৩ পার্বত্য জেলার পাহাড় বিপন্নর পথে

fec-image

আজ ৫ জুন বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বাংলাদেশেও দিবসটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপন করা হয়। জাঁকজমকভাবে দিবসটি পালন করা হলেও পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর কোন ভুমিকা নেই পার্বত্য এলাকায়। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জুমচাষ, কাসাভা, হলুদ, আদা ও কচু চাষের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়গুলোর উর্বরাশক্তি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, নির্বিচারে পাহাড় কাটা এবং ব্যাপক মাটি ক্ষয় ও ধসের কারণে এসব পাহাড় ক্রমশ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে অদূরভবিষ্যতে পার্বত্যাঞ্চলের পাহাড়গুলো বিলীন হয়ে যাবে। মহা বিপর্যয় ঘটতে পারে পার্বত্যঞ্চলের পরিবশের। তাই পাহাড় রক্ষায় এক্ষুনি সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়রা বংশপরশপরা পাহাড়ে জুম চাষ করে আসছে। অবৈজ্ঞানিক ও আদিম পদ্ধতিতে জুম চাষ হয়। অনুসন্ধানে জানাযায়, প্রতিবছর জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি মাসে তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি , বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে পাহাড় বা টিলা বেছে নিয়ে জুম চাষের জন্য বন জঙ্গল কেটে সাফ করে উপজাতীয়রা। মার্চ মাসব্যাপী রোদে শুকানোর পর এপ্রিলে আগুনে পোড়ানো হয় এসব বনজঙ্গল। পরে বৃষ্টি এলে পুরো পাহাড়ের গায়ে গর্ত করে রোপন করা হয় ধান, তুলা, তিল, তামাক, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শাক সবজির বীজ।

মৃত্তিকা বিশেষজ্ঞরা বলেন, প্রচণ্ড তাপদাহের মধ্যে জুম চাষের জন্য পাহাড়গুলো অগ্নিদগ্ধ করায় মাটি শুকিয়ে ইট হয়ে যায়। এতে ছোট বড় পাহাড় টিলাগুলোতে ফাটল সৃষ্টি হয়। ফাটলে বৃষ্টির পানি প্রবাহিত হয়ে ভয়াবহ আকারে পাহাড় ধস শুরু হয়।

ভূমি অবক্ষয় পরিবীক্ষণ সম্পর্কীত টাস্কফোর্সের পরিচালিত এক জরিপ প্রতিবেদনে জানাযায়, বাংলাদেশে পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে প্রায় ১৭ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি ক্ষয়ের মুখে। অপরিকল্পিত চাষাবাদ বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলে জুম চাষকে এ ভূমি ক্ষয়ের কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের আর্থিক সহায়তায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সস্টিটিউট পরিচালিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তিন পার্বত্য জেলায় বছরে প্রতি হেক্টরে ১০০ হতে ১২০মে.টন পর্যন্ত মাটি ক্ষয় হচ্ছে। ওই প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে ভূমি ক্ষয়ের হার বিপজ্জনক মাত্রায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।

বর্ষা মৌসুমে অতিবর্ষণে প্রতি বছর তিন পার্বত্য জেলায় ব্যাপক পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। এতে প্রাণহানিও হয়। এক পরিসংখ্যানে জানাযায়, ২০১৭ সালের ১১ জুন হতে ১৩ জুন চট্টগ্রাম, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও মৌলভীবাজার জেলায় পাহাড় ধসের ঘটনায় ১৬৮ জনের মৃত্যু হয় ।্ তন্মধ্যে রাঙ্গামাটিতেই মারা যায় ১২০ জন। এদিকে গত কয়েক বছর থেকে পার্বত্য এলাকায় ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরণের পাহাড় ও টিলায় অপরিকল্পিতভাবে কাসাভা, কচু, হলুদ ও আদা চাষাবাদ হচ্ছে। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাহাড়ের মাটি খুঁড়ে এসবের ব্যাপক চাষাবাদের কারণেও পাহাড়গুলো মারত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জানাযায়, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে অবস্থিত ৫৪৮০ বর্গকিলোমিটার অশ্রেণীভূক্ত বনভূমির সিংহভাগ অংশ এবং ৩১৭২ বর্গকিলোমিটার সংরক্ষিত বনভূমির কিছু অংশেও জুম চাষ এবং কাসাভা, হলুদ, কচু ও আদার চাষ হয়। রামগড় পাহাড় অঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র হতে সম্প্রতি মৌলভীবাজার আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে বদলী হওয়া মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুহাম্মদ জুলফিকার আলি ফিরোজ বলেন, কাসাভা, হলুদ, আদা, কচু ইত্যাদি চাষাবাদ জুম চাষের চেয়েও অধিক ক্ষতিকর।

তিনি বলেন, এসব লাগানোর সময় একবার এবং ফসল উঠানোর সময় আরেকবার পাহাড় ও টিলার মাটি কুপিয়ে উপড়ে ফেলা হয়। কাসাভার গাছের মূলই আলু হিসেবে ব্যবহার হয়। মাটির অনেক গভীরে থাকা এ মূল তোলার জন্য টিলার মাটি কোদাল দিয়ে উপড়ে ফেলা হয়। হলুদ, আদা, ও কচু তোলার জন্যও একইভাবে এলোপাতারি খুঁড়াখুড়ির কারণে পুরো টিলার মাটিই আলগা হয়ে পড়ে। বর্ষার সময় অল্প বৃষ্টি হলেই আলগা মাটিগুলো ধুয়ে যায়। এতে মাটির উপরের অংশে থাকা টপ সয়েল বা উর্বর মাটির স্তরও পানির তোড়ে ভেসে যায়। এ টপ সয়েল ক্ষয়ের কারণে ঐ পাহাড় বা টিলা গুলো অনুর্বর হয়ে পড়ায় কোন ফসল ফলে না।

ড. ফিরোজ আরও বলেন, এক ইঞ্চি পরিমান টপ সয়েল তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় ১০০ বছর। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের ফলে মাটি ক্ষয়ের সাথে টপ সয়েল ছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক উপাদান যেমন- ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, নাইট্রোজেন, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম প্রভৃতিও দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এতে পাহাড়গুলো উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছে। অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এভাবে চাষাবাদের ফলে পার্বত্য এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে।

অন্যদিকে পাহাড় ধস ও মাটি ক্ষয়ের কারণে পাহাড়ের পাদদেশে প্রবাহিত ছড়া, খাল ও নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারি এ মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ফিরোজ বলেন, অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পার্বত্য এলাকার পাহাড়গুলোতে চাষাবাদ এভাবে অব্যাহত থাকলে মাটি ধস ও ক্ষয়ের কারণে পাহাড়গুলো বিলীন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, এ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পেতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন করে পাহাড়ের চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

এদিকে ২০১৮ সালে পাহাড় ধস সংক্রান্ত একটি জাতীয় কমিটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ের ‘মালিকনা‘ নির্ধারণ করে তাদের হাতে পাহাড়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব হস্তান্তর, পাহাড় রক্ষা কমিটি গঠন ও নীতিমালা প্রণয়নসহ একটি সুপারিশমালা সরকারের কাছে পেশ করে। কমিটির প্রধান ছিলেন তৎকালিন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও তাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সত্যব্রত সাহা। কিন্তু কমিটির এ সুপারিশমালা কার্যকর হয়নি। চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. জমির উদ্দিন মুঠো ফোনে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় রক্ষার বিষয়টি সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যাপার। তিনি বলেন, কোথাও পাহাড় কাটার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সেখানে অভিযান চালিয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া পাহাড় রক্ষার কোন কার্যক্রম তাদের নেই।

Print Friendly, PDF & Email
Facebook Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

seven − seven =

আরও পড়ুন