সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়- সন্তু লারমা

fec-image

পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়টি হচ্ছে -ভূমি। কিন্তু এই ভূমি বিষয়টি এখনো পার্বত্য তিন জেলা পরিষদে হস্তান্তরিত হয়নি। তাই ভূমি সমস্যা সমাধানে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের বিধিমালা যদি প্রণীতও হয় তারপরও এই কমিশনের মাধ্যমে সেই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে না বলেও অভিযোগ তুলে ধরেন পাহাড়ের এই নেতা।

সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয় বলে অভিযোগ করে তিনি আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। এ দেওয়াল থেকে সামনে এগিয়ে আসার জন্য পাহাড়ের মানুষ উদ্যোগ নিচ্ছে বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন তিনি।

চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিংয়ের দিকে অভিযোগের আঙুল ‍তুলে সন্তু লারমা আলোচনা সভায় বলেন, “এ চুক্তি থেকে তিনি নানা সুবিধা আদায় করেছেন। এখন চুক্তি বাস্তবায়ন হলে তিনি আর কোনো সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারবেন না।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের দাবি জানিয়ে জনসংহতি সমিতির নেতা বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদের হাতে ক্ষমতা ন্যস্ত করতে হবে। আইন, স্বরাষ্ট্র, পার্বত্য চট্টগ্রাম বা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের হাতে শাসনতান্ত্রিক ক্ষমতা ন্যস্ত করা যাবে না।“

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২২ বছর পূর্তিতে সোমবার ধানমন্ডির উইমেন্স ভলেনটারি অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লিউভিএ) মিলনায়তনে ‘জাতীয় নাগরিক উদ্যোগ’ এর আয়োজনে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন হোক জাতীয় অঙ্গীকার’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

জাতীয় নাগরিক উদ্যোগের অন্যতম সদস্য অধ্যাপক ড. রোবায়েত ফেরদৌসের পরিচালনায় উক্ত আলোচনা সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য সঞ্জীব দ্রং বলেন, আমরা যখন চুক্তির বর্ষপূর্তি পালন করছি আমাদের আজ আনন্দিত মনে উৎসবের সাথে পালন করবার কথা। কিন্তু সেই চুক্তির বর্ষপূর্তি আজ বেদনার আর ক্ষোভের। পাহাড়ের মানুষ আজ হাহাকার দৈন্যদশার মধ্যে দিনাতিপাত করছে বলেও তাঁর অভিযোগ।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেন, তিনি বলেছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তির ৭২টি ধারার মধ্যে ৪৮টি বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে দাবি করে আসছে সরকার। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বলছে ২৪টি ধারা বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। “কী কারণে দুই তথ্যের এমন তফাৎ? কী কী সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া যায়, মন্ত্রণালয় তা ভেবেছে? যদি চুক্তি বাস্তবায়ন করতে না পারল, তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজন কী? সাধারণ জনগণ হিসেবে এ প্রশ্ন করতে পারি।”

অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান আরও বলেন, চুক্তি বাস্তবায়নের থেকে চুক্তি করা কখনও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না। ভূমির ওপর অধিকার সবচেয়ে বড় অধিকার। সেই অধিকারই যদি বাস্তবায়ন না করা হয় তাহলে বাকি ৪৮টা শর্ত পূরণ করায় কিছু এসে যাবে না। ভূমির প্রতি অধিকার নিশ্চিত হলেই বাকিগুলো হয়ে যাবে। এই চুক্তি মেনে না নিয়ে চুক্তির প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানো হয়েছে৷

সভাপতির বক্তব্যে বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, শান্তিচুক্তির ১৮ বছর পূর্তিতে সরকার বিভিন্ন কাগজে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। ক্রোড়পত্র প্রকাশ মানেই বিশেষ দিন। কিন্তু আদিবাসীদের জন্য বিশেষ না হয়ে এ দিন বিষাদের দিনে পরিণত হয়েছে। কারণ এ দিনে ‘শান্তিচুক্তি’ নামের যে চুক্তি হয়েছে তার মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয়নি। যদি চুক্তির উল্লেখযোগ্য বিষয়গগুলো বাস্তবায়িত হতো, তাহলে এদিনে পার্বত্য চট্টগ্রামবাসী আনন্দ করতেন। তা না করে আজ চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তারা।

তিনি বলেন, ক্রোড়পত্রে সরকার তাদের অর্জন বললেও এ অর্জন সেদিন হবে যেদিন এর মূল বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হবে। বলা হয়েছে, কয়েকটি ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। মূলত এগুলো গৌণ ধারা।

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবীর বলেন, এদেশের মানুষের মৌলিক পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক । আমরা যদি বাংলাদেশের নাগরিক যদি হয়ে থাকি তাহলে হিন্দু-মুসলিম,পাহাড়ি-বাঙালি হিসেবে বিভিন্ন পরিচয়ে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমাদের ট্রিটমেন্ট করা যাবে না। রাষ্ট্রকে ভালো রাখার জন্য, সক্রিয় হওয়া আমাদের সকল মানুষের দায়িত্ব। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে কিন্তু দেশটা সবার হয় নাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা রাজনৈতিক সমস্যা, এটা মিলিটারি দিয়ে সমাধান করা যাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীণ কণা তাঁর বক্তব্যে বলেন, পাহাড়ে কোনো সহিংসতা ঘটলে দুটো জায়গাকে টার্গেট করা হয়। একটা পাহাড়ের নারী আর অপারটি ভূমি। এই আধিপত্যবাদী মননই পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের পথে মূল অন্তরায় বলে দাবী করেন তিনি।

কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ছিল রাষ্ট্রের সংগে জনগণের চুক্তি। কিন্তু এই চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়াটা এক ধরণের বঞ্চনা। এই চুক্তি যদি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে তাদের আবার অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়া ব্যতীত আর কোনো জায়গা থাকবে না। এই চুক্তি বাস্তবায়ন করতে না পারার দায় অবশ্যই সরকারকে নিতে হবে বলেও জানান তিনি।

এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী শামসুল হুদা বলেন, প্রায়শই একটি মহল থেকে বলা হয় ২২ বছর ধরে চুক্তির যা বাস্তবায়ন হওয়ার কথা সেটা হয়ে গেছে। এখন সরকার যা করবে সেটাই হবে। এটা কখনো যৌক্তিক হতে পারে না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

অধ্যাপক মেসবাহ কামাল তাঁর বক্তব্যে বলেন, সরকারে চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্যে কাল ক্ষেপনের কৌশল আছে। এই কালক্ষেপন করা উচিত নয়। তিনি আরো বলেন, এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য একটা সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরী করা উচিত ছিল কিন্তু সরকার তা না করে কৌশল হিসেবে নানা ধরনের দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।

এছাড়া উক্ত অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. খাইরুল চৌধুরী, বাংলাদেশ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি নূর মোহাম্মদ তালুকদার, বিশিষ্ট সাংবাদিক নুরুল কবির সহ দেশের বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার প্রগতিশীল ব্যাক্তিবর্গ।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + 7 =

আরও পড়ুন