শূন্যরেখা ঘিরেও ছক, এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করছে মিয়ানমার

fec-image

তুমরু ও বাইশফাঁড়ি সীমান্তে সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালেও থেমে থেমে গোলাবর্ষণ হয়েছে। সকাল ৬টা থেকে ১১টা পর্যন্ত এসব গোলাবর্ষণের ঘটনা ঘটে। আবার বিকেল ৫টায় উপর্যপুরি মর্টারশেল নিক্ষেপ করে মিয়ানমারের তুমব্রু রাইট ক্যাম্প ও নারাচং ক্যাম্প থেকে। মিয়ানমারের ভেতরে গোলাগুলি অব্যাহত থাকায় এখনও আতঙ্ক কাটেনি সীমান্ত এলাকার এবং জনজীবন পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।

মিয়ানমারের অভ্যন্তরের সংকট বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় উদ্বেগ-উত্তেজনা ছড়ানো নিয়ে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। এর নেপথ্য কারণ খুঁজতে গেলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কিছু দিন ধরে মিয়ানমার তাদের ভেতরের তিনটি সশস্ত্র সংগঠনের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে। এগুলো হলো- আরাকান আর্মি, ওয়া আর্মি ও কাচিন ইনডিপেন্ডেন্ট আর্মি। প্রায় দেড় দশক আগে তিন সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে একটি চুক্তি ছিল। এটি ‘নর্দান অ্যালায়েন্স’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি নর্দান অ্যালায়েন্স নাম বদল করে ‘ফ্রেন্ডশিপ অ্যালায়েন্স’ রাখা হয়। আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে মিয়ানমার লড়াই শুরু করার পর চুক্তি অনুযায়ী ওয়া আর্মি ও কাচিন আর্মি আরাকানকে সহযোগিতা করে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হামলার মুখে তাদের অভ্যন্তরের সীমান্ত এলাকায় আরাকান আর্মি শক্তি সঞ্চয় করে। দেশের ভেতরের সশস্ত্র সংগঠনকে মোকাবিলা করতে গিয়ে এক ঢিলে দুই পাখি মারার চেষ্টা করছে মিয়ানমার। একটি হলো শূন্যরেখার রোহিঙ্গাদের উস্কানি দেওয়া। তুমব্রুতে শূন্যরেখায় স্থাপিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ২০১৭ সালের পর থেকে চার হাজার ২৮০ রোহিঙ্গা বসবাস করছে। মিয়ানমারের কৌশল হলো- সীমান্তে উত্তেজনা বাড়লে শূন্যরেখার রোহিঙ্গারা প্রভাবিত হবে। তারা পাল্টা হামলা করতে পারে। তখন আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে দেশটি বলার সুযোগ পাবে- শূন্যরেখা থেকে মিয়ানমারকে লক্ষ্যবস্তু করছে তারা। এ ছাড়া সীমান্তে উত্তাপ ছড়িয়ে নিজেদের ভেতরের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছ থেকে সীমান্ত এলাকায় অবৈধ বাণিজ্যের মূল নিয়ন্ত্রণ মিয়ানমার সেনাবাহিনী নিতে চায়। দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ আছে, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অসাধু কর্মকর্তারা সরাসরি ইয়াবা বাণিজ্যে জড়িত। তবে রাখাইনে ধীরে ধীরে আরাকান আর্মির প্রভাব বাড়ায় ইয়াবাসহ অন্যান্য চোরাচালানের নিয়ন্ত্রণ সশস্ত্র সংগঠনটির কাছে হারানোর ভয়ও রয়েছে মিয়ানমারের জান্তাদের। সশস্ত্র সংগঠনকে শায়েস্তা করতে গিয়ে বাংলাদেশের ভেতরে একাধিক দফায় মর্টার শেল এসে পড়া ও তাদের বিমান আন্তর্জাতিক সীমারেখা অতিক্রম করা ‘টেস্ট কেস’ কিনা- তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ বিষেশজ্ঞদের। এমনকি শূন্যরেখার অধিকাংশ রোহিঙ্গা দীর্ঘ দিন থেকে চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত- এমন অভিযোগও আছে। শূন্যরেখাকে অনেকে মাদক কারবারিদের ‘ওয়্যার হাউস’ ও ‘বিশ্রামাগার’ বলেও অভিহিত করেন। সেখানে মিয়ানমারের মোবাইল কোম্পানিগুলোর নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে কথা বলা যায়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আবদুর রশিদ বলেন, মিয়ানমার এক ধরনের গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে তাদের ভেতরে, সীমান্তে ও শূন্যরেখায় কী ঘটতে পারে, তার ওপর তীক্ষষ্ট নজর রাখতে হবে। ওখানকার ক্যাম্পে যেসব রোহিঙ্গা রয়েছে তাদের ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না মিয়ানমার। তারাও মিয়ানমারের নাগরিক।

আরেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম বলেন, মিয়ানমার তাদের অভ্যন্তরে যুদ্ধ করছে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে। চুক্তির কারণে আরাকান আর্মিকে রসদ দিয়ে সহায়তা করছে মিয়ানমারের আরও দুটি সশস্ত্র সংগঠন কাচিন এবং ওয়াও আর্মি। সান রাজ্যে চীন সীমান্তে ওয়া আর্মির রাজত্ব। তাদের প্রায় ২৭ হাজার সদস্য রয়েছে। এক সময় আরাকান আর্মির সদরদপ্তর ছিল মিয়ানমারের আরেক রাজ্য চিনের প্লাটাওয়াতে। সম্প্রতি আরাকান আর্মির সদস্যরা মিয়ানমার আর্মির ওপর আক্রমণ করে। এর পরই লড়াই শুরু হয়।

তিনি আরও বলেন, আরাকান আর্মিসহ অন্য কেউ যাতে চলমান ঘটনা প্রবাহে বাংলাদেশকে পক্ষ বানাতে না পারে, এ ব্যাপারে নজর রাখতে হবে। মিয়ানমার নিজেদের ভেতরের সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লড়ছে। কৌশলগত কারণে এখন তারা বাংলাদেশের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো ঝামেলায় শেষ পর্যন্ত জড়াবে না। তবে রোহিঙ্গা সংকটকে যাতে আরও ঘনীভূত করতে না পারে সেদিকে নজর রাখতে হবে। আর যুদ্ধ কোনো দেশের জন্য মঙ্গলও নয়। অতীতে মিয়ানমারের সঙ্গে কখনও বাংলাদেশ যুদ্ধে জড়ায়নি। ২০০১ সালে নাফ নদ ঘিরে এক ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার পরও শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবেই ওই সমস্যার সমাধান হয়েছিল। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের জাতিসংঘে যাওয়ার দরকার নেই। আরাকান আর্মি ও আরসা কেউ রোহিঙ্গার বন্ধু নয়। আরসা তৈরি করার পেছনে আছে মিয়ানমারই।

শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান দিল মোহাম্মদ বলেন, মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) শূন্যরেখা ছাড়তে দীর্ঘ দিন হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে। গত শুক্রবার তারই অংশ হিসেবে আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বাহানা দেখিয়ে এ ক্যাম্প বরাবর মর্টার শেল নিক্ষেপ করে। জাতিসংঘের মাধ্যমে আমরা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চাই। ক্যাম্পের নিরাপত্তা চেয়ে সোমবার জাতিসংঘ বরাবর খোলা চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে শূন্যরেখায় ক্যাম্পে মানববন্ধনও করা হয়।

সীমান্ত পরিস্থিতির ওপর নজর রাখেন এমন এক কর্মকর্তা জানান, রাখাইনজুড়ে আরাকান আর্মির যে সামরিক লক্ষ্য ও পরিকল্পনা, তাতে কিছুটা শঙ্কিত মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী। নতুন করে হামলার মুখে দেশের অভ্যন্তরে সীমান্ত হাতছাড়া করতে চাইছে না তারা। বরং এখানে সামরিক প্রভাব আরও বাড়াতে চায়। সীমান্ত ঘিরে অবৈধ বাণিজ্যের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মি তাদের হাতেই রাখতে চায়। তবে কোনোভাবে আর আরাকান আর্মিকে সহ্য করতে পারছে না মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী। যে কোনো মূল্যে তারা দুই দেশের সীমান্তসংলগ্ন এলাকা থেকে এই দলের গেরিলাদের তাড়াতে চায়। তারই ফল সাম্প্রতিক উত্তেজনা, সংঘর্ষ ও গোলাগুলি। গত ১৩ আগস্ট থেকে এই পাল্টাপাল্টি চলছে। মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে যেসব জায়গায় এখন সংঘর্ষ চলছে, তার মধ্যে আছে মংডু, বুথিডং, রাথিডং, ম্রাউক-উ (প্রাচীন আরাকানের রাজধানী) এবং পালেতোয়া। যুদ্ধের প্রধান ভরকেন্দ্র পালেতোয়া। এই জায়গাটা যদিও চীন প্রদেশে পড়েছে, তবে আরাকান আর্মি মনে করে, এটা উত্তর আরাকানেরই অংশ। পালেতোয়াকে আরাকান থেকে কেটে চীনের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। খুকি চীনদের এলাকা হলেও রাখাইনদের ভাষাগত আধিপত্য প্রবল এখানে। যদিও এলাকায় রাখাইনরা সংখ্যালঘু।

ঘুমধুমে আতঙ্ক : নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম এলাকায় এখনও আতঙ্ক কাটেনি। গতকাল ভোরে ও বিকেলে সীমান্তের ওপাশ থেকে কয়েক দফায় গোলার শব্দ পাওয়া গেছে। সরেজমিন ঘুমধুমে দেখা গেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কড়া পাহারা। উখিয়া থেকে বান্দরবানের ঘুমধুমে প্রবেশ করার বিজিবির সব কয়েকটি চৌকিতে পথচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করে ওই এলাকায় প্রবেশের যৌক্তিক কারণ জানতে চাওয়া হয়। সাংবাদিকদের প্রবেশে রয়েছে কড়াকড়ি।

ওই এলাকার বাসিন্দা ফাতেমা বেগম জানান, কয়েক দিন ধরে গোলাগুলির শব্দে ঘুমানো কষ্ট। ভয় কাটাতে ৪ বছরের সন্তান ওমর ফারুককে বুকে জড়িয়ে প্রতিদিন ঘুমান তিনি। গত শুক্রবার তুমব্রুর কোনাপাড়ার শূন্যরেখার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাছে মিয়ানমারের ভেতর থেকে গোলা এসে পড়লে একজন নিহত ও ছয়জন আহত হন। এর পর কোনাপাড়া থেকে পরিবারের ৯ সদস্যকে নিয়ে ভয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে টেকনাফ চলে যান ফাতেমার প্রবাসী ভাই আমির হোসেনের স্ত্রী-সন্তান ও স্বজন। তুমব্রু বাজারের ওষুধের দোকানের মালিক মো. হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, আশপাশের চারটি গ্রামের মানুষ তুমব্রুতে বাজার করতে আসেন। সীমান্ত এলাকার অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। মিয়ানমারের হঠকারী ঘটনার পর থেকে এলাকার অনেক ব্যবসায়ী দোকানে কোনো মালপত্র মজুদ রাখছেন না। কারণ কখন কী ঘটনা ঘটে- এ নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।

তুমব্রু সীমান্ত পরিদর্শন :উদ্ভূূত পরিস্থিতিতে নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্ত পরিদর্শনে গেছে স্থানীয় প্রশাসনের একটি প্রতিনিধি দল। তবে প্রতিনিধি দলটি সীমান্ত এলাকা থেকে ফেরার পর বিকেলে আবার মিয়ানমারের সীমান্তের ওপার থেকে গোলার শব্দ পাওয়া যায়। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক ইয়াছমিন পারভিন তিবরীজি, পুলিশ সুপার মো. তারিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সোমবার সকাল ১০টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং পৌঁছেন। এর পর তাঁরা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। পরে জেলা প্রশাসক বলেন, সীমান্তের কাছের ঝুঁকিপূর্ণ বাসিন্দাদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রয়োজনে এসব এলাকার মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হবে। সীমান্ত পরিস্থিতি সার্বিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বান্দরবানের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা দিতে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। সীমান্তের এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে মিয়ানমার থেকে কোনো রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের ঘটনা যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিতে বিজিবির পাশাপাশি পুলিশও কাজ করছে।

সূত্র: সমকাল

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 − 9 =

আরও পড়ুন