parbattanews

আলীকদমে তামাকের কবলে রবিশস্য ও ধানি জমি

Alikadam tamak news Pic (20)

মমতাজ উদ্দিন আহমদ, আলীকদম (বান্দরবান):
বান্দরবানের আলীকদমে তামাক চাষের ক্ষতির প্রভাব পড়েছে এলাকার রবিশস্য ও ধানী জমিতে। তামাক চাষ করা হয় মূলতঃ শীতকালীন শাকসবজি, ডাল, তেল, পেঁয়াজ, রসুন এবং বোরো ধানের চাষের সময়। জমিতে তামাক চাষ করার ফলে অনেক সময় আমন ধান চাষ ব্যাহত হয়। আমন ধান কাটা মৌসুম আর তামাক রোপনের সময় একেবারে কাছাকাছি। আউশকেও ক্ষতি করে তামাক চাষ। কারণ আউশের সময় তামাক পাতা মাঠ থেকে ওঠে না। ফলে অক্টোবর থেকে শুরু করে মার্চ-এপ্রিল পর্যন্ত যত ফসল লাগানোর বা কাটার জন্য থাকে, সে সব ফসলই মূলত আটকে যায় তামাকের কারণে।

তামাক চাষীরা ঋণের ফাঁদে আটকে পড়ে বছরের পর বছর তামাক চাষ করতে বাধ্য হচ্ছেন। তামাক চাষীরা চাষের উপকরণ এবং বিক্রির এক ধরনের নিশ্চয়তা পেলেও অন্য ফসলের ক্ষেত্রে তার নিশ্চয়তা নেই। খাদ্য ফসল উৎপাদনকারী কৃষককে নিজ উদ্যোগে বীজ ও অন্যান্য উপকরণের জোগাড় করতে হয় এবং বাজারজাত করতে গিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতে হয়। এ সুযোগকে কাজে লাগাচ্ছে তামাক কোম্পানীগুলো। তবে কৃষকের উৎপাদিত তামাক কিনতে কোম্পানীগুলো সুচতুর কারসাজিও থেমে নেই। কোম্পানি নিজের মতো করে গ্রেড ও দাম নির্ধারণ করে, তাতে কৃষকের কিছুই করার থাকে না।

গিলে খাচ্ছে কৃষি জমি:
কৃষি বিভাগের ভাষ্য মতে, আলীকদম উপজেলায় কৃষি জমির পরিমাণ ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর। এরমধ্যে ৩ হাজার ২৩০ হেক্টর একফসলী, ২ হাজার ৭০০ হেক্টর দো-ফসলী, ৪০০ হেক্টর তিন ফসলী জমি রয়েছে। এসব কৃষি জমির ৯০ ভাগ এখন তামাক চাষের দখলে। এছাড়াও বর্তমানে মাতামুহুরী নদী, তৈন খাল ও চৈক্ষ্যং খালের চর জমিতে চলছে তামাকের আগ্রাসন। আগে সে সব জমিতে রবিশস্যে চাষ হতো।

স্থানীয় প্রান্তিক কৃষকদের ভাষ্য মতে, তামাক চাষের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি জমির বর্গা মূল্য বেড়েছে কয়েকগুণ। যে জমি গত কয়েক বছর পূর্বে বর্গা হতো ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আর সে জমি এখন বর্গা হচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়। বর্গা মূল্য বৃদ্ধির কারণে জমিতে ধান ও সবজির চাষ করে লাভবান হওয়া যাচ্ছেনা। ফলে বাধ্য হয়ে কৃষকরা অন্যান্য ফসলের পরিবর্তে তামাকে চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। এছাড়াও রবিশস্য বাজারজাতকরণেও রয়েছে নানা সমস্যা। অপরদিকে, তামাক চাষে পুঁজিবাদী কোম্পানীগুলো কৃষকদের আগাম ঋণ ও নানা ধরণের সুযোগ সুবিধা প্রদান করছে। যা রবিশস্যের চাষে ও বাজারজাতকরণে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো দিতে পারছেনা।

দ্বিগুণ আয়ের ফাঁদ: 
জানা গেছে, এক একর জমিতে ধান চাষ করে কৃষকরা প্রতিমৌসুমে আয় করে ১৫-২০ হাজার টাকা। ধান চাষে পরিশ্রমও তেমন একটা নেই। নিয়মমত সেচের পানি ও সার প্রয়োগেই ধান চাষ হয়ে যায়। কিন্তু পুঁজিবাদী তামাক কোম্পানীগুলো অতি মুনাফার ফাঁদে ফেলে কৃষকদের হাতে তুলে দিয়েছে তামাক চাষ।
যে জমিতে ধান চাষ করে ১৫-২০ হাজার টাকা পেত সেখানে তামাক চাষে পাওয়া যায় দ্বিগুণ অর্থ। ধান চাষের চেয়ে তামাক ক্ষেতে খাটুনির পরিমাণ বেশী হলেও দ্বিগুণ আয়ের লোভে চাষীদের ঝোঁক ক্ষতিকারক তামাক চাষে।

রবিশস্য চাষে ধস: চাষীরা জিম্মি
স্থানীয় চাষিরা জানান, তামাক চাষের আগে এসব জমিতে ধানের পাশাপাশি বিভিন্ন তরিতরকারি চাষ করা হতো। আর এসব তরকারি অত্র অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে পাশ্ববর্তি চকরিয়া ও চট্টগ্রামে সরবরাহ করা হতো। তামাক চাষ শুরু হওয়ার পর থেকে এসব জমিতে ধান বা অন্য কোনো ফসল উৎপাদন হয় না। তামাক কোম্পানী গুলো প্রতি সৌসুমের শুরুতেই বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে চাষিদের এক লক্ষ টাকা থেকে শুরু করে আট-দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত একেক চাষিকে অগ্রিম ঋণ প্রদান করে। আর এই ঋনের টাকা গ্রহণ করে তামাক কোম্পানী গুলোর ঋনের জ্বালে আটকা পড়ে চাষিরা। বাধ্য হয়ে ফসলি জমিতে তামাক চাষ করে ঋণের টাকার বিনিময়ে তামাক দিয়ে পরিশোধ করতে হয় তাদের।

চাষিরা আরও জানান, এক বছরে ঋণের বিনিময়ে তামাক দিতে না পরলে পরের বছর তামাক চাষ করে তামাক দিয়ে ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয় তাদের। ব্রিটিশ আমেরিকান ট্যোবাকো কোম্পানী, আবুল খায়ের ট্যোবাকো, নাসির ট্যোবকো, ঢাকা ট্যোবাকো ও নিউ এজ ট্যোবাকো কোম্পানীসহ আরও কয়েকটি কোম্পানী তামাক চাষ বিস্তারে ভূমিকা রাখছে।

(আগামীকাল পড়ুন: আলীকদমে তামাক চাষে স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও মাটির উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে : জিম্মি চাষীরা)

এই সিরিজের প্রথম পর্ব পড়তে নিচের শিরোনামে ক্লিক করুন

আলীকদমে তামাক প্রক্রিয়াজতে লাকড়ি পোড়ানোর মহোৎসব

Exit mobile version