১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন: বিএনপিতে নির্বাচন ও প্রতিহতের প্রস্তুতি, খাগড়াছড়িতে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামীলীগ ছাড়া সব দলে শঙ্কা

Khagrachari Picture 08-09-2013

বিশেষ প্রতিনিধি, পার্বত্যনিউজ:

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার তোড়জোড় শুরু করলেও খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামীলীগ ছাড়া বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচন নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহন ও প্রতিহত দুই প্রস্তুতি নিয়েই এগুচ্ছে। জাতীয় পাটি(এরশাদ) এবং জামায়াতও বলেছে, সুষ্ঠু ও অবাধ-নির্বাচনের গ্যারান্টি না পেলে নির্বাচনে যাবে না। পক্ষান্তরে অপর দুই বৃহৎ আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ  ও জেএসএস(এমএন) গ্রুপ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কথা বলেছেন। তবে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিস্পত্তি হলে এবার খাগড়াছড়ি আসনে নতুন মুখের ছড়াছড়ি হবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। তবে সে ক্ষেত্রে জেলা বিএনপি সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া আবারও দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন এমনটি নিশ্চিত করেছেন দলের একাধিক সূত্র।

খাগড়াছড়ি- নির্বাচনী আসন নং ২৯৮। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৮৫ হাজার। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দীর্ঘ দিন ধরে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তৎপরতা চলছে। সে ক্ষেত্রে বেশ এগিয়ে রয়েছে বিএনপি। সরকার বিরোধী কেন্দ্রীয় কর্মসূচী বাস্তবায়নের পাশাপাশি নির্বাচনের জন্য মাঠ প্রস্তুতির তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মত। জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া গত প্রায় তিন মাস ধরে নিজেকে আসামী দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসাবে ঘোষনা দিয়ে নির্বাচনী প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি টানা ম্যারাথন সভা-সমাবেশের পাশাপাশি দূর্গম পাহাড়ি এলাকায় টেলিকনফারেন্স ও  বিএনপি সমমনা বিভিন্ন উপজাতীয় সংগঠনগুলোর সাথে মতবিনিময় করে আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহবান জানিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাও বসে নেই। তিনি গত প্রায় এক বছর ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষক মহলের মতে, খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপি বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

ওয়াদুদ ভূইয়া ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় এক লাখ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। পরে ওয়াদুদ ভূইয়াকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান করা হয়। তার আমলে  খাগড়াছড়িতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ওয়াদুদ ভূইয়া কারাগারে আটক থাকায় সমীরণ দেওয়ানকে  মনোনয়ন দেওয়া হয়। নির্বাচনে সমীরণ দেওয়ান আওয়ামীলীগ প্রার্থীর প্রায় অর্ধেক ৬২ হাজার ৯শ৭৭ ভোট পেয়ে শোচনীয়ভবে পরাজিত হন। বিষয়টি নাড়া দেয় কেন্দ্রীয় বিএনপি’র নীতি নির্ধারণী মহলকেও। ওয়াদুদ ভূইয়া কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা আবার সু-সংগঠিত  হতে শুরু করে।

২০০৯ সালের ২৫ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপাসর্নের উপদেষ্টা মেজর জেনারেল(অব:) রুহুল আলম চৌধুরীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ওয়াদুদ ভূইয়াকে সভাপতি ও আবু ইউসুফ চৌধুরী সম্পাদক করে খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু  সমীরন দেওয়ানকে সভাপতি ও মো: জয়নাল আবেদীনকে সাধারন সম্পাদক করে পাল্টা কমিটি গঠন করায় ঝুলে যায় খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির কমিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া। অবশেষে দীর্ঘ প্রায় দুই  বছর পর ২০১১ সালের ১৩ ডিসেম্বর ওয়াদুদ-ইউসুফের জমা দেওয়া পূর্নাঙ্গ কমিটি অনুমোদন পায়। অনুমোদিত ওয়াদুদ ভূইয়ার কমিটিতে সমীরন দেওয়ানকে সদস্য হিসেবে রাখা হয়।

বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া আবার দলীয় মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে নিশ্চিত করেছে দলের একাধিক সূত্র। সে হিসেবে খাগড়াছড়ি বিএনপিতে চলছে আন্দোলনের পাশাপশি জোড় নির্বাচনের প্রস্তুতি।
খাগড়াছড়ি জেলা বিএনপির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, খাগড়াছড়ির নির্বাচনী মাঠ পুরোপুরি বিএনপির অনুকুলে। সর্বক্ষেত্রে সরকারের সীমাহীন দূর্নীতি-অনিয়ম ও ব্যর্থতার কারণে খাগড়াছড়িতে আওয়ামীলীগের জনপ্রিয়তা এখন শূণ্যের কোঠায়। যে পাহাড়িরা এক সময় আওয়ামীলীগের ভোট ব্যাংক হিসেবে বিবেচিত হতো তারাও দলে দলে বিএনপিতে যোগ দিচ্ছে। নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে খাগড়াছড়ি আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে আমি বিপুল ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হবো।
তিনি বলেন, বিএনপির চেয়ারপার্সন জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের নির্বাচনের জন্য আন্দোলন করে আসছে। কাজে আওয়ামীলীগ সরকারের অধীনে বিএনপি কোন নির্বাচনে অংশ নিবে না এবং সারা দেশের মতো খাগড়াছড়িতেও আওয়ামীলীগের এক তরফা পাতানো নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য বিএনপির নেতাকর্মীরা প্রস্তুত রয়েছে।

খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামীলীগের নতুন মুখের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরার নাম আলোচিত হচ্ছে। কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা ১৯৮৪ সাল থেকে আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। তিনি ২০০৭ সালে বাতিল হওয়া নির্বাচনেও খাগড়াছড়ি আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু তার মনোনয়নপত্র বাতিল না হলেও পরবর্তীতে ২০০৮ সালের নির্বাচনে অজ্ঞাত কারণে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে মনোনয়নপত্র না দিয়ে যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ নিয়ে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রথমে অভিমান করে নিরব থাকলেও পরে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে বিশাল কর্মী বাহিনী নিয়ে নির্বাচনী প্রচারনায় নামেন এবং নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা ১লাখ ২২ হাজার ৮শ ৩ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। পরে তাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারত প্রত্যাগত শরনার্থী বিষয়ক টাস্কস্ফোসের চেয়ারম্যান করা হয়। কিন্তু তিনি ক্রমেই দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তার প্রমাণ গত ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠিত খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের কাউন্সিল। ঐ কাউন্সিলে  কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী যতীন্দ্র লাল এমপিকে হারিয়ে খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা। সে থেকে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা নিরবে-নিভৃতে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

নির্বাচন নিয়ে কোন শংকা আছে কিনা জানতে চাইলে খাগড়াছড়ি আসনের আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, আওয়ামীলীগ নির্বাচনের দল। কাজে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষনা অনুযায়ী দেশে যথা সময়ে নির্বাচন হবে এবং বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা আমাকে যোগ্য মনে করে খাগড়াছড়ি আসনে মনোনয়ন দিলে আমি আসনটি উপহার দিতে পারবো। এর জন্য খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগগের প্রস্তুতিও রয়েছে।
বিএনপিরসহ বিরোধী দল নির্বাচন বর্জন করলে নির্বাচন কতটুকু গ্রহনযোগ্যতা পাবে এমন প্রশ্নের জবাবে কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, নির্বাচন সকল দলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং বিএনপিসহ সকল দল এই নির্বাচনে অংশ নিবে। তবে গত শুক্রবার(৬ সেপ্টেম্বর) কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সাংগঠনিক সফল উপলক্ষে আয়োজিত কর্মী সমাবেশে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের হামলায় বেশ কয়েক জন যুবলীগ নেতা আহত হওয়ার ঘটনায় খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগে নতুন করে সংকটের জম্ম দিয়েছে। যার প্রভাব পড়বে আসন্ন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমনটি মনে করছেন পর্যবেক্ষক মহল। তবে খাগড়াছড়ি আসনে আগামীতে দশম নির্বাচনে আওয়ামীলীগের কে মনোনয়ন পাচ্ছে তা   পরিস্কার হবে আগামী ১২ অক্টোবর। জানা গেছে, ঐ দিন প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগের প্রতিনিধি সভা হওয়ার কথা রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আলোচিত আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’র(ইউপিডিএফ)  সভাপতি প্রসীত বিকাশ খীসা খাগড়াছড়ি আসনে আবারও প্রার্থী হচ্ছেন বলে শোনা যাচ্ছে। তিনি ২০০১  সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৩৩ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। এর পর দীর্ঘ প্রায় এক যুগ তিনি ছিলেন পর্দার আড়ালে। সম্প্রতি পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রসিত বিকাশ খীসা আবারও প্রকাশ্যে রাজনীতিতে আসেন। এদিকে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উজ্জল স্মৃতি চাকমা ইউপিডিএফ’র প্রার্থী হয়ে ৬০ হাজার ৪শ ১০ ভোট পান। এখন ইউপিডিএফ-এ চলছে দলগোছানোর কাজ।  
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে  প্রার্থী হচ্ছেন এবং বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ইউপিডিএফ’র মিডিয়া সেকশনের প্রধান নিরণ চাকমা বলেন, আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। সময়ই বলে দেবে আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি কিনা।  

পার্বত্য চট্টগ্রাম সংহতি সমিতির(এমএন) গ্রুপের কেন্দ্রীয় সহ-প্রচার প্রশান্ত চাকমা বলেন, আমরা এখনো সিন্ধান্ত নেইনি। নির্বাচনী তফশিল ঘোষনা হলে কংগ্রেসর বৈঠক ডেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
খাগড়াছড়িতে জাতীয় পাটির(এরশাদ) তেমন কোন সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। ১৯৯৭ সালের নির্বাচনে খাগড়াছড়ি জাতীয় পাটির প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র দেড় হাজার। কিন্তু তা সত্বেও  খাগড়াছড়ি আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে কাজ করে যাচ্ছেন চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয় পাটির আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সোলায়মান আলম শেঠ। এ প্রসঙ্গে জাতীয় পাটির খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সাধারন সম্পাদক আলাউদ্দিন সওদাগর বলেন, নির্দলীয় তত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বর্তমান সরকারের অধীনে জাতীয় পাটি কোন নির্বাচনে অংশ নিবে না। পাটির চেয়ারম্যান চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ সময় মতো জোট থেকে বেড়িয়ে আসবেন। সে ক্ষেত্রে খাগড়াছড়ি আসনে জাতীয় পাটির প্রার্থী কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সোলায়মান আলম শেঠ।

খাগড়াছড়ি আসনে জামায়াতে ইসলামীরও তেমন কোন সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। ১৯৯৬ সালে জামাত খাগড়াছড়ি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোট পেয়েছিলেন মাত্র দেড় হাজারের কাছাকাছি। সে থেকে সংগঠনটি খাগড়াছড়িতে সাংগঠনিক কর্মকান্ড চালিয়ে আসলেও ২০১০ সালের পর থেকে সরকারের রোষানলে পড়ে আবারও মাঠ ছাড়া হতে হয় তাদের।
এ প্রসঙ্গে খাগড়াছড়ি জেলা জামাতের আমীর অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, খাগড়াছড়িতে সাংগঠনিক অবস্থা ভালো। আমাদের দাবী কেয়ার টেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন। অন্যথায় আমরা নির্বাচনে যাবো না। আমাদের দাবী মেনে নিলে জামাত সিদ্ধান্ত নিবে, নির্বাচন একক না জোটগত ভাবে হবে। তবে সব কিছুই পরিস্কার হয়ে যাবে অক্টোররের  শেষ দিকে এমনটা জানিয়েছেন, বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতারা।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

3 × 5 =

আরও পড়ুন