বিবিসি ও আল জাজিরার রিপোর্ট না পড়লেও বোঝা যায়, ভারত কখনোই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না। ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও আমলারা বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ ও আমলাদের মত দেশপ্রেমহীন, স্বার্থগৃন্ধু ও মাথামোটা নয় যে, ভারতের কাউন্টারে বাংলাদেশের তৈরি কার্ডগুলো ধরে ধরে ভারতের হাতে তুলে দেবে। ভারত বিগত ৫০ বছর ধরে বাংলাদেশকে কাউন্টার করতে যে সকল কার্ড তৈরি করেছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ কার্ড হচ্ছে শেখ হাসিনা। এটি তাদের সর্বোচ্চ ট্রাম্প কার্ড। ভারত কখনই এই ট্রাম্প কার্ড শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে তুলে দেবে না।
বাংলাদেশকে মোকাবেলা করতে এবং বাংলাদেশ নিয়ে খেলতে বা এদেশে কোন নীল নকশা অথবা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে ভারতের হাতে যে সমস্ত কার্ড রয়েছে তার মধ্যে শেখ হাসিনা সবচেয়ে সহজলভ্য অথচ সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র। বাংলাদেশে এখনো আওয়ামী লীগের কোটি সমর্থক রয়েছে। দলটি মধ্যে শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তা এবং নিরঙ্কুশ নেতৃত্বের কারণে তার একটি নির্দেশে যেকোনো সময় বাংলাদেশে যেকোনো ধরনের আন্দোলন, সহিংসতা, নাশকতা ও অস্থিরতামূলক কার্যক্রম চালানো সম্ভব। এর জন্য ভারতকে একটি পয়সাও খরচ করতে হবে না। এ ধরনের একটি কার্ড বা কার্যকর অস্ত্রকে ভারত কেন বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর করবে?
দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আর থাকতে পারবেন না। তবে বর্তমানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় হয়তো নেতৃত্বের পরিবর্তনের বিষয়টির প্রয়োজন নাও হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ রাজনীতি করার সুযোগ পেলে অবশ্যই শেখ হাসিনাকে দলীয় নেতৃত্বের পথ থেকে সরে যেতে হবে। যেভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে রেখেই তারেক রহমানকে অ্যাক্টিং চেয়ারপার্সন করা হয়েছিল, আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও হয়তো এ ধরনের উদ্যোগ বা ব্যবস্থা ভবিষ্যতে দেখা যেতে পারে।
তবে শেখ হাসিনা অফিসিয়ালি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে না থাকলেও তিনি যতদিন সুস্থ ও কার্যকর থাকবেন ততদিন আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব তাকে ঘিরেই আবর্তিত হবে। আওয়ামী লীগের কমান্ড চ্যানেলের মাস্টার সুইস তার হাতেই থাকবে। যিনি বা যারা যতই চেষ্টা করুন, গুড আওয়ামী লীগ, সংস্কারপন্থী আওয়ামী লীগ অথবা অন্য যেকোনো ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা, শেখ হাসিনা সুস্থ ও কার্যকর থাকলে এগুলোর কোন কিছুই হালে পানি পাবে না। যেমন শেখ হাসিনা তার অবৈধ শাসন দীর্ঘায়িত করতে সকল ধরনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফল হলেও বিএনপিকে ভাঙতে পারেননি মূলত তারেক রহমানের উপস্থিতির কারণে। এটি শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতার একটি। খুন, গুম, জেল, জুলুম, ভয়, লোভ বা শত চাপ প্রয়োগ করেও শেখ হাসিনা বিএনপিকে ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিএনপি আন্দোলন করে শেখ হাসিনার পতন ঘটাতে সক্ষম না হলেও, দলটি একক ও অটুট ছিল। এটি কেবল তারেক রহমানের উপস্থিতি ও নিরঙ্কুশ নেতৃত্বের কারণে।
প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাবের কারণে শেখ হাসিনা ভারতের যে কোন প্রস্তাব নির্দ্বিধায় মেনে নেবে ও বাস্তবায়ন করতে চাইবে। এক্ষেত্রে দেশের সার্বভৌমত্ব বা দেশের স্বার্থ তার কাছে বিবেচিত হবে না, হয়নি কখনো। যিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফেরার পূর্বেই লন্ডনে বিবিসিকে দেয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন, একমাত্র পিতৃ হত্যার প্রতিশোধ নিতেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছেন। এখন তো ৩৬ জুলাই তার নিজের উপর সংঘঠিত ঘটনাবলীর প্রতিশোধস্পৃহা এর সাথে যুক্ত হয়েছে। তার সাম্প্রতিক যে সকল টেলিফোন সংলাপ প্রকাশিত হয়েছে তাতে স্পষ্ট দেখা গিয়েছে, তিনি আরও এবং ভয়ংকর প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। পূর্বের মতোই কোন রাখঢাক ছাড়াই তিনি প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছেন।
১৯৭৫ এর অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা শেখ রেহেনা ও তার সন্তানেরা ৬ বছর দিল্লিতে ভারত সরকারের আশ্রয়ে ছিলেন। তার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ ‘জ্যোতি কাকা’, ‘প্রণব কাকা’ হয়ে মোদির সাথে গভীর সম্পর্ক কেবল প্রতিশোধ স্পৃহা সম্ভুত ছিল না; ছয় বছর দিল্লিতে আশ্রয় দেয়া এবং বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার অহর্নিশ কৃতজ্ঞতা বোধও কাজ করেছে অন্তর্লিনে। একই সাথে তিনি যত বেশি জন বিচ্ছিন্ন হয়েছেন, ক্ষমতায় টিকে থাকতে তত বেশি ভারতকে আঁকড়ে ধরেছেন এবং ভারত সেই সুযোগ নিয়ে তার থেকে তত বেশি সুবিধা আদায় করেছে। তিনি জানতেন বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন তিনি হারিয়ে ফেলেছেন এবং ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পন্থায় তার রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকে থাকার সকল সম্ভাবনা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় টিকে থাকতে এবং জনরোষ থেকে নিজেকে ও পরিবারকে রক্ষা করতে ভারতকেই একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরেছেন। ভারত এই অবস্থার সুযোগ নিতে বিন্দুমাত্র কসুর করেনি।
এবারে কিন্তু শেখ হাসিনা, শেখ রেহেনা ও তাদের সন্তান-সন্ততি কেবল নয়, আওয়ামী লীগের লক্ষাধিক মন্ত্রী ,এমপি, কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় নিয়েছে বিগত রেজিমের সুবিধাপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন আমলরাও। এই আশ্রয় দানের জন্য ভারতের প্রতি তাদের একটি স্বাভাবিক ও গভীর কৃতজ্ঞতা বোধ তৈরি হবে। একই সাথে ভারতের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে তাদের শক্তিশালী সম্পর্ক সৃষ্টি হবে। ভারত সরকার ও এর গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পলাতক আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ এবং বিগত রেজিমের সুবিধাপ্রাপ্ত পলাতক আমলাদের প্রত্যেককে একটি একটি করে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য হিসাবে ব্যবহারের জন্য কার্ড হিসাবে তৈরি করবে। তারা একদিকে যেমন তাদের আশ্রয় এবং অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে তাদের সাথে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তোলা ও তাদের সকল ভালো-মন্দ এবং দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো সংরক্ষণ করবে ভবিষ্যতের জন্য কার্ড হিসেবে, বার্গেনিং পয়েন্ট হিসেবে অথবা ব্ল্যাকমেইলিং এর রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষণ করবে।
একক দলীয় শক্তিতে আওয়ামী লীগের পক্ষে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসা আওকাত এই মুহূর্তে নেই তাদের। আগামীতে যদি ফিরে আসে সেটাও ভারতের সহায়তাতেই ফিরে আসবে। ফলে ভবিষ্যতে যদি কখনো আওয়ামী লীগ আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যাওয়া লক্ষাধিক আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতৃবৃন্দ ও আমলারা প্রত্যেকে এক একটি ভারতীয় দাবার ঘুঁটি হিসেবে ফিরে আসবে। ভারত তাদের প্রত্যেককেই ব্যবহার করবে এদেশে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে ৬ বছর আশ্রয় দানের কৃতজ্ঞতাবোধের প্রতিদানের নতিজা আমাদের সামনে এখনো প্রজ্বলিত আলোর মত দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিভাত। কিন্তু আগামী দিনে লক্ষাধিক আওয়ামী লীগের মন্ত্রী এমপি ও সিনিয়র নেতা এবং আমলারা যদি একই কৃতজ্ঞতাবোধ নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় তাহলে এই দেশের পরিণতি কী হতে পারে তা হয়তো এখনও অকল্পনীয়!
যদিও এরকম লক্ষাধিক কার্ড থাকার পরেও ভারতের কাছে সবচেয়ে মোক্ষম কার্ড শেখ হাসিনার গুরুত্ব এতোটুকু কমবে না। মুখে যাই বলুক, পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারত বর্তমান ও নিকট ভবিষ্যতে যে আচরণই করুক, তারা সবসময়ই চাইবে আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় ফেরাতে এবং সেটা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। ভারতের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই আওয়ামী লীগকে আবার বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফেরাতে। তবে সেক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয়ে বিবেচনায় থাকবে। শেখ হাসিনার বয়স ও সুস্থতা এবং বাংলাদেশের আগামী সরকারের রাষ্ট্রপরিচালনার দক্ষতা ও নিয়ন্ত্রণ। একই সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো ও সব ধরনের আমলাতন্ত্রের সততা ও দেশপ্রেমের উপর এই বিষয়টি অনেকখানি নির্ভর করে। বাংলাদেশের আগামী সরকার যদি সঠিকভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে, রাজনৈতিক দলসমূহ এবং সকল প্রকার আমলাতন্ত্র যদি উপরোক্ত আলোচনার ব্যাপারে সচেতন থেকে দেশপ্রেমের সর্বোচ্চ চেতনায় উদ্ভাসিত হতে পারে, তাহলে শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরা খুব সহজ হবে না। সেক্ষেত্রে তার পরিণতি একজন লেন্দুর দর্জি বা দালাইলামার মতো হতে পারে। কিংবা ফ্রান্সে নির্বাসিত ইরানের পলাতক শাসকদের মতো হতে পারে। যদি শেখ হাসিনার দেশে ফেরা দীর্ঘায়িত হয়, শারীরিক সুস্থতা এবং হায়াতের সীমা শেষ হয়ে যায়, তাহলে ভারতেই হয়তো তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হতে পারে। মহান আল্লাহ সর্বোচ্চ এবং সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।
