‘সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের সাথে ১২০টি গোলামীর চুক্তি করেছে’

fec-image

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের সাথে ১২০টি গোলামীর চুক্তি করেছে বলে দাবি বিশিষ্ট নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

শনিবার (২৯ জুন) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে গভর্নেন্স অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ-জিপিআরের উদ্যোগে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অন্তরায় ও করণীয় শীর্ষক সেমিনারে তারা এ কথা বলেন।

বিশিষ্ট নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অবৈধভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকতে ভারতের সাথে ১২০টি গোলামীর চুক্তি করেছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে ভারত লাভবান হচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেশের জনগণের কোনো লাভ হচ্ছে না। সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে একের পর এক ভারতকে সমুদ্র বন্দর করিডোর, স্থল বন্দর করিডোর, নদী বন্দর করিডোর এবং সর্বশেষ রেললাইন করিডোর দিয়েছে। বিনিময়ে গত একযুগে সীমান্তে ভারতের বিএসএফের হাতে ১ হাজার ২৭৬ জন বাংলাদেশী নাগরিক নির্মম হত্যার শিকার হয়েছে। ভারত আমাদের ওপরে পানি আগ্রাসন চালাচ্ছে। নেহেরু ডকট্রিন বাস্তবায়নের জন্য ভারত অবৈধভাবে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়ে বাংলাদেশের আলেম-উলামা থেকে শুরু করে জনগণের ওপরে আগ্রাসন চালাচ্ছে। ভারতের আগ্রাসনের কারণে আজ বাংলাদেশ সার্বভৌমত্ব হারাতে বসেছে, মানুষের ভোটের অধিকার নাই, মানবাধিকার নাই, বাক-স্বাধীনতা নাই, সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নাই। ভারত আমাদের দেশের জনগণের ভোটার অধিকার কেড়ে নিয়ে, একটি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ভারতই ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি করে আজকে বাংলাদেশের অবস্থা তৈরি করে। স্বৈরাচারী আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদেরকে ভারতের আগ্রাসনে বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্টার ইকতেদার আহমেদের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুর রব, দৈনিক নয়া দিগন্ত সম্পাদক আলমগীর মহিউদ্দিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জহুরুল আলম, গণধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ও কর্নেল (অব.) মিয়া মশিউজ্জামান, এম মোজাহেরুল হক, মেজর অবসরপ্রাপ্ত মোহাম্মদ ইমরান, মেজর অবসরপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গণি চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন-ডিইউজের সভাপতি মো: শহিদুল ইসলাম, কর্নেল (অব.) আবু ইউসূফ যোবায়ের উল্যাহ, লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) দিদারুল আলম, লেফট্যানেন্ট কর্নেল (অব.) নাজমুল ইসলাম, মেজর (অব.) মো: ইমরান, পাক্ষিক পার্বত্যনিউজের সম্পাদক ও সিএইচটি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মেহেদী হাসান পলাশ, মানবাধিকারকর্মী নুরুল হুদা মিলু, আরিফুল ইসলাম, অ্যাডভোকেট তারেক আব্দুল্লাহ, সাইফুল ইসলাম মির্জা, কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত নাজিবুল ইসলাম প্রমুখ।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক পিএসসি। কোরআন তেলোয়াত করেন কারী মমিনুল ইসলাম।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ বলেন, বাংলাদেশে যেমন অবক্ষয় হয়েছে তেমনি সারাবিশ্বেও অবক্ষয় হয়েছে। এই অবক্ষয় থেকে বুলেট ও ব্যালেটের দ্বন্দ্ব শুরু। এরপর শুরু হয় মাদকের ভয়াবহতা। আজ দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে যড়যন্ত্র চলছে সেভেন সিস্টারে খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে। এই অবস্থা চললে পার্বত্য চট্টগ্রাম আমাদের হাত ছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বে অফ বেঙ্গল ভবিষ্যতে ল্যান্ড হিসেবে প্রকাশ পাবে। ভারতকে যে ট্রানজিট দিয়েছে তাতে আমাদের লাভবান হওয়ার সুযোগ খুব কম। আমাদের দেশে সাগর অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা কম হচ্ছে।

মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাবেক ভিসি অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ আব্দুর রব বলেন, সাংবাদিকরা আজ সত্য বলতে পারছে না, সত্য লিখতে পারছে না। অনেক সাংবাদিক খুন হয়েছে সত্য বলার জন্য। ভারতের ফরেন এক্সচেঞ্জ-এর ইনকামের ক্ষেত্র হিসেবে ৫তম দেশ হচ্ছে বাংলাদেশ। দেশের স্বাধীনতার জন্য আইনের শাসনের জন্য যারা কথা বলছে তাদেরকে গুম-খুনের শিকার হতে হচ্ছে। দেশের আলেমরা আজ জুলুম নির্যাতনের শিকার। আলেমদেরকে ডান্ডা-বেড়ি পরিয়ে কোর্টে নেয়া হচ্ছে। এখনো দেশের লাখ লাখ মানুষ না খেয়ে দিন যাপন করছে। নেপাল থেকে বাংলাদেশের ২২ কিলোমিটার ট্রানজিট করিডোর দিচ্ছে না ভারত, ভুটানের সাথে ৩৫ কিলোমিটারের ট্রানজিট করিডোরও দিচ্ছে না ভারত। অথচ ৮৬১ কিলোমিটার রেল করিডোর ভারত ব্যবহার করবে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতকে সব দিয় দিচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের দেশে ভোটের পার্সেন্টেজ আওয়ামী লীগের ৩৪ শতাংশ, বিএনপির ২৮ শতাংশ, আর জামায়াতের ১২ শতাংশ। ভোটের মাঠে ১২ শতাংশ জামায়াতের ভোট বিএনপির সাথে যোগ হলেই বিএনপি জিতে যায়, এদেশের দেশপ্রেমিক জনগণ জিতে যায়।

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ আবদুল হক পিএসসি প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বলেন, ছাত্র রাজনীতি নামে অপরাজবীতি চালু করে বাংলাদেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আইনের শাসনের নামে দেশের জনগণ আজ নিষ্পেষিত অবহেলিত লাঞ্চিত। দেশে আজ আইনের শাসনের কোনো জবাবদিহিতা নেই, জনগণের ভোটাধিকার নাই। জনগণের আজ বাক স্বাধীনতা নেই, মৌলিক অধিকার নাই। আজ দেশে আইনের শাসনের অভাব, বাক স্বাধীনতার অভাব। পাঠ্যবইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠায় বাংলাদেশের মানুষের ধর্ম, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক কৃষ্টি সবকিছু বাদ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে মুসলমানদেরকে বলা হচ্ছে যে আমরা বহিরাগত অথচ বাংলাদেশের মুসলমানরাই এদেশের আদি অধিবাসী এবং আদি ভূমিপুত্র।

তিনি আরো বলেন, নেহেরু ডকট্রিন ভারত বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে বাস্তবায়ন শুরু করেছে। উপমহাদেশে ভারত এককভাবে ভারত আধিপত্যবাদী শাসন কায়েম করতে চাই। নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে ও মাদকের কারণে আমাদের যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

মেজর অবসরপ্রাপ্ত মোহাম্মদ ইমরান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ভারত ট্রানজিট দিয়েছে। অথচ ভারত আমাদের পানি ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। যখন আমাদের পানির প্রয়োজন নাই তখন পানি ছেড়ে দিয়ে সারাদেশকে বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে ভারত। ভারতের আগ্রাসন থেকে আমাদের দেশকে রক্ষা করতে হবে।

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, আজকে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পরিবর্তে সামাজিক অনাচার শুরু হয়েছে। স্বাধীনতার পর আমরা কি দেখলাম একদলীয় শাসনের নামে বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে মানুষের অধিকার হরণ। ৭৪-এর বাকশালের মাধ্যমে দুর্ভিক্ষ উপহার দেয়া হলো। শেখ মুজিবের সরকার ব্যাংক লুটপাট এবং রক্ষীবাহিনী করে মানুষ হত্যা দুঃশাসন শুরু করে। ভারতের সাথে রেল চুক্তি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে চুক্তি। আজ অবৈধ সরকার দিল্লির গোলামী করছে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য। ভারত গত ১২ বছরে সীমান্তে ১ হাজার ২৭৬ জন বাংলাদেশের নাগরিককে হত্যা করেছে। সেই ভারতকে আমরা বিশ্বাস করি কিভাবে। ভারত আমাদের দেশের জনগণের ভোটার অধিকার কেড়ে নিয়ে, একটি ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। ভারতই ওয়ান ইলেভেন সৃষ্টি করে আজকে বাংলাদেশের এ অবস্থা তৈরি করেছে। স্বৈরাচারী আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে। আমাদেরকে ভারতের আগ্রাসনে বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।

মেজর অবসরপ্রাপ্ত ব্যারিস্টার সারোয়ার হোসেন বলেন, রাষ্ট্র যে আজকের এই অবস্থায় যাবে তা আমরা ২০০৯ সালে বুঝতে পারি। আমাদের বিভিন্ন বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেয়া হয়েছে। দেশকে রক্ষা করতে হলে বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে হবে। আন্দোলন করে সফল হচ্ছি না বিরোধী দলগুলো ব্যর্থতার কারণে। আজকে দেশের সেনাবাহিনীকে যে অবস্থায় নিয়ে এসেছে তাতে সেনাবাহিনীর মধ্যে সেনা উত্থান হবে না। আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের সাথে ১২০টা চুক্তি হয়েছে ক্ষমতায় টিকে থাকতে।

কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত দিদারুল আলম বলেন, বর্তমান সরকার অবৈধ, তাদের চুক্তিও অবৈধ। আওয়ামী লীগ সরকারকে কে অধিকার দিলো ভারতের সাথে এতগুলো চুক্তি করার। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থেকে টিকে থাকার জন্য ১২০টি চুক্তি করেছে। আমাদের দেশের ভেতর দিয়ে ভারতের রেল যেতে দিব না।

কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত নাজিবুল ইসলাম বলেন, সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নেই, বাক স্বাধীনতা নেই। বর্তমান সরকার জনগণের জন্য নয়, সরকার ভারতের জন্য কাজ করছে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত জহুরুল আলম বলেন, দেশে আজ সঙ্কটাপন্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আজ সঙ্কটাপন্ন। বর্তমান অবৈধ সরকারের পতন ব্যতীত দেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বের রক্ষা করা সম্ভব নয়। মানুষের ভোটের অধিকার মানবঅধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটাতে হবে।

সাংবাদিক মেহেদী হাসান পলাশ বলেন, দেশে আজ হাজার হাজার মতিউর-বেনজীর রয়েছে, তদন্ত করে সব মতিউর ও বেনজীরদের ধরতে হবে। সরকার দেশ থেকে লাখ লাখ হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করছে। উন্নয়ন নামে দেশে লুটপাট চলছে। গত ৫৩ বছরে ভারত সীমান্তে হাজার হাজার বাংলাদেশীকে হত্যা করে।

গণধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা মশিউজ্জামান বলেন, বর্তমান সরকারকে দেশদ্রোহী সরকার। বিজিবি সরকারের কারণে সীমান্তে ভূমিকা রাখতে পারছে না। ভারত বসিয়েছে ক্ষমতায় বর্তমান সরকারকে, আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। তাই ভারত সরকার যা ইচ্ছে করছে। ভারতের তাবেদার সরকারকে পতনের জন্য গণআন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্টার ইকতেদার আহমেদ সভাপতির বক্তব্যে বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৪টি আসনে বিনা ভোটে নির্বাচন হয়েছে। ১৮ সালের নির্বাচন দিনের ভোটার রাতে দেয়া হয়েছে। ২০২২ সালে নির্বাচনের ৯০ শতাংশ জনগণ অংশগ্রহণ করেনি এবং একটি ডামি ডামি খেলার মাধ্যমে নির্বাচন করে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আছে। এই ভোটারবিহীন নির্বাচনের সূত্রপাত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার কারণে হয়েছে। মুন সিনেমা হলে মামলাকে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার মধ্যে ডাইভার্ট করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে ক্ষমতায় আছে। দেশের সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জামায়াতের ভোটের পার্সেন্টিজ বাড়বে। দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে হলে নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কার করতে হবে।

 

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন