সরকারি নির্দেশনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিএইচটি কমিশন: প্রত্যাহারের আহবান

সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:

পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি, সকল দেশি-বিদেশী ব্যক্তি ও সংস্থাসমূহ সেখানকার ‘আদিবাসীদে’র সাথে কথা বলা বা সভা করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসন বা সেনাবাহিনী বা বিজিবি’র উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের নাম থেকে ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ দেয়া সহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কতিপয় সিদ্ধান্তের পর একের পর বিবৃতি দিয়ে মাঠ গরমের যে চেষ্টা করা হচ্ছে তাতে আবারো ঘি ঢালতে শুরু করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর্ন্তজাতিক কমিশন।

রোববার সংগঠনটির পক্ষ থেকে প্রেরিত এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে বিষয়ে গৃহীত কতিপয় সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে গৃহীত কতিপয় সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম আর্ন্তজাতিক কমিশনের কো-চেয়ারম্যান এরিক এভিব্যুরি, কো-চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল এবং কো-চেয়ারম্যান এলসা স্টামাতোপৌলৌ।

বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি, সকল দেশি-বিদেশী ব্যক্তি ও সংস্থাসমূহ সেখানকার ‘আদিবাসীদের’ সাথে কথা বলা বা সভা করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসন বা সেনাবাহিনী বা বিজিবি’র উপস্থিতি নিশ্চিত করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের নাম থেকে ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ দেয়া, চেকপোস্টগুলো সচল করা, পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত আদিবাসী পুলিশ-আনসার সদস্যদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অন্যত্র বদলি করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করে এসব সিদ্দান্তকে অসাংবিধানিক, বৈষম্যমূলক ও পার্বত্য শান্তিচুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক বিবেচনা করে অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়।

বিবৃতিতে ৭ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় ৪ ও ৫ নং সিদ্ধান্তের আলোকে বিদেশী নাগরিকগণ পার্বত্য চট্টগ্রাম ভ্রমণের জন্য একমাস পূর্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুমতির জন্য আবেদন এবং গোয়েন্দা সংস্থার ইতিবাচক প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের ভ্রমণের অনুমতি পাবেন। আর বিদেশী কোন সংস্থা বা ব্যক্তি পার্বত্য অঞ্চল ভ্রমণের অনুমতি পাওয়ার পর সুনির্দিষ্টভাবে ভ্রমণসূচি স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের কাছে জমা দেয়াসহ দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা সংস্থা ‘আদিবাসীদে’র সাথে কথা বলতে গেলে সেখানে স্থানীয় প্রশাসন বা বিজিবি’র উপস্থিতিতে তাদের কথা বলার যে বিধান করা হয়েছে তা শুধু দেশি-বিদেশি নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের ওপর হস্তক্ষেপই নয় এটি একটি প্রচণ্ড বর্ণবিদ্বেষী সিদ্ধান্ত যা পার্বত্য শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নের ওপরও প্রভাব ফেলবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসকারী আদিবাসীদের সাথে সাক্ষাত করতে বা সভা করতে গেল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে প্রশাসন বা বিজিবি’র উপস্থিতিতে কথা বলার বিষয়টি নি:সন্দেহে চরম জাতিবিদ্বেষী, বৈষম্যমূলক, অসাংবিধানিক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হরণের সামিল বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেন তারা।

৯ নং নির্দেশনায় স্থানীয় জনগণের সাথে সৌর্হাদ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে সেক্টর/ব্যাটালিয়ন/বিওপি ও অন্যান্য স্থাপনার জন্য অধিগ্রহণকৃত জমিতে কার্যμম পরিচালনার কথা বলা হয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় শান্তিচুক্তির শর্ত মোতাবেক সংশোধিত পার্বত্য জেলা পরিষদ আইন, ১৯৯৮ এ বলা হয়েছে পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুমতি ব্যতিরেকে কোন জমি অধিগ্রহণ করা যাবে না। পার্বত্য জেলা পরিষদের অনুমতি ব্যতিরেকে শুধুমাত্র জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অনুমতি নিয়ে বিজিবি তাদের সেক্টর, ব্যাটালিয়ন, বিওপি স্থাপনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছে এবং বেশ কিছু জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে সিএইচটি কমিশন তাদের উদ্বেগের কথা জানায়।

বিজিবির জন্য জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের কথা বলা হলেও আদিবাসীদের ব্যবহৃত জমি জমি অধিগ্রহণ করা হচ্ছে উল্লেখ করে তারা বলেন মন্ত্রণালয়ের এ ধরনের নির্দেশনায় কমিশন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

নিরাপত্তার নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভিন্ন স্থানে অনেক চেকপোস্ট রয়েছে উল্লেখ করে বিবৃতিতে কমিশন গভীর উদ্বেগে প্রকাশ করে বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে যেসব সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা কিংবা আদিবাসী নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে সেসবের অধিকাংশই এসব চেকপোস্টের দৃষ্টি সীমার মধ্যে সংঘটিত হয়েছে। যেমন সাম্প্রতিক সময়ে নানিয়াচরের বগাছড়ির ঘটনায়ও সেনাক্যাম্পসহ চেকপোস্ট নিকটে থাকা সত্বেও ‘আদিবাসীদে’র গ্রামে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তাই নিরাপত্তার নামে যে চেকপোস্টগুলো আছে সেগুলো যে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের নিরাপত্তা বিধানের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে অনিষ্টই করে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করে কমিশন।

পার্বত্য জেলাসমূহে পুলিশ ও আনসারবাহিনীতে যেসব প্রাক্তন শান্তিবাহিনীর সদস্যরা কর্মরত আছেন তাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অন্য জেলায় বদলির সিদ্ধান্তের উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন-শৃঙ্খলা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার স্বার্থে যেখানে মিশ্রবাহিনী (আদিবাসী-বাঙ্গালির সংমিশ্রণে) গঠনের ওপর বার বার জোর দেয়া হচ্ছে সেখানে চুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক এই সিদ্ধান্ত নি:সন্দেহে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগণের মধ্যে আবার আস্থাহীনতার সঙ্কট তৈরি করবে।

কোন বিধান বলে বেসরকারি কোন সংস্থার নামের সাথে ‘কমিশন’ যুক্ত করা যাবে না সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা সিদ্ধান্তে উল্লেখ করা হয়নি দাবি করে বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে ইতিপূর্বে ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির গণ-তদন্ত কমিশন বা বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস কমিশনসহ বিভিন্ন ধরনের কমিশন গঠিত হলেও সেসব সংস্থাসমূহের নাম পরিবর্তনে বা ‘কমিশন’ শব্দটি বাদ দেয়ার উদ্যোগ কোন মন্ত্রণালয় নেয়নি বলে উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের নাম সংশোধনের নির্দেশনায় কমিশন বিস্ময় প্রকাশ করছে।

আইন-শৃঙ্খলা উন্নয়নের নামে এরকম বৈষম্যমূলক, বর্ণবাদী, জাতিবিদ্বেষী সিদ্ধান্ত পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘আদিবাসীদে’র ওপর চাপিয়ে দেয়ার ফলে সেখানকার পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয় এ নির্দেশনার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের ‘আদিবাসী’সহ বাংলাদেশের সকল নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপরও একটি আঘাত।

বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন এই বৈষম্যমূলক বর্ণবাদী সিদ্ধান্তসমূহ অনতিবিলম্বে প্রত্যাহারের আহবান জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভায় গৃহীত বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্তসমূহ এবং তার ওপর ভিত্তি করে ইস্যুকৃত নির্দেশনাসমূহ অতিসত্তর বাতিল, পার্বত্য ভুমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের বিরোধাত্মক ধারাসমূহের সংশোধনের জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া, এবং কমিশনের নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান কর্তৃক ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ‘আদিবাসীদে’র ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ উপযোগী পরিবেশ সৃষ্ট করা এবং পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করার দাবি জানাচ্ছে।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 − four =

আরও পড়ুন