শহীদ মেজর মহসীন রেজা বীরপ্রতীক: সার্বভৌমত্ব রক্ষার লড়াইয়ে এক অমর বীর নায়ক

শহীদ মেজর মহসীন রেজার শাহাদাতের ৩৭ তম বার্ষিকীতে বিশেষ প্রবন্ধ

মেজর মহসিন রেজা

সাইমন বিশ্বাস

দেশের জন্য যদি করতে হয় আমার এ জীবন দান,
করবো, তবু দেব না দেব না লুটাতে ধুলায়- দেশের সম্মান ৷

পৃথিবীতে কিছু ক্ষণজন্মা মানুষ থাকে যাদের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ আর নায়কোচিত কর্মকাণ্ড অন্য সবার জন্য হয়ে থাকে আদর্শ এবং অনুকরণীয়। স্বার্থপরতার চরম দ্বন্দ্বে জগৎ সংসারে যখন মানুষ স্বাভাবিক মানবিকতা ভুলে মেতে ওঠে নিজস্ব সুখ আর ভোগ বিলাসে, তখন দেশের জন্য নিজের জীবন বিসর্জনের ঘটনা নির্ঘাত অতিসাধারণ কিছু নয়! অসম্ভব রকম উন্নত মানসিকতা আর দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হতে পারলেই কেবল সেটা সম্ভব।

এ রকম অসংখ্য মুক্তিনায়কদের বীরগাঁথায় রচিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতার মহাকাব্য। ঠিক তেমনি কিছু অনন্য নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমীদের দেশের অখণ্ড ভূখন্ড পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্বভৌমত্ব রক্ষার অমর গাঁথায় আজো অটুট রয়েছে দেশের সার্বভৌমত্ব। দেশ এবং সহকর্মীর জন্য জীবন বাজি রেখে কাজ করার অসাধারণ মানসিকতা আর মানবিকতার অনন্য উদাহরণ শহীদ মেজর মহসীন রেজা ।

মুক্তিযুদ্ধের বীরনায়কদের অমর গাঁথার কাহিনী আমরা সকলে জানি। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি রক্ষায় নিয়োজিত সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ এবং আনসারসহ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর আত্নত্যাগের মহান দৃষ্টান্তের কথা আমরা অনেকেই জানি না।

পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন উপজাতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি দল “শান্তি বাহিনী” নাম দিয়ে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অপহরণ, খুন, গুম, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগসহ নানান অপকর্মে লিপ্ত ছিল এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার অপচেষ্টা চালাচ্ছিলো তখন বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশে পার্বত্য চট্টগ্রামে সন্ত্রাস দমন এবং দেশের অখন্ডতা রক্ষায় সেনাবাহিনীকে সেখানে নিয়োগ করা হয়।

শান্তি বাহিনীর গেরিলা আক্রমণ আর অপকর্মরোধে নিরলস কাজ করতে থাকে সেনাসদস্যরা। মাতৃভূমির অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সর্বোচ্চ আত্নত্যাগের স্বাক্ষর রাখতে পিছপা হয়নি তারা। শহীদ মেজর মহসীন রেজা এবং তার সহযোদ্ধাদের আত্নদান তেমনি একটি উদাহরণ।

১২ ফেব্রুয়ারী ১৯৮০ সাল, মেজর মহসীন রেজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৯ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ৮৮ জন সদস্যের একটি বিশেষ অপারেশন দল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার থাচি এলাকায় একটি ঘাঁটি স্থাপন করে। তারা উইন্টার-২ নামে শান্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে একটি বিশেষ অপারেশন পরিচালনা করে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করে।

১ মার্চ ১৯৮০ সাল, ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৬ টা বাজে। শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র দলের অবস্থানের খোঁজ পেয়ে মেজর মহসীন কৌশলগত কারণে অপারেশন এলাকা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। অপারেশন এলাকা পরিবর্তনের জন্য গমনাগমনের শুরুতেই তিনি তার দলের সকলকে যাত্রার পদ্ধতি বুঝিয়ে দেন। সম্পূর্ণ দলটিকে তিনি ৩ টি উপদলে বিভক্ত করে প্রথম দলের কমান্ডার তিনি নিজে, দ্বিতীয় দলের কমান্ডার সুবেদার আব্দুর রহমান এবং ৩য় দলের কমান্ডার লেফটেনেন্ট মীর কাশেমকে নিযুক্ত করেন।

সকাল ৮ টা ৩০ মিনিটে মেজর মহসীন রেজার দলটি (২২ জন) থাচি থেকে ঘন্টিছড়ি নামক এলাকাতে প্রবেশের ৫০০ গজ আগে ( যেখানে খাগড়াছড়ি নালা প্রায় সুড়ঙ্গের আকার ধারণ করেছে) প্রায় ১০ মিনিট থেমে চারিদিক পর্যবেক্ষণ করেন এবং নালা পথ ধরে পুনরায় যাত্রা শুরু করেন। যখন দলের প্রথম সদস্য ঐ সুড়ঙ্গ সদৃশ নালা থেকে বের হবার পথে, ঠিক তখনি শান্তিবাহিনীর পরিকল্পিত আক্রমণের শিকার হয় পুরো দলটি। শান্তিবাহিনী মেজর মহসীন রেজার দলটির উপর স্বয়ংক্রিয় ও অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে ক্রমাগত গুলিবর্ষণ করতে থাকে।

এসময় মেজর মহসীন রেজার ডান হাতে একটি গুলি লাগে। এতে তিনি বিচলিত না হয়ে অকুতোভয় চিত্তে তার দলের অন্যান্যদের নির্দেশনা দিতে থাকেন। তিনি তার দলের অন্যান্যদেরকে ডান দিক দিয়ে পাহাড়ে উঠে শান্তিবাহিনীকে মোকাবেলার নির্দেশ দেন এবং নিজে সম্মুখ দিক থেকে শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় শান্তিবাহিনীর ছোঁড়া আরো একটি গুলি এসে তার বুকে বিদ্ধ করে। এতে অধিক রক্তক্ষরণের দরুণ তিনি মাটিতে পড়ে যান। সেখান থেকেই তিনি তার সৈনিকদের দিক নির্দেশনা দিতে থাকেন।

কিন্তু শান্তিবাহিনীর গুলির আঘাতে তার সেনাদলের ২২ জন সদস্য যখন ক্ষত বিক্ষত হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন একপর্যায়ে  পিশাচ শান্তিবাহিনীর সদস্যরা মেজর মহসীন রেজাকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মেজর মহসীন রেজার সাথে থাকা বাকী ২১ জন সৈনিককেও শান্তিবাহিনীর নরপিশাচরা হত্যা করে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পুরো দলের কেউই নতি স্বীকার করে নাই, তারা অসম সাহসীকতার পরিচয় দিয়ে জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে দেশমাতৃকার জন্য লড়াই করে গেছেন।

জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শহীদ মহসীন রেজা অসীম সাহসিকতার পরিচয় দেয়ায় এবং বীরত্বপূর্ণ কৃতিত্বের জন্য তাঁকে রাষ্ট্র “বীর প্রতীক” খেতাবে ভূষিত করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত থাকাকালীন এরকম শতশত অকুতোভয় দেশপ্রেমী আত্মবলিদানকারী সেনাসদস্যদের গৌরবগাঁথা আজো লোকচক্ষুর আড়ালে রয়ে গেছে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর শান্তি চূক্তি সাক্ষরিত হলেও আজও পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোর অস্ত্রের ঝনঝনানি থামে নাই। এখনো তারা খুন, গুম, হত্যা, লুন্ঠন, চাঁদাবাজি, অপহরণের মত অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। এখনো তারা পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করে “স্বাধীন জুম্মল্যান্ড” নামক একটি আলাদা রাষ্ট্র গঠনের নীলনকশা করে যাচ্ছে। এদের রুখতে সদা জাগ্রত এবং সদা প্রস্তুত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নির্ভিক সদস্যরা নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তাদের শ্রম ও ত্যাগের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ সালাম।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five − 1 =

আরও পড়ুন