চারবার হামলা হয়েছে ড, দীপঙ্কর ভান্তের মন্দির ও সমর্থকদের উপর

সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই দীপঙ্কর ভান্তের সাথে জেএসএস’র বিরোধ

fec-image

রাঙামাটি জেলার বিলাইছড়ি উপজেলার পুড়িয়ে দেয়া ধুপশীল আন্তর্জাতিক বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের প্রধান ভিক্ষুক ড. এফ দীপঙ্কর ভান্তে এ ঘটনার জন্য পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা শান্তিবাহিনীকে দায়ী করেছেন।

পার্বত্যনিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জোর দিয়ে তিনি এ ঘটনার জন্য শান্তিবাহিনীকে দায়ী করে বলেন, মূলত তিনি এলাকাবাসীকে সন্ত্রাস, মাদক, চাঁদাবাজী, জুলুমের বিরুদ্ধে বলতেন। এতে মানুষ সন্ত্রাসের পথ থেকে ফিরে আসতো যা সন্ত্রাসীদের পছন্দ ছিলো না। তারা চাইতো এলাকায় সন্ত্রাস, চাঁদাবাজী চলবে। কিন্তু তিনি তাতে সায় না দেয়ায় এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে।



এদিকে কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় ৪ নং বিলাইছড়ি ইউনিয়নের মেম্বার অমৃত কান্তি তঞ্চঙ্গা পার্বত্যনিউজকে বলেন, যারা ড. দীপঙ্কর ভান্তে আসতে বাঁধা দিচ্ছে, যারা এই মন্দির তৈরিতে বাঁধা দিচ্ছে তারাই এই মন্দিরে আগুন দিয়েছে।

উল্লেখ্য সন্ত্রাসীদের উপর্যুপুরি হুমকির মুখে ড. এফ দীপঙ্কর ভান্তে বিলাইছড়ি ছেড়ে বর্তমানে বান্দরবান অবস্থান করছেন।

সূত্র মতে, ঘটনার সময় মন্দিরে উপস্থিত সেবক সুচেন্দ্র কান্তি তঞ্চঙ্গা(৭০) পার্বত্যনিউজকে বলেন, আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে ১০-১৫জনের একটি সন্ত্রাসী দল মন্দিরের গেটে ধাক্কা দিয়ে দরোজা খুলতে বলে। এসময় সন্ত্রাসীরা তাকে বেশ কয়েকটি লাথি মারে। এতে তিনি আহত হন।

পরে তাকে পুলিশ উদ্ধার করে বিলাইছড়ি সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। হাসপাতাল থেকে আহত সেবক সুচেন্দ্র কান্তি পার্বত্যনিউজকে বলেন, সন্ত্রাসীরা তাকে বন্দুক দিয়ে গুলি করার ভয় দেখিয়ে চুপ থাকতে এবং একদম মুখ না খুলতে শাসায়। তার অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।

এদিকে শুক্রবারের ঘটনায় মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিদ্যা সাগর তঞ্চঙ্গা বাদী হয়ে শনিবার সন্ধ্যায় বিলাইছড়ি থানায় একটি এজহার জমা দিয়েছে। এজহারে বলা হয়েছে, বুট ও মুখোশধারী সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালায়। মূর্তি, পূজার বিভিন্ন উপাচারসহ এ হামলায় কমপক্ষে ১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

বিলাইছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পারভেজ আলী পার্বত্যনিউজকে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, একটি এজহার জমা পড়েছে এবং মামলা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

মামলার দাবী বিদ্যা সাগর তঞ্চঙ্গা(৫০) পার্বত্যনিউজকে বলেন, পাহাড়ী সন্ত্রাসীরাই এ আগুন দিয়েছে। তবে কারা দিয়েছে তা তিনি দেখেন নাই।

ড. দীপঙ্কর মহাথেরো ও জেএসএস পুরোনো বিরোধ

এদিকে সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আর্কাইভ থেকে দেখা যায়, ড. এফ দীপঙ্কর ভান্তের কার্যক্রমের সাথে পাহাড়ী একটি সন্ত্রাসী গ্রুপের গত দুই বছরের অধিক সময় ধরে বিরোধ চলে আসছে। মূলত তার বাঙালি হওয়া এবং সন্ত্রাস বিরোধী ভূমিকার কারণে সন্ত্রাসীদের চক্ষুশূলে পরিণত হন।

সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের আর্কাইভ থেকে দেখা যায়, ২০১৮ সালের ২১ মার্চ ভিক্ষুক ও শ্রবণসহ ১০জনের একটি পূজারী দল নৌকাযোগে উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নে বৌদ্ধ ভিক্ষু ডা. দীপংকর মাহাথির ভান্তের সাথে দেখা করার যাত্রা করে।

এসময় পূজারীদের বহনকারী নৌকাটি ওই ইউনিয়নের উলুছড়িস্থ মাসকুমড়া নামক এলাকায় পৌঁছলে পাহাড়ে ওঁত পেতে থাকা সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পূজারীদের লক্ষ করে ১০-১২ রাউন্ড গুলি ছুঁড়লে নৌকায় অবস্থান করা একটি নয় বছরের শিশু মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে। সফরকারী দলে থাকা দীপঙ্কর ভন্তের শিষ্য প্রজ্ঞামিত্র ভান্তে এ খবর নিশ্চিত করেন।

গুলিবিদ্ধ শিশুটির নাম সুনীল তঞ্চাঙ্গ্যা (০৯), পিতা স্বপন কুমার তঞ্চঙ্গা। ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ শিশুটিকে উদ্ধার করে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হিসাবে জানা যায়, ড. এফ দীপঙ্কর ভান্তে নামের এক ধর্মগুরু গুয়াইনছড়িতে একটি কিয়াংঘর নির্মাণ করেছে। স্থানীয় একটি আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংগঠন এই কিয়াংঘর নির্মাণের বিরোধিতা করে। এই নিয়ে তাদের ১০/১২ জনের একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ ২০ মার্চ ঐ কিয়াংঘরে হামলা করে ভাংচুর চালায়।

পরে স্থানীয়রা হামলার অভিযোগে মঙ্গা রাম তঞ্চঙ্গা(১৬), পিতা- উচাই চন্দ্র রাম, গ্রাম উড়াইছড়িকে আটক করে পুলিশকে খরব দেয়। পুলিশ উক্ত সন্ত্রাসীকে আটক করতে ঘটনাস্থলে রওনা দিলে ওই ঘটনার প্রতিশোধ হিসাবে সন্ত্রাসীরা উক্ত ভান্তের ভক্তদের উপর হামলা করে।

নিরাপত্তা বাহিনীর টহল দল ঘটনাস্থলে পৌঁছালে স্থানীয় জন প্রতিনিধি ও ভান্তের শিষ্যরা ৬ জন সন্ত্রাসীকে আটক করে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে। তাদের মধ্যে তিনজন গুলি করার কথা স্বীকার করে। সন্ত্রাসীদের কাছে ৪টি আগ্নেয়াস্ত্র থাকলেও তারা আগেই তা সরিয়ে ফেলে।

এদিকে এ ঘটনার ১০ দিন পরে ১ এপ্রিল ২০১৮ সকাল ১১ টায় ফারুয়া ইউনিয়নের তক্তনালা বাজারে মটর সাইকেল সারাতে গিয়ে ৪ যুবক একসাথে বসে চা খায়। এরপর থেকে তাদের আর দেখা যায়নি। নিখোঁজ যুবকদের পরিবারের পক্ষ থেকে জেএসএস সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ আনা হয়।

অপহৃত যুবকের নাম তুফান তঞ্চঙ্গা(২৬), পিতা সমূল্য তঞ্চঙ্গা। তার বাড়ি উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের গোয়াইনছড়ি গ্রামে। নিখোঁজ অপর তিন যুবকের নাম আদর তঞ্চঙ্গা(২৫), পিতা- সাবেক চেয়ারম্যান চাথোই তঞ্চঙ্গা, রাজেশ তঞ্চঙ্গা(২৬) ও উদয় তঞ্চঙ্গা(৩০)। তাদের প্রত্যেকের বাড়ি গোয়াইনছড়িতে।

ঘটনার কারণ হিসাবে জানা গেছে, ড. এফ দীপঙ্কর ভান্তে গোয়াইনছড়িতে একটি কিয়াংঘর নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলে স্থানীয় এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে কিয়াংঘরটি নির্মাণে সহায়তা করে।

আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএসের একটি অংশ এই কিয়াংঘর নির্মানের বিরোধিতা করছিলো দীর্ঘদিন ধরে। কারণ ঐ ভান্তে স্থানীয়দের জেএসএসের চাঁদাবাজী ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সচেতন করে থাকে। অপহৃত তুফান তঞ্চঙ্গার পিতা সমূল্য তঞ্চঙ্গা এই কিয়াংঘর নির্মাণে নেতৃত্ব দিচ্ছিল। কাজেই তার ছেলেকে অপহরণ করে কিয়াংঘর নির্মাণে বাধা দেয়ার উদ্দেশ্যে এই অহরণ করা হয়।

এ ব্যাপারে সে সময় সমূল্য তঞ্চঙ্গার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি পার্বত্যনিউজকে পুত্র অপহরণের কথা স্বীকার করে বলেন, স্থানীয় জেএসএস সভাপতি চন্দ্র চাকমা, সাধারণ সম্পাদক নীলু তঞ্চঙ্গা, সদস্য প্রদীপ তঞ্চঙ্গা অক্কা, মধু তঞ্চঙ্গা মিলে এই অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। নিখোঁজ আদর, রাজেশ ও উদয় চাকমা তাদের সাথে জড়িত। কারণ তাদেরকে দেখা গেছে। অপহরণকারীরা তার উপর দুইবার গুলি করেছে বলেও তিনি জানান।

অপহরণের কারণ সম্পর্কে তিনি কিয়াংঘর নির্মাণের তার সম্পৃক্ততার কথা বলে জানান, তাকে থামাতে এ পর্যন্ত তার উপর দুইবার হামলা হয়েছে।

একই বছরের ১৫ জুন দীপঙ্কর ভান্তের উদ্যোগে মন্দির নির্মাণ নিয়ে বিরোধের জের ধরে মন্দির বিরোধী সন্ত্রাসীদের গুলিতে তিনজন আহত হয়।

আহতরা হলেন- প্রদীপ তঞ্চঙ্গ্যা, সুবল তঞ্চঙ্গ্যা এবং নিরলস তঞ্চঙ্গ্যা। আহতদের ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে রাতে রাঙামাটি জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ওই উপজেলার ফারুয়া ইউনিয়নের এগুইজ্যাছড়ি এলাকায় ধর্মীয় গুরু দীপংকর ভান্তে মহাথেরো’র বৌদ্ধ বিহার নির্মাণকে কেন্দ্র করে একটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে বাঁধা প্রদান করে আসছে।

১৫ জুন ২০১৮ তারিখে দুপুরের দিকে বিহার নির্মাণকে কেন্দ্র করে দু’গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে হঠাৎ করে বিহার নির্মাণ বিরোধী গ্রুপের সদস্য নিরলস তঞ্চঙ্গ্যা গুলি করলে ঘটনাস্থলে তিনি এবং বিহার নির্মাণ গ্রুপের সদস্য প্রদীপ তঞ্চঙ্গ্যা এবং সুবল তঞ্চঙ্গ্যা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়।

এ ব্যাপারে জেএসএসের বক্তব্য জানতে তাদের একাধিক নেতার সাথে কথা বলার জন্য তাদের মুঠোফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও সংযোগ পাওয়া যায়নি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

12 − 10 =

আরও পড়ুন