জেলেদের মাঝে আতংক!

সাগরে মাছ ধরা বন্ধ ৬৫ দিন

fec-image

সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের উন্নয়নে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই পর্যন্ত মোট ৬৫ দিন বঙ্গোপসাগরে বন্ধ থাকবে সব ধরনের মাছ ধরা। বাণিজ্যিক ট্রলারের পাশাপাশি সব ধরনের নৌযানের ক্ষেত্রে এ নিষেধাজ্ঞা প্রযোজ্য হবে। ৬৫ দিনের এ নিষেধাজ্ঞাকে ‘মাছ আহরণের ছুটি’ হিসেব ভাবতে মৎস্যজীবীদের প্রতি আহ্বান সরকারের।

মহেশখালী মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার প্রায় ২০ হাজারের অধিক জেলে থাকলেও তাদের কাছে নিবন্ধন কৃতদের সংখ্যা মাত্র ১১ হাজার ৪শ’ ৪২জন। প্রতি বছর মাছ ধরা বন্ধ ঘোষণা করার প্রায় শেষের দিকে জেলেদের জন্য অপ্রতুল্য বরাদ্ধ দেয় সরকার। যা সকল জেলেদের মাঝে বিতরণে হিমশিম খেতে হয় সংশ্লিষ্ট দফতরকে।

উপজেলার কুতুবজোমের জনসংখ্যার মধ্যে সিংহ ভাগ জেলে। এ ইউনিয়নসহ উপজেলার প্রতিটি জেলেদের দ্রুত পুর্নবাসন করা না হলে সমাজের চরম অশান্তিসহ আইন শৃঙ্খলার অবনতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

কুতুবজোমের ইউপি চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন খোকন জানান, আমার ইউনিয়নের প্রায় মানুষ জেলে তারা দুই মাস বেকার বসে থাকলে তাদের সংসার চালাতে খুব সমস্যায় পড়বে, তাদের দীর্ঘ মেয়াদী পুর্নবাসন করা না গেলে এলাকায় আইন শৃঙ্খলা অবনতি হতে পারে।

মহেশখালী মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম জানান, নিবন্ধনকৃত জেলেদের জন্য সরকারের কাছে বরাদ্দের আবেদন পাঠানো হয়েছে আমাদের কাছে আসা মাত্র জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হবে।

স্থানীয়দের জানায়, একজন জেলে সারা বছর ফিশিং ট্রলারের জেলের কাজ করে কোন মতে সংসার চালায় এতে প্রতি বছর বছর প্রায় দূর্ঘটনার শিকার হয়। যেমন জলদস্যুতা, প্রাকৃতিক ঘূণিঝড়সহ নানা সমস্যা পড়ে তারা আর ঘুরে দাড়াতে পারে না। তার মধ্যে সরকারের এমন ঘোষণা এক টানা দুই মাস সাগরে মাছ ধরা বন্ধ? কি খাবে তারা? কি ভাবে সংসার চালাবে তারা? সামনে ঈদের খরচ সব মিলে এই প্রশ্নের উত্তর কারও কাছে জানা নেই। এই সমস্যা নিয়ে চরম আতংকে রয়েছে মহেশখালীর ২০ হাজার জেলে।

মহেশখালীর সচেতন মহলের অভিমত, যে জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, ঝড়-তুফান ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সমুদ্রে মাছ ধরে দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের আমিষের যোগান, সেই জেলেদের জীবন কীভাবে কাটে, সেটি আমাদের নীতি-নির্ধারকেরা খুব গুরুত্বের সঙ্গে ভাবেন বলে মনে হয় না। সমুদ্রগামী জেলেদের জীবনের দুরাবস্থার কথা উঠে এসেছে বিভিন্ন  সেমিনারে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৪–৫ গুণ বাড়লেও জেলেদের জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি। সামগ্রিকভাবে জেলেরা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যাঁরা সমুদ্রে মাছ ধরে তাঁদের অবস্থা আরও শোচনীয়। অনেকের স্থায়ী ঘরবাড়িও নেই। কোনোভাবে অন্যের জায়গায় মাথা গোজার ঠাঁই করে নেন। উপকূলীয় জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি দেখতে হবে সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের নীরিখে।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেশি। সেখানে বছরের দীর্ঘ একটি সময় মানুষের কাজ থাকে না। কুতুবজোমের এক জেলে আক্ষেপ করে বলেছেন, আমাদের জীবনটাই অভিশপ্ত।’এ অবস্থা থেকে উপকূলীয় জেলেদের বের করে আনতে প্রয়োজন টেকসই কর্মসূচি।

প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে সমুদ্রগামী জেলেদের জীবনের নিরাপত্তা নেই। প্রায় জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হয়ে নৌকা, জালসহ সহায়-সম্পদ হারান। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জীবনহানীর ঘটনাও ঘটে। কিন্তু বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তার দায়িত্ব কোস্টগার্ডের। প্রতিবছর তাদের পেছনে বরাদ্দও বাড়ছে। কিন্তু জলদস্যুদের উৎপাত কমছে না। এটি খুবই উদ্বেগজনক। দ্বিতীয় সমস্যা হলো এসব জেলেকে বছরের একটা বড় সময় বেকার বসে থাকতে হয়। কিন্তু এ সময়ে তাঁদের সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না। ফলে মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তাঁদের জীবন বাঁচাতে হয়। তাই অনেক সময় তাঁরা কম দামে মাছ আগাম বিক্রি করে দেন।

সমুদ্রগামী জেলে তো বটেই, সব মৎস্যজীবীর জীবনমান উন্নয়নে শুধু খাদ্য সহায়তা নয়, আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। জেলেরা যাতে মহাজনদের ঋণচক্রে আবদ্ধ না থাকেন, সে জন্য তাঁদের আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করতে হবে। উপকূলের অনেক স্থানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অভিভাবকেরা সন্তানদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করতে পারেন না। এ বিষয়েও সরকারের দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অভিজ্ঞজনরা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen − 5 =

আরও পড়ুন