যেন ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি! ১৯৫৬ সাল। মিশরের প্রেসিডেন্ট, আরব জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা, জামাল আব্দুল নাসের তখন ক্ষমতায়। তিনি সুয়েজ খালকে জাতীয়করন করে বৃটিশ জাত্যাভিমানে চরম আঘাত হানেন। তখন পর্যন্ত সুয়েজ খালের অধিকার বৃটিশদের ছিল। বৃটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েল কে সাথে নিয়ে মিশর আক্রমণ করে বসে। ৬টি বিশালাকৃতির এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার নিয়ে তারা লোহিত সাগরের দ্বার প্রান্তে পৌঁছে যায়। মিশরের এয়ার ফোর্সের শত শত যুদ্ধ বিমানকে ভূপাতিত করে যৌথ বাহিনী।
ইসরায়েল মিশরের ট্যাংক বহরকে গুড়িয়ে দেয়। পরাজয়ের কাছাকাছি পৌঁছে যায় মিশর। তখনই ভূ- রাজনীতির পরিত্যক্ত বইয়ের পাতা খুলে পড়েন জামাল আব্দুল নাসের। তার চোখের সামনে ভেসে উঠে সুয়েজ খালের মহাজাগতিক গূরুত্ব। পৃথিবীর ৫টি গুরুত্বপূর্ণ “চোক পয়েন্ট” এর একটি এই সুয়েজ খাল।
জামাল আব্দুল নাসের ডজন খানেক পুরাতন কার্গো জাহাজে পাথর ভরে খালের প্রবেশমুখে তা ডুবিয়ে দিলেন। বৃটিশ ফরাসীর স্পেশাল ফোর্স নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার আগেই তাদের মুখ থেকে জয় ছিনিয়ে নেন।
সুয়েজ খালের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় ভয়ংকর প্রভাব পড়ে বৃটিশ সাম্রাজ্যের অস্তিত্বে। স্বয়ং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আইসেন হাওয়ার বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এন্হনীকে ফোনে ডেকে তার উষ্মা প্রকাশ করেন। কারন বৃটিশদের এই কর্মকাণ্ডের প্রভাব মধ্য প্রাচ্য থেকে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় পড়ে। বৃটিশ পাউন্ড এতটাই দূর্বল হয়ে যায় যে তাকে আইএমএফ এর দ্বারস্থ হতে হয় “বেইল আউট” প্যাকেজের জন্য। সুয়েজ খাল অবরোধের পর বৃটিশ সাম্রাজ্য আর ঘুরে দাঁড়ায়নি।
এবার আসি হরমুজ প্রণালীতে। পৃথিবীর আরেক গুরুত্বপূর্ণ চেক পয়েন্ট। সারা বিশ্বের ৫০% তেল সম্পদের মজুত এই পারস্য উপসাগর ঘিরে। ২০% তেলের সরবরাহ যায় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে। পৃথিবীর সারের চাহিদার ৫০% এই প্রনালী দিয়ে যায়। এলএনজি, পেট্রোলিয়াম প্রডাক্ট এবং জাগতিক জীবনের নানান উপকরণের সরবরাহ এই হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভর করে।
ইরান খুব কার্যকরী ভাবে এই প্রনালীর উপর তার নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে। পারস্য উপসাগর বরাবর সকল এলএনজি সরবরাহ স্হাপনা, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পানি শোধনাগার ইরানের মিসাইল ও ড্রোন আক্রমণের লক্ষ্য বস্তু।
আজ ইরানের আক্রমনের লক্ষ্য হলে উওর গোলার্ধে যে কৃষক বীজ বপন করছে আসন্ন বসন্তে সারের জোগান পাবে না। জিওপলিটিক্সের যে পাঠ বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী নেননি, ডোনাল্ড ট্রাম্পও তাই করছেন। তার ইউরোপে খাদ্য সংকটের কারন যে কৃষকের সার না পাওয়া তিনি সে হিসাব কষেননি।
আমেরিকা শুধু তার এয়ার পাওয়ারের উপর নির্ভর করে ইরান আক্রমণ করে বসে। ইরানের উপর আরো আক্রমণ হলে ইরান মরন কামড় দেবে এই অন্চলের সকল স্হাপনায় আক্রমণের মাধ্যমে যা তার জন্য খুব সহজ।
২০ হাজার ডলারের একটি ড্রোন ৩/৪ মিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক ইন্টারসেপ্টর মিসাইলের সাথে লড়ছে। যা আমেরিকাকে ঋণের জালে জড়িয়ে দিচ্ছে। ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলারের রাষ্ট্রীয় ঋণ নিয়ে আমেরিকা যুদ্ধে আছে। ইরানের কৌশলী পেট্রোডলারের বিপরীতে পেট্রোইয়ানের বানিজ্য আমেরিকার বিশ্ববাণিজ্যের শীর্ষ পদ থেকে সরিয়ে দিবে।
আজ যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শর্তাবলী মেনেই যুদ্ধ বিরতি করতে বাধ্য হবে। আর এখান থেকেই যুক্ত রাষ্ট্রের পতন যাএা শুরু হবে। সুয়েজ খাল হারিয়ে বৃটিশরা বিশ্বের সুপার পাওয়ার মর্যাদা হারায়। হরমুজ প্রণালী হারিয়ে আমেরিকার সে রকমটাই হবে।
জামাল আব্দুল নাসেরের পাথর ভর্তি ডুবন্ত কার্গো জাহাজ সুয়েজ খালের হিসাব বদলে দিয়েছিল। ইরানের ২০ হাজার ডলারের গন উৎপাদনে সক্ষম ( mass production capacity) শাহেদ ড্রোন আমেরিকার গর্ব পেট্রিয়ট বা থাড মিসাইল সিস্টেম কে হরমুজ প্রণালীতে ডুবিয়ে দিচ্ছে। ইরান মাসে দশ হাজার শাহেদ ড্রোন উৎপাদন করতে পারে। তার হাতে দশ হাজার এরকম ড্রোন আছে। আমেরিকার আছে চার হাজার ইন্টারসেপ্টর। বছরে ডজনখানেক ইন্টারসেপ্টর তৈরি করতে পারে। হিসাবটা এখানেই। স্টক শেষ হলে কি হবে। আমেরিকা তাই চায় দ্রুত একটা সমাধান।
কিন্তু ইরানের শর্তাবলী কঠিন:
পুনরায় কোনো আক্রমণ হবে না সে গ্যারান্টি দিতে হবে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সকল বেস তুলে নিতে হবে।
ইরানের উপরা চালানো হামলার আর্থিক ক্ষতি পূরন দিতে হবে।
ইরানের উপর আরোপিত বানিজ্যিক অবরোধ তুলে নিতে হবে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে “ব্লক করা সকল সম্পদ” ছাড় দিতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে তার প্রথাগত কোন মিএকে পাশে পাইনি। তাকে সাহায্যে কেউ এগিয়ে আসেনি। এটা তার “ MAGA“ আতেঁ ঘা দিয়েছে। পাথরভর্তি কার্গো জাহাজ” সুয়েজ অবরোধে” বৃটেনের পতনের সূচনা করেছিলো, ২০ হাজার ডলারের ৬ ফুটি শাহেদ ড্রোন হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের দম্ভকে ডুবিয়ে দিবে না তো?
তথ্য সূত্র: ডেমোক্রেসি ওয়াচ
লেখক : সামরিক বিশ্লেষক।
