সুলাসিয়াতুল বুখারী প্রসঙ্গে

এ, কে, এম, ফজলুর রহমান মুন্শী

সহীহ বুখারী শরীফের ১৬নং সুলাসী হাদিসটি এর ‘কিতাবুর তাফসীর’-এর অন্তপাতি অনুচ্ছেদে ‘হে মুমিনগণ! হত্যার ক্ষেত্রে কিসাস বা খুনের বদলে খুন তোমাদের জন্য ফরজ করা হয়েছে’ সংকলিত হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে মোট তিনটি হাদীস উল্লেখ করা হয়েছে। এর প্রথম হাদীসটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে, দ্বিতীয় হাদিসটি হযরত আনাস (রা.) হতে এবং তৃতীয় হাদিসটিও হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত। অনুচ্ছেদ শিরোনামটি মূলত সূরা বাকারাহ-এর ১৭৮নং আয়াত। অর্থাৎ ‘হে মুমিনগণ! হত্যার কিসাস বা খুনের বদলে খুন তোমাদের জন্য ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীন লোকের বদলে স্বাধীন লোক, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস এবং স্ত্রীলোকের বদলে স্ত্রীলোকেরই কিসাস লওয়া হবে। হ্যাঁ, যদি কোনো হত্যাকারীর সাথে তার (মুসলমান) ভাই ন¤্রতা দেখাতে চায়, তবে উত্তমপন্থায় রক্তপণ পরিশোধ করতে হবে। ইহা তোমার প্রভুর তরফ হতে অনুগ্রহ ও বিন¤্রতা। এর পরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করবে তার জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’
এবার ১৬নং সুলাসী হাদিসটির মূল ভাষ্যের প্রতি লক্ষ্য করা যাক। ইমাম বুখারী (রহ.) বলেন, আমার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ আনসারী। তার কাছে হাদীস বর্ণনা করেছেন হুমাইদ। তিনি বলেন, হযরত আনাস (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট হতে তাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহর কিতাবের নির্দেশ হলো, প্রকৃত পক্ষে কিসাস বা হত্যার বদলে হত্যা।
সূরা বাকারার তফসীরের ২২নং অনুচ্ছেদে কিসাসের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে। মূল বুখারী শরীফের হাদীসের ক্রমানুসারে এই অনুচ্ছেদে সংকলিত তিনটি হাদীসের সংখ্যা হচ্ছে ৪১৪৩, ৪১৪৪ এবং ৪১৪৫। তন্মধ্যে ৪১৪৪নং হাদিসটিই সুলাসিয়াতুল বুখারীর অন্তর্ভুক্ত। ইমাম বুখারি আয়াতে কিসাসের তফসীরে প্রথম হাদিসটি (৪১৪৩) হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, বণী ই¯্রাইলের মধ্যে কেবল কিসাসের বিধান প্রচলিত ছিল। রক্তপণ দেয়ার কোনো নিয়ম-কানুন বা বিধান ছিল  না। তাই এই উম্মতের জন্য আল্লাহ পাক অনুগ্রহ করে এই আয়াত নাজিল করে বললেন : ‘হত্যার ক্ষেত্রে কিসাস বা খুনের বদলে খুন তোমাদের জন্য ফরজ করা হয়েছে। স্বাধীন লোকের বদলে স্বাধীন লোক, ক্রীতদাসের বদলে ক্রীতদাস এবং স্ত্রীলোকের বদলে স্ত্রীলোক কিসাস লওয়া হবে। হ্যাঁ, কোনো হত্যাকারীর সাথে তার কোনো (মুসলমান) ভাই যদি ন¤্রতা দেখাতে চায়, অর্থাৎ রক্তপণ গ্রহণ করতে সম্মত হয়, তবে উত্তম পন্থায় তা যথাযথভাবে পরিশোধ করতে হবে। তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য যা ফরজ করা হয়েছিল, তার তুলনায় ইহা কিছু হালকা বা লঘু ব্যবস্থা আর তোমাদের প্রভুর তরফ হতে অনুগ্রহ। এরপরও অর্থাৎ রক্তপণ গ্রহণ করার পরও যে ব্যক্তি বাড়াবাড়ি করে হত্যা করবে, তার জন্য রয়েছে কঠিন ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’
হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত অপর হাদীসটিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তার ফুফু রুবাইয়ে বিনতে নজর কোনো এক বালিকার সম্মুখের দাঁত ভেঙে দিয়েছিল। রুবাইয়ের কাওমের লোকেরা তাদের নিকট ক্ষমা চাইলে তারা ক্ষমা করতে অস্বীকার করল। তারা অতঃপর আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলে তাও গ্রহণ করতে অস্বীকার করল। এরপর তারা রাসূলুল্লাহ  (সা.)-এর নিকট এলো। কিসাস ছাড়া সব কিছুই প্রত্যাখ্যান করল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) কিসাসের হুকুম দিলেন। এমতাবস্থায় হযরত আনাস ইবনে নজর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তবে কি রুবাইয়ের দাঁতই ভেঙে দেয়া হবে? যিনি আপনাকে সত্য বিধানসহ প্রেরণ করেছেন, তার শপথ! রুবাইয়ের দাঁত ভাঙতে দেয়া যেতে পারে না। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, হে আনাস! আল্লাহর কিতাবের নির্দেশ হলো কিসাস গ্রহণ করা। এরপর বালিকাটির কাওম রাজি হয়ে রুবাইয়েকে ক্ষমা করে দিলে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর কিছু সংখ্যক বান্দা এমন আছেন যারা আল্লাহর নামে শপথ করে কিছু বললে, আল্লাহ তা পূরণ করে দেন। এই বর্ণনা দ্বয়ের আলোকে বোঝা যায় যে, হত্যার বেলায় রক্তপণ আদায় করার বিধান আল্লাহ পাকের এক পরম অনুগ্রহ বিশেষ।
বস্তুত, কোরআনুল কারীমে গভীর মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করলে দেখা যায় যে, মহান আল্লাহ পাক ‘কিসাস’ শব্দটি আল কোরআনের দুটি সূরার চারটি আয়াতে উল্লেখ করেছেন। প্রথম সূরাটি হলো সূরা বাকারাহ। এর ১৭৮, ১৭৯ ও ১৯৪নং আয়াতে ‘কিসাস’ শব্দটি এসেছে। এর মধ্যে ১৭৮নং আয়াতটি আলোচ্য হাদীসের অনুচ্ছেদ শিরোনামে উল্লেখ করা হয়েছে। সূরা বাকারাহ-এর ১৭৯নং আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : ‘হে বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তিগণ! কিসাসের মধ্যে জীবন রয়েছে (অর্থাৎ হত্যা বন্ধ করে জীবনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে) যাতে তোমরা সাবধান হতে পার।’ আর সূরা বাকারাহ-এর ১৯৪নং আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে : ‘পবিত্র মাস পবিত্র মাসের বিনিময়ে। সমস্ত পবিত্র বিষয় যার অবমাননা নিষিদ্ধ তার জন্য কিসাস।’ আর দ্বিতীয় সূরাটি হলোÑ সূরা মায়িদাহ। সূরা মায়িদাহ-এর ৪৫নং আয়াতে ঘোষণা করা হয়েছে, ‘তাদের জন্য এতে বিধান দিয়েছিলাম যে, প্রাণের বদলে প্রাণ, চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক, কানের বদলে কান, দাঁতের বদলে দাঁত এবং জখমের বদলে অনুরূপ জখম। তারপর কেউ তা ক্ষমা করলে এতে তারই পাপ মোচন হবে। আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না, তারাই জালিম।
কিসাস শব্দটির অর্থ, ন্যায্য বদলা বা প্রতিশোধ। এই প্রতিশোধ দু’ধরনের হতে পারে, যথাÑ (১) হত্যার জন্য (কিসাস ফিননাফ্স) জানের বদলা গ্রহণ এবং (২) মারাত্মক নয় এরূপ আঘাতের জন্য (কিসাস ফীমা দুনান্নাফ্স) সজ্ঞানে অন্যায়ভাবে কেউ কাউকে হত্যা করলে বিনিময়ে হত্যাকারীকে হত্যা করার যে বিধান রয়েছে ইসলামি পরিভাষায় তাকেই কিসাস বলে।
কিসাস কার্যকর করার বিধান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যবহারিক কর্মকা-ের দ্বারাও জানা যায়। মদীনা যুগের প্রাথমিক অবস্থায় আন্তঃসাম্প্রদায়িক এই বিধি প্রচলিত ছিল যে, যদি কেউ কোনো বিশ্বাসীকে হত্যা করে এবং হত্যাকারীর দোষ প্রমাণিত হয়, তাহলে কিসাসের ব্যবস্থা কার্যকর হবে যদি না নিহত ব্যক্তির ওয়ালী (কিসাসের দাবিদার) দাবি পরিত্যাগ করে। সকল বিশ্বাসীগণকে হত্যাকারীর বিপক্ষে যেতে হবে এবং তার বিরুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে হবে। মদিনার ইহুদীদের জন্যও বিধান ছিল যে, একটি জখমের জন্য কিসাস গ্রহণ করা হতে যেন কাউকেও বিরত করা না হয়। মুসলিম উম্মার ন্যায়নীতির স্বার্থে কিসাসের একটা সীমারেখা নির্ধারণের প্রয়োজন হয়। যেমন, কোনো মুমিন যেন কোনো অবিশ্বাসীকে হত্যার কারণে কোনো মুসলিমকে হত্যা না করে। মক্কা বিজয়ের পর নবী করীম (সা.) একটি নিয়ম জারি করলেন যে, কোনো খুনি, অপরাধীও ইসলাম গ্রহণ করলে সেই তারিখ হতে তার কুফরকালীন অপরাধ ধর্তব্য হবে না। তবে তিনি কিসাসের ব্যবস্থার কড়াকড়িও করেছিলেন এবং দুইবার হত্যাকারীকে আইনের নির্দেশ অনুসারে মৃত্যুদ- দান করেছিলেন। কারণ অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে উভয় ক্ষেত্রে তিনি প্রতিশোধ গ্রহণকারীকে কিসাসের পরিবর্তে ক্ষতিপূরণ দাবি করার সুযোগ দেননি। একটি সহীহ হাদীস মতে জানা যায় যে, এক ইয়াহুদী একজন মুসলিম ক্রীতদাসীকে প্রস্তরাঘাতে মস্তক চূর্ণ করে হত্যা করলে হযরত মোহাম্মদ (সা.) তাকে ঠিক সেভাবেই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three × 1 =

আরও পড়ুন