মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান):
পার্বত্যাঞ্চলের সবুজাভ পাহাড় এখন জুমের সোনালী ফসলে ঢাকা পড়েছে। ফসল তোলার আনন্দে জুমিয়ারা খুশির জোয়ারে ভাসছে। মুখে হাসির ঝিলিক। পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের আলীকদমের পাহাড়ে ইতোমধ্যেই জুমের ধান কাটার ধুম পড়েছে।
সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে জুমে ধান পাকা শুরু হয়। শরতে হাওয়ায় দোলা দেয় পাকা ধানের শীষ। রকমারী ফসলের হাতছানিতে আনন্দের ভরে দেয় জুমিয়াদের ঘর। পাহাড়ে এখন পাকা ধানের অমলিন দৃশ্য। একেকটি পাহাড় যেন একেকটি পরিবারের প্রতিচ্ছবি। পাহাড়ের জুমচাষকে ঘিরে জুমিয়া পরিবারগুলোর স্বপ্ন। জুমে বীজ বোনার শুরুর দিকে খরায় পড়লেও শেষ পর্যন্ত অনুকূল আবহাওয়া কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে জুমিয়াদের।
আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে পার্বত্য আলীকদম উপজেলার সাংবাদিক উচ্চতমনি তঞ্চঙ্গ্যা জুমের ফসলকে পাহাড়িদের জন্য ‘আলো’ হিসেবে চিত্রিত করে লিখেন ‘ঢেউ খেলানো শ্যামল পর্দায়, আলো আসবে ক’দিন পর, ব্যস্ত সবাই মঞ্চ সজ্জায়, পাহাড়িকা সাজঘর’। ‘গৈরিকা’ নামে এক কবিতায় পাহাড়ের জুমিয়াদের কষ্টার্জিত ‘জুম ফসল’কে তিনি আলো ও পাহাড়ের জুমঘরকে ‘পাহাড়িকা সাঝঘর’ বলে চিত্রিত করেছেন।
জানা গেছে, পার্বত্যাঞ্চলে বসবাসকারী ১১টি জনগোষ্ঠীর বেশীরভাগ মানুষ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল। পাহাড়কে ঘিরে বেঁচে থাকার সংগ্রাম তাদের। এখানকার জীবন জীবিকা দেশের অন্য এলাকা থেকে ভিন্নতর।
পাহাড়ে সনাতন পদ্ধতিতে ধানবীজ বুনে মিশ্র ফসলের চাষাবাদ করা হয়। এ চাষই পাহাড়ে ‘জুমচাষ’ বলে পরিচিত।
কৃষি তথ্য সার্ভিসের তথ্য মতে, জুমে ১৮ জাতের ধানচাষের পাশাপাশি তিল, তুলা, জুম শিম, মারফা, মরিচ, বেগুন, জুরো আলু, মিষ্টি কুমড়া, ওলকচু, মেইয়ে শাক ও ভুট্টাসহ অন্তত: ৩৩ প্রজাতির শাক-সবজির চাষাবাদ করা হয়। যার ফলে পাহাড়ী অঞ্চলের মানুষের তরি তরকারির বড় একটি যোগান আসে জুমচাষ থেকে।
জুমচাষী রুদ্রমনি তঞ্চঙ্গ্যা জানান, এ বছর দেরিতে বৃষ্টি হওয়ায় জুমে ধানের বীজ সঠিক সময়ে গজাতে পারেনি। তারপরও এ বর্ষায় ভারি বৃষ্টি না হওয়ায় প্রকৃতি যেন জুমের অনুকুলে ছিল।
জুমচাষের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলায় কুরুকপাতা, পোয়ামূহরী, বোলাইপাড়া, কালাইয়ার ছড়া, দৌছড়ি, মাঙ্গু, চাইম্প্রা ও মিরিঞ্জা পাহাড়ের ঢালে জুমচাষ করা হয়েছে।
পাহাড়ের সবুজাভ অরণ্যের মাঝে সোনালী ফসল হাতছানি দিচ্ছে। পাহাড়ের সর্বত্রই চলছে নবান্নের আনন্দ। জুমিয়াদের মনে বইছে আনন্দের জোয়ার। সারা বছরের কষ্টের ফসল ঘরে তুলবে এর চেয়ে আর কি বা আনন্দ হতে পারে। এই জুমচাষের ওপর সারা বছরের অন্নসংস্থানের ভরসা।
জুমিয়ারা বাঁশ-বেতের তৈরী একটি বিশেষ ঝুড়ির মাধ্যমে জুমের ফসল সংগ্রহ করেন। এই ঝুড়িটি স্থানীয় ভাষায় ‘থুরম’ বলা হয়। জুমের ধান সংগ্রহের পর একটি ছোট্ট ঘরে রাখা হয়। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় এ ঘরকে ‘মনোঘর’ বলে।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৯৬০ হেক্টর পাহাড়ী ভূমিতে জুমচাষ হয়েছে।
ইউপি চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন বলেন, জুমচাষ পাহাড়ি পরিবেশে বেচে থাকার প্রধান অবলম্বন। এ চাষ থেকে খাদ্যের বড় যোগান আসে। পরিবেশ রক্ষার্থে বেঁচে থাকার তাগিদে এখন থেকে জুমচাষের বিকল্প পদ্ধতি খোঁজা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
