ইরানের বিরুদ্ধে ইজরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে গত ২৪ ঘণ্টায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। গতকাল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন ইরানের যুদ্ধ করার সক্ষমতা প্রায় নিঃশেষ। তার আর আক্রমণ করার কোনো ক্ষমতা নেই। তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বলে কিছু নেই, নৌশক্তি বলে কিছু নেই।
কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘটনার পর ইরান ইসরাইলের নিউক্লিয়ার সাইট ডিমোনাতে ভয়ংকর মিজাইল হামলা করেছে। এখানে ইসরাইলের শিমন প্যারেজ নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার অবস্থিত। বহু স্তরীয় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা সুরক্ষিত এই নিউক্লিয়ার সাইট ইরানের এই আক্রমণ ন্যূনতম প্রতিরোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সর্বমোট তিনটা স্থানে এখানে হামলা হয়েছে কোনরূপ প্রতিরোধ ছাড়াই। পূর্বের দিন ইরানের নিউক্লিয়ার সাইট নাতাঞ্জে ইসরাইল-আমেরিকার হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান এই হামলা চালিয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি ভবন ধ্বংস হয়েছে। প্রায় ৮০ জনের মত মানুষকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এছাড়াও ডিমোনাতে কর্মরত বিজ্ঞানী ও অফিসিয়ালদের বসবাসের ছোট্ট শহর আরাদেতেও হামলা করেছে ইরান। সেখানে বেশ কিছু ভবন ধ্বংস হয়েছে। উভয় স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এ পর্যন্ত ১২ জন নিহত ও দেড় শতাধিক আহতের সংবাদ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বাস্তবে এই ক্ষতি আরো বেশি। তেলাবিব ও হাইফার মত বৃহৎ নগরীগুলোর এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় ইসরাইল ছোট ছোট শহরগুলোতে অবস্থিত এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম রাজধানী ও বড় বড় নগরীতে স্থানান্তর করছে এমন সংবাদের ভিত্তিতে ইরান ইসরাইলের ছোট ছোট এসব নগর গুলোতে হামলা বৃদ্ধি করেছে।
এদিকে ট্রাম্পের এহেনো ঘোষণার পর ইরান মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএন এর একটি টিমকে তাদের একটি ভূগর্ভস্থ মিথাইল সিটি ঘুরিয়ে দেখিয়েছে। ফিরে এসে সিএনএন দাবি করেছে, ইরানের হয়তো এ ধরনের যুদ্ধ আরও এক দশক চালিয়ে যাওয়ার মত সক্ষমতা রয়েছে। তাদের সে ধরনের মজুদ ও উৎপাদন ব্যবস্থা রয়েছে।
এছাড়াও ইরান গতকাল দাবি করেছে তারা একটি ইসরাইলি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত করেছে। এতে বোঝা যায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিছু নেই বলে ট্রাম্প যে দাবি করেছিল তা সঠিক নয়। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান মার্কিন এফ ৩৫ লাইটিং ২ বিমানে আঘাত করে ইরান বিশ্বে নজির স্থাপন করেছে। কোন সন্দেহ ছাড়া এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক যুদ্ধবিমান হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি এফ-৩৫। বিশ্বে এটি একমাত্র যুদ্ধবিমান যেটি কোনো রানওয়ে ছাড়া উলম্বভাবে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে। তবে এর মূল্য অত্যাধিক। প্রকারভেদে এই মডেলের একেকটি যুদ্ধ বিমানের দাম ৮ কোটি থেকে ১৩ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে। যা বাংলাদেশী টাকায় ১০০০ কোটি টাকার উপরে। এছাড়াও এই যুদ্ধবিমান পরিচালনায় বিপুল খরচ রয়েছে। এ কারণেই প্রস্তাব ও চাহিদা থাকা সত্ত্বেও ভারতের মতো দেশ এ যুদ্ধবিমান ক্রয় করতে পারছে না। প্রকৃত ফিফথ জেনারেশন এবং শতভাগ স্টেলথ প্রযুক্তির এই যুদ্ধবিমান এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো রাডারে ধরা পড়ার রেকর্ড নেই। অথচ ইরান সম্প্রতি এই যুদ্ধবিমান কেবল রাডারে সনাক্ত করেনি বরং তাকে আঘাত করে গ্রাউন্ডেড হতে বাধ্য করেছে।বিশ্বের ইতিহাসে এটি সর্বপ্রথম ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্র এই আঘাতের কথা স্বীকার করে নিলেও বিমানটিকে নিরাপদ অবস্থানে জরুরি অবতরণ করাতে সক্ষম হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
প্রথম দিকে ধারণ করা হয়েছিল ইরান হয়তো চাইনিজ ও রাশিয়ান প্রযুক্তিগত সহায়তায় এই আঘাতে সক্ষম হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে, সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে ইরান স্টিল্থ প্রযুক্তির এই মার্কিন যুদ্ধ বিমান সনাক্ত করেছে এবং তাদের নিজস্ব তৈরির মিজাইল দিয়েই আঘাত করেছে। এটি ইরানের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতার এক চরম নিদর্শন।
প্রচলিত রাডারে স্টেল্থ প্রযুক্তির এ ধরণের যুদ্ধবিমান সনাক্ত করা যায় না। তবে ইরান ইনফ্রা রেড টেকনোলজি ব্যবহার করে এই যুদ্ধ বিমানটি সনাক্ত করেছে। এ প্রযুক্তির মাধ্যমে উড্ডয়নকালে যুদ্ধবিমান থেকে নির্গত তাপ সনাক্ত করে যুদ্ধবিমানটি চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরানের এই আবিষ্কার আগামী দিনে স্টিল্থ যুদ্ধ বিমানকে যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। কেননা অন্যান্য দেশগুলো এখন ইরানকে অনুসরণ করে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং আরো উন্নয়ন ঘটাবে। ফলে আগামী দিনে স্টিলথ যুদ্ধবিমানগুলো খুব সহজেই প্রতিপক্ষের রাডারে ধরা পড়বে এবং বিমান বিধ্বংসী মিজাইলের আঘাতের শিকার হবে।
গতকালের যুদ্ধে আরও একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে। ইরান দিয়াগো গার্সিয়া তে অবস্থিত ব্রিটিশ-মার্কিন সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে দুটি মিসাইল নিক্ষেপ করেছে। একটি ব্যর্থ হয়েছে এবং আরেকটি ডিফেন্স মিজাইল দ্বারা প্রতিহত করা হয়েছে। ভারত মহাসাগরে অবস্থিত দিয়াগো গার্সিয়া মূলত একটি ব্রিটিশ অধিকৃত দ্বীপ। তবে একটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপে সামরিক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এখান থেকে যে কোন অভিযান পরিচালনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে বৃটেনের অনুমতি নিতে হয়।
ইরান থেকে এই দ্বীপের দূরত্ব ৪১০০ কিলোমিটার। অথচ ইরান সবসময়ই ঘোষণা করে এসেছে তাদের মিসাইলের পাল্লা ২০০০ থেকে ২৫০০ কিলোমিটার এর মধ্যে। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ইরান কেন ৪০০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত দ্বীপে দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার মিসাইল ছুঁড়ল? পূর্বেই বলা হয়েছে, ইরান সবসময়ই ঘোষণা দিয়েছে তাদের মিসাইলের পাল্লা ২০০০ থেকে ২৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে। এই ঘটনার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে ইরান মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপ ও বিশ্ববাসীকে বার্তা দিতে চেয়েছে তাদের শত্রু সুনির্দিষ্ট। এর বাইরে আগ্রাসন চালানোর কোন ইচ্ছা তাদের নেই। অর্থাৎ ইসরাইলের বাইরে বাকি বিশ্বকে তারা এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে আশ্বস্ত করতে চেয়েছে।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দিয়াগো গার্সিয়া থেকে ইরানের উদ্দেশ্যে সামরিক হামলা পরিচালনার জন্য বৃটেনের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু বৃটেন বারবারই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। এ নিয়ে ট্রাম্প ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টিয়ারমারের মধ্যে কিছুটা মনোমালিন্যও দেখা দিয়েছে। ইরানের কাছে হয়তো খবর থাকবে, ট্রাম্পের পুনঃ পুনঃ চাপের মুখে হয়তো স্টিয়ারমার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে থাকবেন। সে কারণে পূর্ব সর্তকতা হিসেবে ইরান দুই হাজার কিলোমিটার পাল্লার মিজাইল ছুঁড়ে মূলত ব্রিটেনকে একটি বার্তা দিতে চেয়েছে। এছাড়াও অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, খুরারমশাহ-৪ এর মত কিছু মিসাইলের রেঞ্জ ইরান ২০০০ থেকে ২৫০০ কিলোমিটার এর মধ্যে রাখলেও এগুলো চার থেকে পাঁচ হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত দূরে আক্রমণের সক্ষমতা রয়েছে।
এটা সঠিক হলে, ইরানের কাছে ইউরোপিয়ান অধিকাংশ দেশগুলোতে আঘাত হানার মত ব্যালিস্টিক ও হাইপারসনিক মিজাইল যথেষ্ট পরিমাণ মজুদ রয়েছে। এটা ইউরোপের জন্য মাথা ব্যথার কারণ। এবং চলমান যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর যেকোনো আগ্রাসী বা বিলাসী অভিযানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে। ইরান হয়তো এটাই চেয়েছিল।
এছাড়াও অনেকের মনে থাকার কথা, যুদ্ধ শুরুর মাসখানে পূর্বে ইরান আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছিল। যার পাল্লা ১০ হাজার কিলোমিটারের অধিক। ইরানের ভূখণ্ডগত সীমাবদ্ধতার কারণে রাশিয়ার অনুমতিক্রমে ইরান তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে এই মিসাইল সাইবেরিয়াতে পাঠিয়েছিল। এই মিজাইলেনের মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ করার সক্ষমতা প্রমাণ করেছিল। এ দ্বারা প্রমাণিত হয়, ইরানের পক্ষে দিয়াগো গার্সিয়াতে অবস্থিত মার্কিন দূরপাল্লার বিমান বি-৫২, বি-২১ এবং বিমানবাহী যুদ্ধজাহাজে আক্রমণ করা সম্ভব। একই সাথে বৃটেনের জন্যও একই ধরনের সতর্কবার্তা।
নিজ মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঠিক এ মুহূর্ত থেকে’ পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো প্রকার ‘হুমকি ছাড়াই’ ইরানকে এই জলপথ পুরোপুরি খুলে দিতে হবে। এর পূর্বে গভীর রাতে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ইরানের সন্ত্রাসী শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের মহান সামরিক চেষ্টা গুটিয়ে নেওয়ার কথা আমরা বিবেচনা করছি।’ চলমান যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহুবার এ ধরনের বিভ্রান্তকর বক্তব্য দিয়ে আসছেন। একটা বক্তব্য দেয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি পাল্টা বক্তব্য দিচ্ছেন।
এদিকে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিকে আল জারিরা টিভি চ্যানেলের একটি টকশোতে উপস্থাপক প্রশ্ন করেন, তুমি তো ওদের অন্যতম টার্গেট। জবাবে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সম্প্রতি তারা যে কোন স্থানে ও যে কোন ব্যক্তিকে টার্গেট করছে। সেটা ৫৩ টি হসপিটাল কিংবা অসংখ্য স্কুলের মত হতে পারে। তারা আমাকেও টার্গেট করতে পারে। আমি এতে ভয় পাই না। আমি আমার দেশের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত। তারা আমাকে টার্গেট করে মূলত আমার একটি মহান ইচ্ছাকেই (শাহাদাতের ইচ্ছা) পূর্ণ করতে পারবে, আর কিছু নয়।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক।
