা পাবে না? জিয়ারত করতে পারবে না? আল্লাহ মোনাজাত কবুল করেছেন। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে যেমন আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছিলাম, সহশ্র সহশ্র আত্মদানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে। এমন তো কথা ছিল না। গুম, খুনের চেয়েও একটি ভয়ঙ্কর যারা লাশ ফিরে পেয়েছে, তাদের অনেকের হাতে ছিল হাতকড়া, হাতবাধা। তারপরেও তারা অন্তত জানাযা দিতে পেরেছেন প্রিয়জনদের। কিন্তু যারা আজও ফিনে নি, তাদের মা, বাবা, স্ত্রী, সন্তান তারা কী করবেন।’
















