সাত কোটি বছর পূর্বে পঞ্চগড় ছিল টেথিস নামক একটি অগভীর সমুদ্র

বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বিশেষ প্রবন্ধ: এতে বোঝা যাবে বাংলাদেশের ইতিহাস ও আদিবাস

1412470_1420312574867103_1279869487_o

ডেস্ক নিউজ:

প্রায় সাত কোটি বছর পূর্বে পঞ্চগড় জন পদসহ হিমালয় পর্বত মালার বিস্তৃত অঞ্চল ছিল টেথিস নামক একটি অগভীর সমুদ্র। এই সমুদ্রের দুই পাশ থেকে গন্ডোয়ানা ও লরেশিয়া নামক দুটি মহাদেশ বা প্লেট পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে। দু’পাশের প্রচন্ড চাপে’ টেথিস সাগরের বুকে জমা পলি থেকে প্রায় ২ কোটি বছর পূর্বে ‘মায়োসিন’ যুগে বর্তমান হিমালয় পর্বত উথিত হয়। চিরকালের জন্য হারিয়ে যায় একটি সমুদ্র টেথিস।

পঞ্চগড় অঞ্চল হিমালয় উপ-অগ্রবর্তী গহবরের অংশ বিশেষ। পঞ্চগড় ভূ-অভ্যন্তর টারশিয়ারী যুগের (আনুমানিক ১ কোটি ৬০ লক্ষ বছর পূর্বের) ভিত শিলা ও বিদ্যমান। এই ভিত শিলার উপর সর্বনিম্ন প্রায় ১৩০ মিটার শুরু পাললিক শিলাস্তার রয়েছে যা পঞ্চগড় এলাকায় বেশ উচু এবং দেিণ ক্রমশ ঢালু। এ অঞ্চলের প্রায় ক্যাম্বিয়া উন্নত সমতল স্থান। রুহিয়া পার্শ্বদেশ (জটঐওঅ ঋখঅঙক). রংপুর স্যাড্ল ইত্যাদি শ্রেণী ভুক্ত করা হয়েছে। পঞ্চগড় এই পাদদেশীয় সমতল ভূমিতে অবস্থিত। এই ভূ-খন্ডের পলি মাটির বয়স আনুমানিক ১০ থেকে বিশ-হাজার বছর। যার প্রমান রয়েছে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের রক্স মিউজিয়ামে। আসলে দেখতে পাবেন হাজার বছর আগের দুইটি নৌকা এই নৌকা দুইটি পঞ্চগড়ের চাওয়াই ও করতোয়া নদী থেকে পাওয়া।

ধারনা এর বয়স প্রায় তিন হাজার বছর, ছোটটি ২৫ ফিট লম্বা, বড়টি ৩২ ফুট ৬ ইনচি লম্বা, গোটা গাছ খনন করে এই দুইটি নৌকা বানিয়ে ছিল। এই ধরনের নৌকা প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপুঞ্জে প্রাচীন কালের আদীবাসিরা ব্যবহার করতো। সম্ভবত উত্তরের পাহাড়ী অঞ্চলে আদীবাসীরা এই নৌকা চালাতো অথবা যুদ্ধের নৌকা হিসেবে এই দুইটি ব্যবহিত হতো। এই মিউজিয়ামে রয়েছে আদীকালের কয়েক হাজার বছর আগের নামি-দামি পাথর, আদীকালে ব্যবহিত আসবাপত্র, যুদ্ধ সরজাম, আদীকালের মুদ্রা, বিভিন্ন শ্রেণীর মুর্তি, আদীকালের ব্যবহিত আনেক জানা-অজানা মুল্যবান সব রত্ন। এই মিউজিয়াম দেখলে হয়তো অনেকেরই অজানা অনেক হাজার বছর আগের তথ্য জানতে পারবেন।

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীন দূর্গনগরী

003-244x300

বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রাচীন দূর্গনগরী পঞ্চগড়ের ভিতরগড়। প্রায় দেড় হাজার বছর আগের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বুকে ধারণ করে কালের সাক্ষি হয়ে আজও বসে আছে ভিতরগড় প্রত্নস্থল । পঞ্চগড় জেলা শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভিতরগড়ের অবস্থান ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে,ভিতরগড় দূর্গনগরী বাংলাদেশে এযাবৎ প্রাপ্ত প্রাচীন দুর্গ-নগরীগুলির মধ্যে সর্ববৃহৎ। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অনুমোদনে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের অধ্যাপক ড. শাহনাজ হুসনে জাহান ভিতরগড় দূর্গনগরীতে প্রত্নতাত্ত্বিক সমীক্ষা ও উৎখননের মাধ্যমে আবিষ্কৃত হয়েছে ৬ষ্ঠ শতকে নির্মিত নয়টি স্থাপত্যিক কাঠামোর নিম্নাংশ এবং মাটি ও ইট দ্বারা নির্মিত অভ্যন্তরীণ চারটি আবেষ্টনীর প্রকৃত স্বরূপ। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে একটি ক্রুশাকৃতির মন্দির এবং পূর্ব ও পশ্চিমে স্তম্ভবিশিষ্ট বারান্দা সম্বলিত একটি স্তুপ বা মন্দির। এখানে রয়েছে তালমা নদীর প্রাচীন প্রবাহের (বর্তমান শালমারা নদী) উপর পাথর নির্মিত তিনটি বাঁধের মতান্তরে

প্রস্তরে সেতুর ধ্বংসাবশেষ। ভিতরগড় দুর্গনগরীর অভ্যন্তরে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন দশটি দীঘি। তন্মধ্যে বিশালাকার মহারাজার দীঘির ৫৩ একর জমির উপর অবস্থিত, এর সুউচ্চ পাড়সমূহ ইট ও মাটি দ্বারা নির্মিত। পূর্ব ও পশ্চিম পাশে ৩টি করে মোট দশটি ইট বাঁধানো ঘাট রয়েছে। ড. শাহনাজ আশা করছেন, খুব শীঘ্রই ভিতরগড় প্রত্নস্থলের পূর্ণাবয়ব বের করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, নির্মাণ পদ্ধতি দেখে এগুলোকে গুপ্ত যুগের পরে ধ্বংসাবশেষ। ভিতরগড় দুর্গনগরীর অভ্যন্তরে আবি®কৃত হয়েছে প্রাচীন দশটি দীঘি। তন্মধ্যে বিশালাকার সপ্তম শতক বা প্রায় দেড়হাজার বছর আগের তৈরি বলে অনুমান করা যায়। এছাড়া এসব স্থাপনা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বলেও আমাদের ধারণা। ২০০৭ সালে পঞ্চগড়ের ভিতরগড় এলাকায় তিনি প্রথম প্রত্নতত্ত্ব জরিপ করেন। ২০০৮ সাল থেকে কয়েক দফা খনন কাজ করেন। সবশেষে তাঁর প্রতিষ্ঠানের ৮৮ জন শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় আবারো খনন করে ওই স্তুপ ও মন্দিরের পুরো অবয়ব আবিষ্কার করেন।

ভিতরগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের ফলে প্রাপ্ত নিদর্শন সমূহের আলোকে প্রত্নতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. শাহনাজ বলেন, “ষষ্ঠ থেকে সপ্তম-শতকে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং প্রাচীন বাণিজ্য সড়ক ও নদীপথের উপর অবস্থিত হওয়ায় ভিতরগড়ের অধিবাসীদের সাথে নেপাল, ভুটান, সিকিম, আসাম, কোচবিহার, তিব্বত, চীন, বিহার এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ বজায় ছিল।”

স্থানীয় জনশ্র“তি মতে, ভিতরগড় ছিল পৃত্থু রাজার রাজধানী। মূলত ভিতরগড় ছিল একটি দূর্গনগরী। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় ২৫ বর্গ কি,মি জায়গাজুড়ে এই দূর্গনগরী অবস্থান। অনেকেই অনুমান করেন, এই দূর্গনগরীটি ছিল মূলত রাজ্যের সুরীত রাজধানী। পার্শ্ববর্তী ভুটিয়া বা তিব্বতীয় দুর্ধর্ষ পাহাড়ি রাজাদের আক্রমণ থেকে রার জন্য সুরীত নগরী। দুর্গনগরী মূলতঃ চারটি আবেষ্টনীর সমন্বয়ে গঠিত। এই আবেষ্টনীগুলি কোনটি ইট আবার কোনটি মাটি দ্বারা গঠিত। একটি অপরটির ভিতরে অবস্থিত এবং প্রতিটি আবেষ্টনীই আবার বাইরের দিকে পরিক্ষা দ্বারা পরিবেষ্টিত। প্রাচীন এই দুর্গনগরীর চারটি আবেষ্টনী দেয়ালের অভ্যন্তরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন অসংখ্য স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষ এবং মূল্যবান প্রত্নতত্ত্ব। প্রত্নতত্ত্বের এক বিশাল ভাণ্ডার হওয়া সত্ত্বেও সরকারিভাবে ভিতরগড় প্রত্নস্থলকে এখনও পুরাকীর্তি আইনের আওতায় গেজেট করা হয় নি।

মহামান্য হাইকোর্ট একটি মানবাধিকার সংগঠনের আবেদনের প্রেতে দুর্গনগরীর ২৫বর্গ কি,মি এলাকায় সব ধরণের নির্মাণকাজ বন্ধ ও যেকোনো প্রত্নসম্পদের ধ্বংসাত্মক কার্যক্রমের উপর ছয় মাসের জন্য নজরদারি রাখতে স্থানীয় প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রত্নতত্ববিদ ড. শাহনাজ হুসনে জাহান এবং সচেতন জনসাধারণ ভিতরগড়কে অতিসত্বর হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা দেবার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানান।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two × four =

আরও পড়ুন