স্বাগত ২০২০

fec-image

কালের আবর্তে মহাকালের গর্ভে হারিয়ে গেল আরো একটি বছর। বহু ঘটন-অঘটনের বছর ছিল ২০১৯। ভোরের সূর্যোদয়ের মাধ্যমে আমরা পা রাখতে যাচ্ছি নতুন আরেকটি বর্ষপরিক্রমায়। স্বাগত ২০২০।

স্বপ্ন আর দিনবদলের অপরিমেয় প্রত্যাশার আলোয় উদ্ভাসিত শুভ নববর্ষ। সুপ্রভাত বাংলাদেশ, স্বাগত ২০২০! হ্যাপি নিউইয়ার ২০২০। অভিবাদন নতুন সৌরবর্ষকে। সেই একই সূর্য, একইভাবে উঠছে পূর্বাকাশ আলো করে। তবু তার উদয় ভিন্নতর।

আজকের দিনটিও আলাদা। কারণ একটি নতুন বর্ষপরিক্রমা শুরু হলো আজ বুধবার থেকে। সোনালি স্বপ্নের হাতছানি নিয়ে উদিত হলো নতুন বছরের নতুন সূর্য। ভরা পৌষে কুয়াশার হিমেল চাদর ছিন্ন করে উদ্ভাসিত হলো সোনালি আলোর সকাল। কাল পরিক্রমায় দ্বারোদঘাটন হলো প্রকৃতির নতুন নিয়মে নতুন বছর ২০২০’র।

বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে নতুন ইংরেজি বর্ষ ২০২০-কে স্বাগত জানিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ঘড়ির কাঁটা ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় আতশবাজির ছড়াছড়ি।

আন্তর্জাতিক মান সময়ের তারতম্যের কারণে নতুন বছরকে আগে বরণ করার সুযোগ পাওয়া দেশগুলোর একটি নিউজিল্যান্ড। নতুন বছরের উৎসবে মেতে ওঠার ক্ষেত্রে বড় শহরগুলোর মধ্যে অকল্যান্ডের সুযোগ আসে সবার আগে। ৫০০ কেজির আতশবাজি পুড়িয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাল অকল্যান্ড।

অকল্যান্ডের কেন্দ্রস্থলের এক হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতার স্কাই টাওয়ারে ঝুলন্ত একটি বিশাল ঘড়িতে রাত ১২টা বাজার অপেক্ষায় সেখানে জড়ো হন মানুষ। শুরু হয় কাউন্টডাউন। আর ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে আকাশে দেখা যায় আতশবাজির বর্ণিল ছটা। নিউজিল্যান্ডের পর অস্ট্রেলিয়ায় স্বাগত জানানো হয় নতুন বছরকে।

সিডনি হারবারে আতশবাজি দেখার জন্য জড়ো হয় হাজার হাজার মানুষ। আতশবাজির ঝিলিক আলোয় ফুটে ওঠে অপেরা হাউসের বর্ণিল চিত্র। আর তার পাশে বয়ে চলা সিডিনি হার্বারের গোলাপি পানি দেখে মুগ্ধ হয় সবাই।

রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইংরেজি নববর্ষ উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন। বাণীতে তাঁরা ইংরেজি নতুন বছর উপলক্ষে দেশবাসী, প্রবাসী বাঙালিসহ বিশ্ববাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে ২০২০ সালকে জাতীয় জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর উল্লেখ করে বলেন, এবছর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সাড়ম্বরে উদযাপিত হবে। এ জন্য গোটা দেশবাসী উন্মুখ হয়ে আছে।

সরেজমিনে গতকাল বিকেলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে দেখা গেছে, ডুবে গেল ২০১৯ সালের সূর্য। অনেক প্রাপ্তি, শঙ্কা, হতাশা, ক্লান্তি ও নানা ঘটনা আর উপ-ঘটনায় শেষ হল একটি বছর। বিশেষ করে বিশ্বের আলোচিত ইস্যু ছিল রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আর ইয়াবা ও জলদস্যু আত্মসমর্পন। বছরের শুরু থেকে দেশের পরিস্থিতিতে কিছুটা রাজনীতি উত্তাপ থাকলেও শেষের দিকে ছিল রোহিঙ্গা ইস্যু প্রধান আলোচনায়।

সদ্য বিদায় নেয়া ২০১৯ সালের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ছিল নতুন মন্ত্রিসভা গঠন। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জোট টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। ৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে শপথ গ্রহণ করে ৪৭ সদস্য বিশিষ্ট নতুন মন্ত্রিসভা এবং চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা

বছরজুড়ে দুয়েকটি স্থান ছাড়া স্থানীয় সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিজয় পেয়েছে। নতুন বছরের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঢাকার দুই সিটির নির্বাচন।

দেশের সামগ্রিক আর্থিক অবস্থা ভালো হওয়ায় ২০১৯ সালে প্রবৃদ্ধি ও মাথাপিছু আয় বেড়েছে। বাংলাদেশে মানুষের বার্ষিক মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৯০৯ ডলার। এটি ২০১৮ সালে ছিল ১ হাজার ৭৫১ ডলার। আর এতে জিডিপি প্রবৃদ্ধিও বেড়ে হয়েছে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। যদিও সদ্য বিদায়ী বছরে অর্থনীতির প্রধান প্রধান অধিকাংশই নিম্নমুখী ছিল। নতুন বছরে এই ধারা ইতিবাচক পর্যায়ে নিয়ে আসা সরকারের কাছে একটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে থাকছে।

আবরার, নুসরাত, রিফাতসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ছিল সদ্য বিদায়ী ২০১৯ সালের আলোচিত ঘটনা। এসব ঘটনার অধিকাংশেরই চার্জশিট জমা হয়েছে। কোনোটার রায় হয়েছে। কোনোটি আপিল পর্যায়ে রয়েছে। নতুন বছরে এসব ঘটনার রায় কার্যকরের যথেষ্ঠ সম্ভাবনা রয়েছে।

সদ্য বিদায়ী বছরে প্রাণ ও সম্পদহানিতে অন্যতম ছিল কিছু অগ্নিকাণ্ড। একদিকে যেমন ঘটেছে পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টা ও বনানীর এফআর টাওয়ারের মতো ভয়াবহ আগ্নিকাণ্ড, তেমনি বেড়েছে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা। ফায়ার সার্ভিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে মোট ২২ হাজার ২৮৩টি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। যা গত ২৩ বছরের মধ্যে অগ্নিদুর্ঘটনায় রেকর্ড। এসব ঘটনায় ১৫৪ জন নিহত ও ৩৭৭ জন আহত হয়েছেন। নতুন বছরে এই অগ্নিকাণ্ড প্রতিরোধের চ্যালেঞ্জ থাকছে সরকার এবং সংশ্লিষ্টদের জন্য।

২০১৯ সালের কোরবানির ঈদ হয়তো আলাদাভাবেই মনে রাখবেন মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা। কারণ ২০১৯ সালে কোরবানির পশুর চামড়ার ভয়াবহ দরপতন ঘটে। ২০১৮ সাল থেকে দরপতন শুরু হলেও এমন ধস নিকট অতীতে আর দেখা যায়নি। এবার চামড়ার দাম ছিল স্মরণকালের মধ্যে সর্বনিম্ন। রাজধানীসহ সারা দেশেই সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে চার থেকে পাঁচগুণ কমে চামড়া বিক্রি হয়। আর ছাগল ও ভেড়ার চামড়া তো বিক্রিই হয়নি। দাম না পেয়ে ক্ষোভে অনেক স্থানে চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলেন।

নতুন বছরে কোরবানির আগে থেকেই এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টরা এ বিষয়ে কাজ করবে বলে প্রত্যাশা সবার।

বিদায়ী বছরে বেশকিছু আলোচিত ঘটনার মধ্যে অন্যতম ছিল ছেলেধরা আতঙ্কে গণপিটুনিতে হতাহতের ঘটনা। গত জুলাই মাসের শুরুতে হঠাৎই সারা দেশে গুজব ছড়িয়ে পড়ে- পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজে মানুষের মাথা প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ‘ছেলেধরা’ আতঙ্ক তৈরি হয়। এরপর থেকেই ছেলেধরা সন্দেহে একের পর এক গণপিটুনির খবর আসতে থাকে।

এই গুজব এতটাই ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ে যে, তা ঠেকাতে সেতু কর্তৃপক্ষ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দফায় দফায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। তারপরও ছেলেধরা গুজবে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান অন্তত ৭ জন, আহত হন আরও অর্ধশতাধিক। এর মধ্যে ঢাকার বাড্ডায় গত ২০ জুলাই উন্মত্ত জনতার হামলায় মারা যান নিরীহ গৃহবধূ তাসলিমা বেগম রেণু, যা দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। বছরের শেষ দিকে প্রধান আলোচনায় ছিলো পেঁঁয়াজের মূল্যের উর্দ্ধগতি।

আজ থেকে শুরু হওয়া ২০২০ সালে বাংলাদেশে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হতে যাচ্ছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে একযোগে অনুষ্ঠিত হবে জন্মশতবার্ষিকীর মূল আয়োজন।

বিজ্ঞজনের মতে, ২০১৯ সালের শুরুতেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল আলোচনা-সমালোচনার বছর। এক্ষেত্রে উন্নয়নে পিছিয়ে ছিল না কক্সবাজারও। তবে যাই হোক নতুন করে এই বছরটি কক্সবাজারের মানুষের প্রাপ্তির বছর। ২০১৯ সালে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল মোটামুুটি শান্ত ও সৌহার্দ্যপূর্ণ। ২০১৯ সালে পর্যটনও পেয়েছে এক নতুন মাত্রা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকায় দীর্ঘদিনের লোকসান প্রায় পুষিয়ে উঠেছে পর্যটন ব্যবসায়ীরা। একইভাবে শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, গ্রামীন অবকাঠামোগত মোটামুটি উন্নয়নেও পিছিয়ে ছিলনা কক্সবাজার।

এদিকে ২০১৯ সালের শেষ সূর্যকে বিদায় জানাতে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে মিলিত হয় লাখো মানুষ। তাদের প্রত্যাশা ২০১৯ সালের চেয়ে একটি সমৃদ্ধ কক্সবাজার গঠনে ২০২০ সাল শান্তিপূর্ণ এবং সবার জন্য সুখবর নিয়ে আসে। সেই কামনায়।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

five × five =

আরও পড়ুন