parbattanews

অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান নয় : আইনমন্ত্রী

সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সংক্রান্ত সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী পুনর্বহাল হলেও ভবিষ্যতে ওই সরকারে প্রধান হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের রাখা হবে না বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। আইন কমিশনেও সাবেক বিচারপতিদের নিয়োগ না দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।

মানবাধিকার কমিশন এবং গুম প্রতিরোধ আইন প্রণয়নে অংশীজন সভায় সভাপতির বক্তব্যে এ তথ্য জানান আইনমন্ত্রী। গতকাল রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ এ সভার আয়োজন করে।

এতে অংশ নেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর ও সানজিদা ইসলাম তুলি, ইউএনডিপির কান্ট্রি ডিরেক্টর, সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী নূর খান, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জেলা ও দায়রা জজ শামসুদ্দিন মাসুম, ব্লাস্টের লুবনা ইয়াসমীন, মানবাধিকারকর্মী সঞ্জীব দ্রং, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনিরসহ আইন মন্ত্রণালয়ের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা।

১৯৯৬ সালের সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়। বিধান করা হয়, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন নির্বাচনকালীন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। নানা ঘটনাপ্রবাহের পর ২০১০ সালে আপিল বিভাগ ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করেন। একই বছর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার।

বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন দল নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে প্রায় ১৪ বছর আন্দোলন করে। অন্তর্বর্তী সরকারের ঐকমত্য কমিশনের সংলাপে দলগুলো একমত হয় বিচারপতিদের নিরপেক্ষতা রক্ষায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার থেকে বিচার বিভাগকে দূরে রাখা হবে। রাজনৈতিক দল এবং সংসদের সরকারি, বিরোধী ও তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রস্তাবিত নাম থেকে বাছাই কমিটির মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে।

জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার এবং তৃতীয় বৃহত্তম দলের প্রতিনিধিকে নিয়ে গঠিত বাছাই কমিটি একমত না হতে পারলে, দুজন বিচারপতি কমিটির সদস্য হবেন। এর পরও কমিটি কাউকে বাছাই করতে না পারলে র‌্যাঙ্ক চয়েজ ভোটে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা হবে। বাছাই কমিটিতে বিচারপতিদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং র‌্যাঙ্ক চয়েজ ভোটে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে বিএনপি।

জুলাই সনদে বলা হয়েছে, কোনো কারণে কমিটি প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করতে না পারলে শেষ বিকল্প হিসেবে ত্রয়োদশ সংশোধনী কার্যকর হবে। এতে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সুযোগ থাকবে।

কিন্তু আইনমন্ত্রী এ সুযোগ রাখার বিরুদ্ধে। তিনি বলেছেন, প্রধান বিচারপতিদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বানানোর প্রয়োজন নেই। একজন প্রধান বিচারপতি অবসরে যাওয়ার পর দিন গুনতে থাকেন কবে তিনি ওই পদে যাবেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, সদ্যসাবেক প্রধান বিচারপতির তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়া কিংবা অবসরের পর আইন কমিশনসহ বিভিন্ন পদে নিয়োগ পাওয়ার প্রত্যাশায় বিচারপতিরা কর্মক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা হারাচ্ছেন।

মানবাধিকার কমিশন দখদন্তহীন হবে না
মানবাধিকার কমিশনকে ব্যাপক ক্ষমতা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি অধ্যাদেশ পাস করায়নি বিএনপি। ফলে ২০০৯ সালের আইনে ফিরেছে কমিশন। গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশও পাস করায়নি সরকারি দল।

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, গুম-সংক্রান্ত আইনের সঙ্গে যেন মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ও মানবাধিকার কমিশন আইনের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়, সেজন্য অধ্যাদেশটি যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যেভাবে গুম কমিশন অধ্যাদেশ তৈরি করা হয়েছিল, তাতে যারা অপরাধী তারাই বেশি লাভবান হতো।

রাজনৈতিক কর্মীরা সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার জানিয়ে আসাদুজ্জামান বলেন, ‘আগের সরকারের সময় রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আদালত বসিয়ে বিচারের নামে সাজা দেওয়া হয়েছে। সেই বিচারকদের ফেরেশতার মতো দেখি। তারা এখনও ধরাছোয়াঁর বাইরে।’

ঈদের পর মানবাধিকার ও গুম প্রতিরোধ আইনের খসড়া নিয়ে আবার সভা হবে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশন যেন নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয় সেদিকে খেয়াল রেখে যুগোপযোগী ও কল্যাণমুখী আইন করতে চাই। বেশি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আমরা পরে অংশীজনের সঙ্গে আরও আলাপ-আলোচনা করা হবে, যেন অপরাধীরা ছাড়া না পায়।’

বিএনপির গুম হওয়া নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর বলেন, ‘আমার স্বামীকে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে গুম করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হলেও আগে গুমের শিকার ব্যক্তিদের সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য পাইনি। আগে যারা গুম হয়েছেন, তাদের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য সরবরাহ করা হোক।’

মানবাধিকার সংগঠন মায়ের ডাকের সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি বলেন, বিগত সময়ে মানবাধিকার কমিশনগুলো গুম এড়িয়েছে।
শিশির মনির বলেন, মানবাধিকার কমিশন আইনের বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা কমিশনের কাছে থাকা দরকার।

Exit mobile version