এই সপ্তাহে ন্যাটো জোটের শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে তুরস্ক পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে সেতুবন্ধনকারী দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করেছে।
ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার একটি প্রধান স্তম্ভ হিসেবে তুরস্কের উত্থান শুরুতে ধীরগতিতে হলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির সামরিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের শুরুতে আঙ্কারা ইউক্রেনের কাছে নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ড্রোন বিক্রি করে, যা রাশিয়ার ট্যাংক ধ্বংসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যে শান্তি আলোচনার প্রাথমিক পর্বেরও আয়োজন করে তুরস্ক।
সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর প্রতিবেশী তুরস্ক আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও দামেস্কের নতুন সরকারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সেতুবন্ধন হিসেবে আবির্ভূত হয়।
এছাড়া চলতি বছরের শুরুতে তুরস্ক গোপনে ইরাকভিত্তিক বিরোধী ইরানি গোষ্ঠীগুলোকে সক্রিয় করে ইরানে সম্ভাব্য ইসরায়েলি স্থল হামলার পরিকল্পনা ঠেকাতে সহায়তা করে। এমন হামলা হলে আরও বিশৃঙ্খলা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে পারত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আজ ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে তুরস্ক তার সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক প্রভাব এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থানকে তুলে ধরছে।
ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তির অধিকারী তুরস্ক গত এক দশকে প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে দেশটি নিজস্ব সামরিক চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে বিদেশেও ব্যাপক হারে অস্ত্র রপ্তানি করছে। গত বছর তুরস্কের প্রতিরক্ষা রপ্তানি ১০ বিলিয়ন ডলার (৭.৪ বিলিয়ন পাউন্ড) অতিক্রম করে রেকর্ড গড়ে এবং ভবিষ্যতে এটি আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনকে ড্রোন সরবরাহের পাশাপাশি তুরস্ক পোল্যান্ডের কাছে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও রাডার ব্যবস্থা বিক্রি করেছে। পর্তুগালের জন্য নৌ-রসদবাহী জাহাজ নির্মাণ করছে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে স্পেনকে উন্নতমানের জেট প্রশিক্ষণ বিমান সরবরাহ করবে। এছাড়া ইরাকের জন্য বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ইন্দোনেশিয়ার জন্য যুদ্ধবিমানসহ আরও বিভিন্ন প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে।
স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া, হাঙ্গেরি, আলবেনিয়া, কসোভো এবং বসনিয়া-হার্জেগোভিনাও তুরস্ক থেকে অস্ত্র আমদানি করেছে।
রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান হুমকির মুখে ইউরোপ যখন পুনরায় অস্ত্রসজ্জায় মনোযোগ দিচ্ছে এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর জন্য চাপ দিচ্ছেন, তখন তুরস্কের অস্ত্র রপ্তানি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টিবি-২ ড্রোন
তুরস্কে নকশা ও নির্মিত মাঝারি উচ্চতায় দীর্ঘ সময় উড্ডয়নে সক্ষম টিবি-২ ড্রোন আন্তর্জাতিক অস্ত্র সরবরাহকারী হিসেবে আঙ্কারার অবস্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ড্রোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বেয়কারের চেয়ারম্যান তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের জামাতা। গত বছর প্রতিষ্ঠানটি ২.২ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি করেছে, যা তাদের মোট আয়ের অধিকাংশ।
ইউক্রেন, পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও ক্রোয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তুরস্ক থেকে এই ড্রোন আমদানি করেছে।
এই সপ্তাহে রকেটসান ও আসেলসানসহ কয়েকটি তুর্কি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আক্রমণ সক্ষমতা এবং আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরির জন্য ন্যাটোর বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী সালিহ আইহান বলেন,”তুরস্ক এখন আর শুধু নিজের সীমান্ত রক্ষাকারী একটি দেশ নয়।”
তিনি আরও বলেন,”তুরস্ক এমন একটি বৈশ্বিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা সংকটপূর্ণ অঞ্চলে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।“
এদিকে যুক্তরাজ্য ও তুরস্কের মধ্যে একটি নতুন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা চুক্তি ঘোষণা করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং এটি দুই দেশের সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার যৌথ অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
সালিহ আইহান বলেন,”ইউরোপ মহাদেশের দুই প্রান্তে অবস্থিত তুরস্ক ও যুক্তরাজ্য কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত নয়, বরং জোটের জন্য দুটি কৌশলগত ঢাল হিসেবে কাজ করে।”
তুরস্ক বর্তমানে নিজেকে রাশিয়া ও ইউক্রেন, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে এবং ন্যাটোর বাইরের নেতাদেরও সম্পৃক্ত করছে। এর উদাহরণ হিসেবে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারার আঙ্কারায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
শীর্ষ সম্মেলনে একটি রসিকতা প্রচলিত ছিল যে, তুরস্ক পশ্চিমা বিশ্বের নিজেদের মধ্যেও মধ্যস্থতা করতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, ন্যাটো থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার পর ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতেও তুরস্ক ভূমিকা রেখেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যদি এই শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজক না হতেন, তাহলে তিনি এতে অংশ নিতেন না।
দুই নেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ট্রাম্প আঙ্কারায় বলেন, ২০১৯ সালে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার কারণে এফ-৩৫ কর্মসূচি থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর তুরস্ককে আবারও এই কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন।
এক অনিশ্চিত ট্রাম্প প্রশাসন এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগের মধ্যে তুরস্কের কূটনৈতিক প্রভাব ইউরোপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তুরস্কের এই অবস্থান শুধু সময়োপযোগী নয়, বরং এর ভৌগোলিক অবস্থানও এর অন্যতম কারণ। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করার কারণে রাশিয়া ও ইরানের বিপরীতে ইউরোপের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান তৈরি করেছে।
কৃষ্ণসাগর, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও ককেশাস অঞ্চলের সংযোগস্থলে এমন অবস্থান ন্যাটোর অন্য কোনো সদস্য দেশের নেই। পাশাপাশি তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা বসফরাস ও দার্দানেলিস প্রণালী ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগরে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ পথ নিয়ন্ত্রণ করে।
১৯৫২ সাল থেকে ন্যাটোর সদস্য হওয়া সত্ত্বেও তুরস্ক দীর্ঘদিন পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে একটি অস্বস্তিকর অবস্থানে ছিল।
মাত্র কয়েক বছর আগেও তুরস্ক মিত্র দেশগুলোর বিরাগভাজন হয়েছিল। বিভিন্ন দেশের ন্যাটো সদস্যপদ প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা, ইউক্রেন আগ্রাসনের জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করা এবং দেশে ভিন্নমত দমনের কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।
বর্তমানে সেই পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে। তবে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রান্তিক অবস্থান থেকে তুরস্কের প্রধান স্তম্ভে পরিণত হওয়ার পথ এখনও পুরোপুরি সহজ নয়। প্রতিরক্ষা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সত্ত্বেও তুরস্কের নিজস্ব কান যুদ্ধবিমান এখনও মার্কিন ইঞ্জিনের ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অসন্তুষ্ট করতে পারে। কারণ ন্যাটো মিত্ররা প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে ইউরোপের ভেতর থেকেই অস্ত্র কেনার দিকে ঝুঁকছে।
তুরস্কের এই উত্থান ইসরায়েলেরও উদ্বেগের কারণ। দেশটির কর্মকর্তারা চান না, ‘নতুন ইরান’ হিসেবে পরিচিত তুরস্ক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাক। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অভিযোগ করেছেন, এতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হবে।
যদিও প্রকাশ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো এ বিষয়ে মন্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছে। সুইডেনের প্রধানমন্ত্রী উলফ ক্রিস্টারসন ‘দ্য টেলিগ্রাফ’-কে বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ায় ইসরায়েল অসন্তুষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন নন। তার মতে, এটি মূলত প্রতিরক্ষা ব্যয়ের অগ্রাধিকার পূরণের বিষয়।
তবে ব্যক্তিগতভাবে অনেক কূটনীতিক ও কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, বিশ্ব রাজনীতিতে ইসরায়েল একটি বড় অস্থিতিশীলতার উৎস এবং নতুন নেতৃত্ব না আসা পর্যন্ত এতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম।
তাদের আশঙ্কা, তুরস্ক থেকে অস্ত্র কেনার বিরুদ্ধে ইসরায়েল ইউরোপের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করবে। অন্যদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে তুরস্ক ইরানের সমালোচনারও মুখে পড়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভবত এটিই একমাত্র বিষয় যেখানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও ইসরায়েল একই অবস্থানে রয়েছে। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতি ইউরোপ এবং বিশ্বের জন্য নতুন অস্থিতিশীলতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্বল্পমেয়াদে ইউরোপের সামনে তুরস্কের সঙ্গে কাজ করা ছাড়া কার্যত অন্য কোনো বিকল্প নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া এবং আরও বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।
উৎস : দ্য টেলিগ্রাফ ( ৯ জুলাই ২০২৬)
