parbattanews

সংসদ ও সংসদের বাইরে নিজ দলের এমপিদের কার্যকলাপে বিব্রত জামায়াত

হাসতে হাসতে মুখ ফসকে কখন কি বলে ফেলেন আমির হামজা তা নিয়ে বিবৃত জামায়াত। ছবি : সংগৃহীত

সংসদে সরকারি দল বিএনপিকে জবাবদিহির আওতায় আনতে পারছে না প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। দলটির সংসদ সদস্যদের কয়েকজন সংসদে অপ্রাসঙ্গিক বক্তব্য ও ভুল তথ্য উপস্থাপন করে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। বাজেট আলোচনায়ও জামায়াত এমপিরা ছিলেন নিষ্প্রভ। অর্থ বিলে কোনো সংশোধনী প্রস্তাবও দেয়নি তারা। সংসদ সদস্যদের অনেকের সংসদের রীতিনীতি ও কার্যপ্রণালি বিধির বিষয়ে জানাবোঝার ঘাটতিও প্রকাশ পেয়েছে। খবর সমকালের

প্রকাশিত সংসদের বাইরে দলীয় কয়েকজন সংসদ সদস্যের (এমপি) কার্যকলাপে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে জামায়াত। এদের বিরুদ্ধে নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন ও বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ জন্য দল থেকে কোনো কোনো এমপিকে সতর্কও করা হয়েছে। জামায়াতের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা এ তথ্য জানিয়েছেন। আবার উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ স্বজনদের দেওয়ার ঘটনায় স্বার্থের সংঘাত থাকলেও জামায়াত তাদের এমপির পক্ষ নিয়েছে।

অপ্রাসঙ্গিক, ভুল তথ্য নিয়ে বিতর্কিত
চলমান বাজেট অধিবেশনে গত ১৭ জুন দেওয়া বক্তৃতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের এমপি মু. মিজানুর রহমান এপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চান। তিনি বলেন, ‘আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনও ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে। এই পর্দা, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’

এই বক্তব্যের কারণে প্রথমে সামাজিক মাধ্যম, পরে সরকারি দলের সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। বিএনপির জোট শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ টিপ্পনী কেটে বলেন, তিনি জামায়াত এমপিকে ওভেন দিতে চান। প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে ওয়াশিং মেশিন দেওয়া হলে সংসার সাজিয়ে দেওয়া হবে।

জামায়াতের একজন সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, মিজানুর রহমানের বক্তব্যটি ছিল অপ্রয়োজনীয়। এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, ওভেন থেকে শুরু করে সব ধরনের আসবাব সংসদ সচিবালয় থেকে সরবরাহ করা হয়। তিনি এসব আসবাব না পেয়ে থাকলে সংসদের হাউস কমিটিকে জানালেই সমাধান হয়ে যেত। হাউস কমিটিতে জামায়াতের প্রতিনিধিও রয়েছেন। তাঁকে বললেও হতো। বাজেট অধিবেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের বক্তৃতায় বিষয়টি তোলায় মানুষের কাছে এই বার্তা গেল– জামায়াতের এমপিরা ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা নিতে চাইছেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তা কাজে লাগিয়েছে।

সরাসরি এবং সংরক্ষিত নারী আসন মিলিয়ে জামায়াত জোটের এমপির সংখ্যা ৯০। তাদের ৮৬ জন এবারই প্রথম সংসদে গেছেন। সংসদের কার্যকলাপ নিয়ে প্রথম অধিবেশনের আগে এমপিদের দুই দিনের প্রশিক্ষণ দেয় জামায়াত। বাজেট অধিবেশনের আগেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

জামায়াত জোটের সংসদীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করা দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ। তিনি বলেন, প্রায় সবাই নতুন এমপি হওয়ায় সংসদীয় রীতিনীতি শিখতে কিছুটা সময় লাগছে।

গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই; চারজনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন; ১১ জনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা।’

পরে জানা যায়, এমপি মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে। তাঁর বাবা জীবিত। এ বক্তব্যের কারণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। সামাজিক মাধ্যমে ট্রল হয়। এমপি পরে ভুল স্বীকার করে বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন।

তবে একেক সংবাদ মাধ্যমকে একেক কথা বলেছেন এমপি মুনতাকিম। কোথাও বলেছেন, মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন। কোথাও বলেছেন, বক্তৃতার সময় অসুস্থ ছিলেন। এতে জামায়াতের জ্যেষ্ঠ নেতারা আরও বিব্রত হন। মুনতাকিমকে সংসদীয় দলের তরফ থেকে সতর্ক করা হয়।

সংসদীয় দলের একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য বলেন, ‘ভুল বলার পর আত্মপক্ষ সমর্থনের সময়ও ভুল করে জামায়াতকে আরও সমালোচনায় ফেলেছেন মুনতাকিম। তিনি যদি বলতেন, ‘বাবা-দাদা বলতে সবার পূর্বপুরুষকে বুঝিয়েছি’; তাহলেও এত বিতর্ক হতো না। কিন্তু দলের সঙ্গে পরামর্শ না করে একেক জায়গায় একেক কথা বলেছেন। তাতে জামায়াত তাঁর পক্ষও নিতে পারেনি।

আমির হামজা বিড়ম্বনা
বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে সংসদের বাইরে থাকা মাল্টিমিডিয়ার রিপোর্টারদের সঙ্গে কুষ্টিয়া-৩ আসনের এমপি আমির হামজা বাজেট নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত। আরেকবার বলেন, বাজেট ছয় হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত।

এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। আমির হামজা পরে জানান, তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া উচিত। মুখ ফসকে ছয় হাজার কোটি বলে ফেলেছেন।

আমির হামজার বক্তব্যেও অস্বস্তিতে পড়েছেন জামায়াত নেতৃত্ব। দলটির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, জামায়াত দীর্ঘ সময় নিয়ে ছায়া বাজেট করেছে। এর আকার ছিল আট লাখ ৩৯ হাজার কোটি টাকা। দলের এমপিরা তা পড়েননি। টিভি চ্যানেল সামনে পেলে কিছু বলতেই হবে– এই মানসিকতা থেকে আমির হামজা ছয় হাজার বা ছয় লাখ কোটি টাকা বলেছেন। তিনি দলের প্রতিনিধিত্বও ঠিকমতো করতে পারছেন না।

জামায়াতের নায়েবে আমির এবং বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সবাই নতুন এমপি, তাই শিখতে একটু সময় লাগছে। যেখানে যা ভুল হচ্ছে, তা ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

বাজেট আলোচনায় ইতিবাচক প্রস্তাব দিতে গিয়েও গুলিয়ে ফেলেন আমির হামজা। তিনি বলেন, নিম্নমানের সিগারেটের প্রতি শলাকার দাম ছয় টাকা ২০ পয়সা। কিন্তু খুচরা পয়সা না থাকায় তা সাত টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এতে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

এই বক্তব্যের সূত্র ধরে সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা হয়– জামায়াত এমপি সিগারেটের দাম কমাতে বলেছেন। জামায়াত সংসদীয় দল সমকালকে জানিয়েছে, আমির হামজা ভুলভাবে বক্তৃতা করায় এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তাঁকে বলতে বলা হয়েছিল, নিম্নমানের সিগারেটের দাম ছয় টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ হলেও বিক্রেতা সাত টাকায় বিক্রি করেন। এর মাধ্যমে তামাক কোম্পানি ও বিক্রেতাদের ৮০ পয়সা বেশি লাভ হয়। সরকার বাড়তি অর্থের কর পায় না। সরকার ছয় টাকা ২০ পয়সার ওপর কর পায়। কোম্পানি ও দোকানির পকেটে যাওয়া ৮০ পয়সার ওপর কর আদায় সম্ভব হলে বাড়তি পাঁচ হাজার কোটি টাকা কর পাবে সরকার। আমির হামজা লিখিত এ বক্তব্য গুলিয়ে ফেলায় বিতর্ক হচ্ছে।

বাজেট বক্তৃতায় ইসলামী ব্যাংক, হাসপাতাল
জামায়াত এমপিদের মধ্যে পাবনা-১ আসনের নাজিবুর রহমান মোমেন, যশোর-৬ আসনের মোক্তার আলী, জয়পুরহাট-১ আসনের ফজলুর রহমান সাঈদসহ কয়েকজন এমপি বাজেট আলোচনায় কর হ্রাস এবং অর্থনীতি নিয়ে কথা বলেন। বাকি সবার বক্তৃতায় প্রশ্ন ছিল, সরকার ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা কীভাবে অর্জন করবে? বাজেটের চেয়ে ইসলামী ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ, আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স স্থগিত হওয়ার প্রতিবাদে বেশি কথা বলেন তারা।

অর্থ বিলে সংশোধনী প্রস্তাব নেই
অর্থ বিলে জামায়াত, এনসিপির এমপি কেউ সংশোধনী প্রস্তাব দেননি। শুধু বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বাজেট বক্তৃতায় দেশে উৎপাদিত বাইসাইকেলে কর কমানোর মৌখিক প্রস্তাব রাখেন। বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

সরকারি দল অর্থ বিলে ৬৪টি সংশোধনী প্রস্তাব দেয়, যার সবই পাস হয় কণ্ঠভোটে। বিরোধী দল বাজেটের সমালোচনা করে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব করলেও সংশোধনী প্রস্তাব দেয়নি।

এ বিষয়ে জামায়াত হুইপ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠ। প্রস্তাব দিয়ে লাভ নেই। বিরোধী দল আয়কর সীমা বৃদ্ধি, ছোট ব্যবসায় কর না বসানোর মতো দাবি জানিয়েছে। সেগুলো পূরণ হয়েছে।

জামায়াত এমপিরা নিষ্প্রভ
১১ জুন বাজেট ঘোষণার সন্ধ্যায় জামায়াত তা প্রত্যাখ্যান করে বিক্ষোভ মিছিল করে। সামাজিক মাধ্যমে মিছিলের ব্যানার সম্পাদনা করে ছড়ানো হয়– মদ ও সিগারেটের ওপর কর বৃদ্ধির প্রতিবাদ করেছে জামায়াত। এরপর প্রধানমন্ত্রী জামায়াতের সমালোচনা করে সংসদে বলেন, বিরোধী দল মদ, সিগারেটের দাম বৃদ্ধিতে খুশি হতে পারেনি।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ফ্যাক্টচেকিংয়ে সঠিক নয় জানার পরও সংসদে জামায়াত এমপিরা এ নিয়ে সরকারি দলের ওপর চাপ তৈরি করতে পারেননি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, লোডশেডিং নিয়ে স্বতন্ত্র এমপি রুমিন ফারহানা সরকার, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিদ্যুৎমন্ত্রীর কড়া সমালোচনা করলেও জামায়াত এমপিরা ছিলেন নিষ্প্রভ।

জামায়াত রাজপথে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করলেও সংসদে এ বিষয়ে সরকারকে চাপে রাখেনি।

সংসদের বাইরে বিব্রত
বাজেট অধিবেশন চলাকালে খবর বের হয়– নড়াইল-২ আসনের এমপি আতাউর রহমান বাচ্চুর মেয়ের নাম সরকারি সহায়তার তালিকায় দুইবার রয়েছে। সরকার এমপিদের যে বরাদ্দ দেয়, তা থেকে তারা যে কাউকে এই সহায়তা দিতে পারেন। কিন্তু এমপির নিজের মেয়ে বরাদ্দ পেলে তা অনৈতিক এবং স্বার্থের সংঘাত।

এ সংবাদ প্রচার হওয়ার পর আতাউর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আবু সালেহ গোফরানকে বরাখাস্ত করেন। এমপি বলেন, পিএ তাঁর অজ্ঞাতে তালিকায় নাম দিয়েছেন। একজন এমপির মেয়ের কি সরকারি সহায়তার ১৮ হাজার টাকার দরকার আছে?

এ ঘটনায় সমালোচনার মুখে জামায়াত সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সতর্ক করেছেন এমপিকে। এর তিন দিন পরই খবর প্রকাশিত হয়, রংপুর-৬ আসনের এমপি নুরুল আমিন তাঁর ভগ্নিপতির বাড়ির মসজিদ উন্নয়ন এবং মাটি ভরাটে ১০ টন গম বরাদ্দ দিয়েছেন। একই গ্রামে রাস্তা সরলীকরণ ও পুকুরে গাইড ওয়াল নির্মাণে প্রকল্প নিয়েছেন। দুটি প্রকল্পের কমিটির সভাপতি এমপির ভগ্নিপতি ও ভাগনে।

এ ঘটনায় জামায়াত পদক্ষেপ নেয়নি। দলটির ব্যাখ্যা হলো, এখানে আইন ও নৈতিকতার লঙ্ঘন হয়নি। কারণ, প্রকল্পগুলো অপ্রয়োজনীয় নয়। এমপিরা যে কোনো এলাকায় প্রকল্প নিতে পারেন। তা নজরদারিতে কমিটির দায়িত্ব পালন করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু সংবাদ মাধ্যম আগ্রহ নিয়ে প্রচার করছে জামায়াতের এমপি হওয়ার কারণে।

হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, একই ঘটনা অন্য দলের ক্ষেত্রে যেভাবে দেখা হয়, জামায়াতের ক্ষেত্রে সেভাবে দেখে না সংবাদ মাধ্যম ও নাগরিক সমাজ। সরকারকে জবাবদিহি করার চেয়ে জামায়াতের সমালোচনায় বেশি আগ্রহী তারা। তিনি বলেন, জামায়াত সমালোচনাকে স্বাগত জানায়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সমালোচনাগুলো আসছে জামায়াত-বিরোধিতা থেকে।

Exit mobile version