ডিপফেক (Deepfake) হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি এমন ভুয়া ভিডিও, অডিও বা ছবি—যেখানে কাউকে এমন কিছু বলতে বা করতে দেখানো হয়, যা তিনি বাস্তবে বলেননি বা করেননি।
এতে মূলত ডিপ লার্নিং ও মেশিন লার্নিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। এসব ক্ষেত্রে মানুষের স্থিরচিত্র ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো ভিডিওর নানা উপাদানকেও কাজে লাগানো হয়৷ বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই শাখাটি অপতথ্যের হাতিয়ার হিসেবে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডিপফেকের সীমিত ব্যবহার দেখা গিয়েছিল এবং তাতেই সংশ্লিষ্ট প্রার্থীরা যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুই বছর পর এসে, এবার পরিস্থিতি বেশ ভয়াবহ।

গত বছর ৮৬টি ডিপফেক ভিডিওসহ সর্বমোট ৬০৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার, যাতে এআই প্রযুক্তির ব্যবহার লক্ষ্য করা গেছে। এই সংখ্যা ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৪০৯ শতাংশ বেশি। চলতি মাসের প্রথম ২৬ দিনেই ১০টি ডিপফেক ভিডিওসহ সর্বমোট ৭৩টি এআই কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে যার প্রায় সবগুলোই রাজনীতি কেন্দ্রিক।
এআই বা ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করতে হলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল করা দরকার। প্রথমত, ভিডিওতে মুখের অভিব্যক্তি ও ঠোঁটের নড়াচড়া কণ্ঠের সঙ্গে মিলছে কি না তা পর্যবেক্ষণ করা জরুরি, কারণ অনেক এআই ভিডিওতে লিপ-সিঙ্ক ঠিক থাকে না। চোখের পলক ফেলা অস্বাভাবিকভাবে কম বা বেশি হওয়া, চোখের দৃষ্টি স্থির না থাকা কিংবা মুখের গঠনে অদ্ভুত বিকৃতি দেখা গেলেও সন্দেহ হতে পারে। পাশাপাশি ভিডিওর আলো ও ছায়ার সঙ্গে মুখের আলো-ছায়ার সামঞ্জস্য না থাকলে সেটিও একটি লক্ষণ হতে পারে। কণ্ঠের ক্ষেত্রে রোবোটিক টোন, অস্বাভাবিক উচ্চারণ বা আবেগের ঘাটতি ডিপফেকের ইঙ্গিত দেয়। দ্বিতীয়ত, এআইভিত্তিক টুলের মাধ্যমে ছবির বা ভিডিওর পিক্সেল স্তরের অমিল, মুখের মাইক্রো এক্সপ্রেশন এবং আলো-ছায়ার অসামঞ্জস্য খুঁজে দেখা যায়। এছাড়া অডিও কনটেন্টের ক্ষেত্রে কণ্ঠের ফ্রিকোয়েন্সি প্যাটার্ন বা উচ্চারণের অস্বাভাবিকতা বিশ্লেষণ করা হয়। মেশিন লার্নিং মডেল ব্যবহার করে জানা যায় কোন অংশ কৃত্রিমভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বা নকল করা হয়েছে। তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কনটেন্টের উৎস যাচাই করা। বাংলাদেশে বর্তমানে বেশ কিছু ফেসবুক পেজ এবং টিকটক অ্যাকাউন্ট তৈরি হয়েছে যেগুলোতে নিয়মিতই এআই কনটেন্ট প্রকাশ করা হয়। রাজনৈতিক এসব কনটেন্ট তারা বিনোদনের উদ্দেশ্যে প্রচার করছে বলে দাবি করলেও কনটেন্টগুলো অন্যান্য অ্যাকাউন্ট বা পেজে ছড়াচ্ছে কোনো রকম ডিসক্লেইমার ছাড়াই, যা স্পষ্টতই বিভ্রান্ত করছে নেটিজেনদের। এজন্য কোনো কনটেন্টকে এআই বলে সন্দেহ হলে তার উৎস খোঁজার চেষ্টা করতে হবে।
নারী প্রার্থীরা আলাদা টার্গেট
গেল বছর শুরুর দিকে নারী রাজনীতিবিদদের নিয়ে তেমন অপতথ্যের প্রবাহ দেখা না গেলেও, বছরের শেষ দিকে এসে টার্গেট করে সম্ভাব্য নারী প্রার্থীদের নামে ভুয়া কনটেন্টের প্রচার হতে দেখা গেছে। গত অক্টোবরে রিউমর স্ক্যানারের এক গবেষণায় দেখা যায়, সে বছরের প্রথম নয় মাসে দেশের অন্তত ৭টি রাজনৈতিক দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনের ২৫ জন নারী নেতাকর্মীকে জড়িয়ে অন্তত ২৩৭টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসব অপতথ্যের সিংহভাগই তরুণ রাজনীতিবিদ, যারা এবারের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সাথে যুক্ত আছেন। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যাচ্ছে, এবার নারী প্রার্থী ৭৬ জন। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঝালকাঠি-১ আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন দিয়েছিল কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. মাহমুদা আলম মিতুকে। এনসিপি জামায়াতে ইসলামির সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার পর আসন সমঝোতার কারণে জামায়াতের প্রার্থীকে সমর্থন নিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তে এই আসন থেকে নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন মিতু। তবে তাকে নিয়ে এর পূর্বেই গত নভেম্বর থেকে অন্তত ১৩টি অপতথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার। এসব অপতথ্যে আপত্তিকর বিভিন্ন ছবির ব্যবহার যেমন দেখা গেছে, তেমনি ব্যবহার করা হয়েছে এআইকেও।
গত ডিসেম্বরে এনসিপি থেকে পদত্যাগ করেন দলটির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. তাসনিম জারা। ঢাকা-৯ আসন থেকে নির্বাচন করছেন জারা। প্রথম দলের প্রার্থী হলেও পদত্যাগ করে এখন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের ময়দানে আছেন তিনি৷ পদত্যাগের পূর্বে গেল বছর জারাকে জড়িয়ে অন্তত ২০টি এবং পদত্যাগ পরবর্তী সময়ে তাকে জড়িয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৯টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে চেয়েছিলেন তিনি৷ তবে জোটের আসব সমঝোতার পর এই আসনে জোটের আরেক প্রার্থী মনোনয়ন পাওয়ায় তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন এই নির্বাচনে। যার কারনে দল থেকে বহিষ্কার হন তিনি। বহিষ্কারের পূর্বে গেল বছর রুমিনকে জড়িয়ে অন্তত ১৪টি এবং পদত্যাগ পরবর্তী সময়ে তাকে জড়িয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর ক্ষমতায়ন সবসময়ই আলোচনার বিষয়বস্তু। সেই জায়গায় এমন ‘টার্গেটেড ডিসইনফরমেশন’ নারী রাজনীতিবিদদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে, অনেক ক্ষেত্রে রাজনীতিতে তাদের অংশগ্রহণও হুমকির মুখে পড়ে যাচ্ছে।
নারী প্রার্থী বা রাজনীতির ময়দানে যে নারীরা এখন সক্রিয় রয়েছেন তাদের জড়িয়ে যে অপতথ্যের প্রবাহ তা মোকাবিলায় প্রথম পদক্ষেপই হতে হবে সচেতনতা এবং সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। নারীরা যেহেতু এআই এবং ভুয়া ফটোকার্ডের সহজ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেছেন সেক্ষেত্রে এই দুই মাধ্যম ব্যবহার করে অপতথ্য ছড়ালে তা যে ভুয়া তা সংশ্লিষ্ট নারী তাদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে প্রচার করতে পারেন। যে গণমাধ্যমের আদলে ভুয়া ফটোকার্ড বানানো হয়, সেই গণমাধ্যমও আলাদা একটি পোস্ট করে জানাতে পারে যে এটি আসলে ভুয়া ফটোকার্ড। এই দুইটি প্রক্রিয়া কার্যকরী, অনেক ক্ষেত্রে এর মাধ্যমে অপতথ্য থামাতে সহায়তার প্রমাণও পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। অনেক ক্ষেত্রে অপতথ্য যিনি ছড়ান তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনী ব্যবস্থাও একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করে দেয়। তবে আইনের দীর্ঘসূত্রিতার কারণে অনেকেই এই পথে যেতে চান না। তবু রিউমর স্ক্যানার আইনী ব্যবস্থাতেই আস্থা রাখার পরামর্শ দেয়।
সাম্প্রদায়িক ন্যারেটিভের ফাঁদ
সম্প্রতি আরেকটি ধরণ নিয়েও আশঙ্কার জায়গা তৈরি হয়েছে, সাম্প্রদায়িক প্রোপাগাণ্ডা। বাংলাদেশে আমরা বরাবরই দেখে এসেছি, গুরুত্বপূর্ণ কোনো ইভেন্ট বা ইস্যু যখন সামনে থাকে তখন সাম্প্রদায়িক প্রোপাগাণ্ডার পরিমাণ বেড়ে যায়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটার সুযোগে এমন অনেক কনটেন্টও ছড়ানো হয় যার সাথে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্কই নেই। এই প্রোপাগাণ্ডাগুলো মূলত ভারতের বিভিন্ন এক্স অ্যাকাউন্ট এবং ক্ষেত্রবিশেষে দেশটির গণমাধ্যমও ছড়িয়ে থাকে। ২০২৫ সালে ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশকে নিয়ে অন্তত ১৫৫টি অপতথ্য ছড়ানোর প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ বেশি। এই পরিসংখ্যান শুধু অপতথ্যের বিস্তৃতি নয়, বরং এর ধারাবাহিক বৃদ্ধির প্রবণতাও তুলে ধরে। আরও উদ্বেগজনক হলো—এই অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে ভারতের মূলধারার গণমাধ্যমের সক্রিয় ভূমিকা। গত বছর ৭৩টি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ৩৮টি ঘটনায় মোট ১৪০টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে বাংলাদেশকে জড়িয়ে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। শনাক্ত হওয়া অপতথ্যগুলোর প্রায় ৫৮ শতাংশই সাম্প্রদায়িক ঘটনা সংক্রান্ত। এই সংখ্যার আধিক্য নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে আরো বেড়ে যাওয়া সংক্রান্ত আশঙ্কার জায়গা তৈরি করে দিচ্ছে।

চলতি মাসের প্রথম ২৬ দিনে ২৮টি সাম্প্রদায়িক অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার, যার প্রায় ৭৯ শতাংশই ভারতীয় উৎস থেকে এসেছে।
সাম্প্রদায়িক প্রোপাগাণ্ডা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষের প্রথম কাজ হলো সব খবর সত্য ধরে না নিয়ে যাচাই করার অভ্যাস গড়ে তোলা। কোনো ঘটনায় সংখ্যালঘু ভিক্টিম হলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাম্প্রদায়িক—এই ধারণা ভুল। বুঝতে হবে কোনটা সাধারণ অপরাধ, আর কোনটা হেট ক্রাইম।
অনেক সময় তদন্তের আগেই বা তদন্তে সাম্প্রদায়িক প্রমাণ না থাকলেও ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়া হয়—বিশেষ করে কিছু উগ্রবাদী অ্যাকাউন্ট ও ভারতীয় মিডিয়া বাংলাদেশের ঘটনাগুলোকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিকৃত করে তুলে ধরে। দুর্ঘটনা, ব্যক্তিগত বিরোধ, আত্মহত্যা বা সাধারণ খুনকেও সাম্প্রদায়িক বলে প্রচার করা হচ্ছে, যা ভয় ও ঘৃণা ছড়ায় এবং সমাজে বিভাজন তৈরি করে।
তাই দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে আমাদের উচিত—ঘটনার উৎস যাচাই করা, বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্র দেখা, মোটিভ বোঝার চেষ্টা করা এবং অন্ধভাবে কোনো ন্যারেটিভ বিশ্বাস না করা। কারণ, কোনো ঘটনা সাম্প্রদায়িক হতে হলে সেখানে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য স্পষ্টভাবে থাকতে হবে।




















