সিনহা হত্যার এক বছর: অভিযোগপত্র দিলেও থমকে আছে বিচার কার্যক্রম

fec-image

সাক্ষ্যগ্রহণে থেমে আছে মেজর (অব.) সিনহা মো. রাশেদ খান হত্যার বিচারকাজ। দৃশ্যমান, সন্তুষজনক অগ্রগতি নেই। এরই মধ্যে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডর এক বছর পূর্ণ হলো আজ।

মামলার অভিযোগপত্র অনুযায়ী, সিনহাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর দ্রুত তদন্ত শেষে অভিযোগপত্র দিলেও করোনায় থমকে গেছে বিচার কার্যক্রম। পরিবারের আশা—দ্রুত এ মামলার বিচার শেষে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া হবে।

এ বিষয়ে সিনহা মুহাম্মদ রাশেদ খানের বড় বোন ও মামলার বাদী শারমিন শাহরিয়ার বলেন, ‘দ্রুত সময়ে মামলার অভিযোগপত্র দেওয়ায় বিচার নিয়ে আশাবাদী হয়েছি। কিন্তু, লকডাউনে মামলার বিচার কার্যক্রম বন্ধ  রয়েছে। এখন ভয় কাজ করে—৮৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া যাবে কি না। কারণ, সাক্ষীদের সব সময় পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। তবু আমরা আশাবাদী—দ্রুত সময়ে সাক্ষ্য নিয়ে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।’

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর ফরিদুল আলম বলেন,  ‘গত ২৭ জুন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। এরপর ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই একটানা তিন দিন বাদীসহ ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের দিন নির্ধারণ করেন। কিন্তু, করোনার কারণে লকডাউনে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণ হচ্ছে না। এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের পরবর্তী নতুন দিন ধার্য করা হবে।’

জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বেঞ্চ সহকারী (পেশকার) সন্তোষ বড়ুয়া জানান, লকডাউনের পরে আদালতের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হলে জেলা ও দায়রা জজ নতুন করে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ দেবেন। ওই তারিখে বাদীসহ সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করবেন আদালত।

২০২০ সালের ৩১ জুলাই রাতে কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়ায় গুলিতে নিহত হন সিনহা। এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় গত ২৬, ২৭ ও ২৮ জুলাই বাদীপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু কঠোর লকডাউনের কারণে আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় সাক্ষ্যগ্রহণে থেমে আছে বিচারকাজ।

সিনহা হত্যার দুই দিন পর চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (উন্নয়ন) মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করেছিল চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ। কমিটি সরেজমিনে তদন্ত করে ঘটনার কারণ ও উৎস অনুসন্ধানের প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সুপারিশসহ জমা দেয়।

হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিনের মাথায় সিনহার বড় বোন শারমিন শাহরিয়া ফেরদৌস বাদী হয়ে বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের বরখাস্ত হওয়া সাবেক পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ নয় জনকে আসামি করে কক্সবাজার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হত্যা মামলা করেন। মামলার পরদিন ৬ আগস্ট প্রধান আসামি লিয়াকত আলী ও প্রদীপ কুমার দাশসহ সাত পুলিশ সদস্য আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

প্রথমে মামলাটি র‌্যাব-১৫ এর সহকারী পুলিশ সুপার জামিল আহমদকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে তার পরিবর্তে র‍্যাব-১৫ এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মো. খায়রুল ইসলামকে তদন্তের দায়িত্ব দেন আদালত।

হত্যায় সংশ্লিষ্টতা পেয়ে পুলিশের করা মামলার তিন সাক্ষী এবং শামলাপুর চেকপোস্টে দায়িত্বরত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে মামলার আরেক আসামি টেকনাফ থানা পুলিশের সাবেক সদস্য কনস্টেবল রুবেল শর্মাকেও গ্রেফতার করা হয়। পর্যায়ক্রমে আদালত আসামিদের কারাগারে পাঠানোর পর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খায়রুল ইসলাম তাদের রিমান্ডে নেন।

রিমান্ডের আসামিদের স্বীকারোক্তিতে আরও চার আসামিকে মামলায় যুক্ত করা হয়। এরপর ১৪ আসামিকে র‌্যাবের তদন্ত কর্মকর্তা বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এদের মধ্যে ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও কনস্টেবল রুবেল শর্মা ছাড়া ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

চার মাস তদন্ত শেষে ১৩ ডিসেম্বর ওসি প্রদীপ কুমার দাশসহ ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে পরিকল্পিত ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

২০২১ সালের ২৪ জুন আত্মসমর্পণ করেন এই মামলার একমাত্র পলাতক আসামি কনস্টেবল সাগর দেব। চলতি বছরের ২৭ জুন মামলায় অভিযুক্ত ওসি প্রদীপসহ ১৫ আসামির বিরুদ্ধে চার্জ গঠনপূর্বক সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন আদালত।

মামলায় কারাগারে থাকা ১৫ আসামি হলো- বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, এসআই নন্দ দুলাল রক্ষিত, এএসআই লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুল করিম, সাগর দেব, রুবেল শর্মা, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব, মো. আবদুল্লাহ এবং সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের শামলাপুর মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন।

চলতি বছরের ২৭ জুন সব আসামির উপস্থিতিতে মামলার অভিযোগ গঠন করেন কক্সবাজারের জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ ইসমাইল। এর আগে মামলা তদন্তকালীন সময়ে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ও কনস্টেবলসহ এক হাজার ৫০৫ পুলিশকে বদলি করা হয়।

মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র:

সিনহা হত্যা মামলার পর তদন্তের দায়িত্ব পায় র‍্যাব। তারা স্থানীয় তিনজন, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) তিন সদস্য এবং প্রদীপের দেহরক্ষীসহ মোট ১৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। একজন আত্মসমর্পণ করে। এ ঘটনায় চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা তদন্ত শেষে গত বছরের ১৩ ডিসেম্বর কক্সবাজার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে র‍্যাব। অভিযোগপত্রে ১৫ জনকে আসামি করা হয় এবং অভিযোগপত্রে সিনহা হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘পরিকল্পিত ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগপত্রে ৮৩ জনকে সাক্ষী করেন তদন্ত কর্মকর্তা ও র‍্যাব ১৫-এর সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খায়রুল ইসলাম।

কারাগারে থাকা অন্য ১৫ আসামি হলেন—বাহারছড়া পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন পরিদর্শক লিয়াকত আলী, টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, দেহরক্ষী কনস্টেবল রুবেল শর্মা, টেকনাফ থানার এসআই নন্দদুলাল রক্ষিত, কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন, আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সাগর দেব, এএসআই লিটন মিয়া, এপিবিএনের এসআই মো. শাহজাহান, কনস্টেবল মো. রাজীব ও মো. আবদুল্লাহ, পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া গ্রামের নুরুল আমিন, মো. নিজামুদ্দিন ও আয়াজ উদ্দিন। অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের মধ্যে বরখাস্ত ওসি প্রদীপ, কনস্টেবল সাগর দেব ও রুবেল শর্মা ছাড়া ১২ জন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এ ছাড়া এ ঘটনার সময় মেজর সিনহার সঙ্গে থাকা সিফাতকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা যে নীলিমা বিচ রিসোর্টে ছিলেন, সেখানে অভিযান চালিয়ে পুলিশ শিপ্রা দেবনাথ ও তাহসিন রিফাত নূরকে আটক করে। পরে তাহসিন রিফাত নূরকে অভিভাবকের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়।

শিপ্রা দেবনাথকে রামু থানায় করা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। আর, সিফাতকে টেকনাফ থানায় করা হত্যা ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার দুটি মামলা ও রামু থানায় করা মাদকের মামলায় গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। সিফাত, শিপ্রা ও তাহসিন বেসরকারি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। তাঁদের নিয়ে সিনহা মুহাম্মদ রাশেদ খান একটি ইউটিউব চ্যানেলের জন্য কক্সবাজারে প্রামাণ্যচিত্র তৈরির কাজ করছিলেন।

পরবর্তীকালে, গত বছরের ৯ আগস্ট শিপ্রা ও ১০ আগস্ট সিফাতের জামিন মঞ্জুর করেন কক্সবাজারের আদালত। পরে তাঁরা জামিনে মুক্তি পান। পরে ১৩ ডিসেম্বর এই দুই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) বিমান চন্দ্র কর্মকার রামু ও টেকনাফ আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়—পুলিশের করা দুই মাদক মামলায় শিপ্রার বিষয়ে অভিযোগের কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি।

এদিকে, সিনহা হত্যা মামলাটি বেআইনি ও অবৈধ দাবি করে ৪ অক্টোবর মামলার প্রধান আসামি লিয়াকতের আইনজীবী মাসুদ সালাহ উদ্দিন কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে একটি মামলা করেন। কিন্তু ওই মামলার বিশেষ কোনও অগ্রগতি এখনও পর্যন্ত দেখা যায়নি।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seventeen + 15 =

আরও পড়ুন