parbattanews

ইসরাইলে ভারতীয় ট্রাইবের পূনর্বাসন বিতর্ক

ইসরায়েলের “লস্ট ট্রাইব” বা হারিয়ে যাওয়া ইহুদি গোত্রের গল্প আবারও একটি পুরনো কিন্তু অস্বস্তিকর বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে—কারা “ফিরে আসার অধিকার” পায়, আর কারা পায় না। সম্প্রতি ভারতের একটি সম্প্রদায়কে “হারানো ইহুদি গোত্র” হিসেবে চিহ্নিত করে Israel-এ নিয়ে আসা হয়েছে। তাদের এই যাত্রাকে উপস্থাপন করা হয়েছে হাজার বছরের ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে। কিন্তু একই সময়ে, Palestine-এর বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের জন্য “ফিরে আসা” এখনো এক অধরা অধিকার।

ইসরায়েলের “রাইট অব রিটার্ন” আইন অনুযায়ী, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বসবাসরত ইহুদিরা দেশটিতে এসে নাগরিকত্ব পেতে পারে। এই নীতির পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক নিপীড়ন, বিশেষ করে Holocaust-এর অভিজ্ঞতা। ফলে ইহুদি পরিচয়কে কেন্দ্র করে একটি নিরাপদ রাষ্ট্র গঠনের যুক্তি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থন পেয়েছে। “লস্ট ট্রাইব” হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে এই ধারণাকে আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।

কিন্তু এই নীতির বিপরীতে দাঁড়িয়ে আছে ফিলিস্তিনিদের বাস্তবতা। ১৯৪৮ সালে Nakba-এর সময় লাখো ফিলিস্তিনি তাদের ভূমি থেকে উৎখাত হন। তাদের উত্তরসূরিরা আজও শরণার্থী শিবিরে বা বিভিন্ন দেশে বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবে তাদের “রাইট অব রিটার্ন” স্বীকৃত হলেও বাস্তবে সেই অধিকার কার্যকর হয়নি। বরং ইসরায়েল এই দাবিকে নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত ভারসাম্যের প্রশ্নে অগ্রাহ্য করে আসছে।

এই দ্বৈত নীতি—একদিকে দূরবর্তী কোনো সম্প্রদায়কে ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভিত্তিতে স্বাগত জানানো, অন্যদিকে স্থানীয় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীকে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ না দেওয়া—আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্ন তুলছে। সমালোচকদের মতে, এটি শুধু আইনি বৈষম্য নয়, বরং একটি রাজনৈতিক প্রকল্প, যেখানে জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে নাগরিকত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হচ্ছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের সমর্থকরা যুক্তি দেন, দেশটি একটি “ইহুদি রাষ্ট্র” হিসেবে প্রতিষ্ঠিত, এবং তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এই নীতি প্রয়োজনীয়। তাদের মতে, ফিলিস্তিনিদের প্রত্যাবর্তন ইসরায়েলের জনসংখ্যাগত কাঠামোকে বদলে দিতে পারে, যা রাষ্ট্রের মূল চরিত্রের জন্য হুমকি হতে পারে।

তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই যুক্তিকে চ্যালেঞ্জ করছে। তারা বলছে, নাগরিকত্ব ও প্রত্যাবর্তনের অধিকার জাতিগত বা ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত সমানাধিকারের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক “লস্ট ট্রাইব” আগমনের ঘটনাটি তাই শুধু একটি মানবিক গল্প নয়; এটি বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন। যেখানে ইতিহাস, পরিচয় ও রাষ্ট্রনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। আর এই বাস্তবতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ফিরে আসার অধিকার কেবল একটি আইনি প্রশ্ন নয়, এটি ক্ষমতা, রাজনীতি এবং ন্যায়ের প্রশ্নও।

ইসরায়েলের “লস্ট ট্রাইব” বিতর্কের দ্বিতীয় পর্বে সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়টি ঘিরে আছে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এক বিশেষ জনগোষ্ঠী—Bnei Menashe। নিজেদেরকে প্রাচীন ইসরায়েলের “হারিয়ে যাওয়া ১০ গোত্র”-এর একটি, বিশেষ করে মনাশে গোত্রের বংশধর দাবি করে তারা। এই দাবি ইতিহাস, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধুনিক ভূরাজনীতির এক জটিল সংমিশ্রণ তৈরি করেছে।

ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম অঞ্চলে বসবাসকারী এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে ২০শ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইহুদি পরিচয়ের প্রতি এক নতুন আগ্রহ তৈরি হয়। তারা ধীরে ধীরে নিজেদের আচার-অনুষ্ঠান, খাদ্যাভ্যাস এবং ধর্মীয় অনুশীলনকে ইহুদি রীতির সঙ্গে মিলিয়ে নিতে শুরু করে। যদিও ঐতিহাসিক ও জেনেটিক প্রমাণ এই দাবিকে পুরোপুরি সমর্থন করে না, তবুও ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তিতে তাদের পরিচয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এই প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা পালন করেছে Shavei Israel নামের একটি সংস্থা, যারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে “হারানো ইহুদি” সম্প্রদায়গুলোকে খুঁজে বের করে এবং তাদের ইসরাইলের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়। সংস্থাটি দাবি করে, ঐতিহাসিক বিচ্ছিন্নতা সত্ত্বেও এই জনগোষ্ঠীগুলো তাদের ইহুদি শিকড় ধরে রেখেছে।

ইসরায়েল সরকার ধীরে ধীরে Bnei Menashe-দের স্বীকৃতি দিতে শুরু করে। ২০০৫ সালে ইসরায়েলের প্রধান রাব্বিনেট তাদের “ইহুদি বংশোদ্ভূত” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, যদিও পূর্ণ নাগরিকত্বের আগে তাদের আনুষ্ঠানিক ধর্মান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এরপর থেকে হাজার হাজার মানুষ ইসরায়েলে অভিবাসন করেছে, এবং সাম্প্রতিক ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।

তবে এই গল্পটি নিছক ধর্মীয় প্রত্যাবর্তনের নয়; এটি রাজনৈতিকও। সমালোচকদের মতে, এই ধরনের অভিবাসন ইসরায়েলের জনসংখ্যাগত নীতির অংশ, যেখানে বিশ্বজুড়ে ইহুদি পরিচয়ের মানুষদের এনে বসতি স্থাপন করানো হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম তীরের কিছু বসতিতে তাদের পুনর্বাসন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, যা West Bank-এর চলমান সংকটকে আরও জটিল করে তোলে।

অন্যদিকে, Palestine-এর শরণার্থীরা এখনো তাদের পূর্বপুরুষের ভূমিতে ফিরতে পারছে না। ফলে ভারতীয় “লস্ট ট্রাইব”-এর এই আগমন অনেকের কাছে বৈপরীত্যের প্রতীক—একদিকে দূরবর্তী এক জনগোষ্ঠীর জন্য দরজা উন্মুক্ত, অন্যদিকে স্থানীয় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর জন্য তা বন্ধ।

তবে Bnei Menashe-দের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি স্বপ্নপূরণ। বহু প্রজন্ম ধরে তারা নিজেদেরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত মনে করেছে, এবং সেই বিশ্বাসই তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার প্রেরণা। নতুন দেশে এসে তারা ভাষা, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হলেও, নিজেদের পরিচয়ের স্বীকৃতি পাওয়াকে তারা একটি ঐতিহাসিক অর্জন হিসেবে দেখছে।

সব মিলিয়ে, ভারতীয় “লস্ট ট্রাইব”-এর কাহিনী শুধু একটি সম্প্রদায়ের অভিবাসনের গল্প নয়; এটি পরিচয়, বিশ্বাস, রাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়ের জটিল প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। এই গল্প বুঝতে হলে শুধু ইতিহাস নয়, বর্তমান রাজনীতি ও ক্ষমতার ভারসাম্যকেও বিবেচনায় নিতে হয়।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক নয়াদিগন্ত (উৎস : লেখকের ফেইসবুক পোস্ট থেকে)

Exit mobile version