parbattanews

কোরবানির পশু কেমন হওয়া উচিত

পবিত্র ঈদুল আজহা আগামী ২৮ মে। এটি কেবল উৎসবের আনন্দধারা নয়, বরং ত্যাগের সুমহান মহিমায় উদ্ভাসিত এক পবিত্র ইবাদত। এই মহিমান্বিত দিনের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলো কোরবানির পশু। ঈদের আবহে শহর থেকে গ্রাম—দেশের প্রতিটি জনপদেই এখন ক্রেতা-বিক্রেতার মুখরতায় পশুর হাটগুলো জমজমাট হয়ে উঠেছে। প্রতিটি পরিবারেই একটি পশুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে গভীর আবেগ, যত্ন ও ভালোবাসা।

তবে আমাদের মনে রাখতে হবে, কোরবানি কেবল একটি লৌকিক প্রথা, প্রদর্শনপ্রবণতা কিংবা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের এক অনন্য আত্মনিবেদন। তাই কোরবানির জন্য নির্বাচিত পশুটি যেন শরিয়তের বিধান অনুযায়ী সব দিক থেকে সুস্থ, পরিপক্ব ও নিরাপদ হয়—তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে আমাদের অন্যতম নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।

সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। জিলহজ মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখের মধ্যে এই ইবাদত সম্পাদন করতে হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হালাল উপার্জনের অর্থে পশু ক্রয় করে তা জবাই করার নামই কোরবানি। ইসলামি শরিয়তে উট, গরু, মহিষ, দুম্বা, ভেড়া ও ছাগল—এই ছয় ধরনের পশু দিয়ে কোরবানির বিধান রয়েছে। বয়সের ক্ষেত্রেও রয়েছে সুস্পষ্ট নির্দেশনা। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের, গরু ও মহিষ দুই বছরের এবং উট পাঁচ বছরের হতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, খোঁড়া, অন্ধ, স্পষ্ট রোগাক্রান্ত কিংবা অতিশয় কৃশ পশু কোরবানি করা যাবে না। অর্থাৎ পশুর শারীরিক সুস্থতা ও অখণ্ডতাই কোরবানির মান নির্ধারণ করে।

বর্তমানে পশু কেনার ক্ষেত্রে ধর্মীয় দায়িত্বের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অধিক মুনাফার আশায় পশুকে স্টেরয়েড বা নিষিদ্ধ হরমোন প্রয়োগ করে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করছে। অনেক খামারি হাতুড়ে চিকিৎসক বা কোয়াকদের পরামর্শে ডেক্সামেথাসন, প্রেডনিসোলনসহ বিভিন্ন স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। এসব ওষুধ সাময়িকভাবে পশুর শরীরে পানি ও চর্বি জমিয়ে বাহ্যিকভাবে মোটা দেখালেও বাস্তবে তা অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ধরনের স্টেরয়েড পশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করে দেয়, লিভার ও কিডনির মারাত্মক ক্ষতি করে এবং অনেক ক্ষেত্রে হঠাৎ মৃত্যুর কারণও হয়ে দাঁড়ায়। একই সঙ্গে এসব রাসায়নিকের প্রভাব মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এসব ক্ষতিকর উপাদান মানবদেহে প্রবেশ করে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই ইবাদতের নামে নিজের পরিবারকে স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়।

অথচ প্রাকৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উপায়ে খুব সহজেই গরু মোটাতাজা করা সম্ভব। এজন্য প্রথমেই ২ থেকে ৪ বছর বয়সী স্বাস্থ্যবান গরু নির্বাচন করতে হবে। নিয়মিত কৃমিনাশক প্রয়োগ, সুষম ও পুষ্টিকর খাদ্য সরবরাহ, ভিটামিন-মিনারেল ও প্রিমিক্স ব্যবহার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি ও সঠিক পরিচর্যা নিশ্চিত করলে কোনো ক্ষতিকর ওষুধ ছাড়াই ৩ থেকে ৬ মাসের মধ্যে একটি গরুকে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে মোটাতাজা করা সম্ভব। এতে যেমন পশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বজায় থাকে, তেমনি নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত মাংসও নিশ্চিত হয়।

তবে সচেতন দৃষ্টি থাকলে সুস্থ পশু চেনা মোটেও কঠিন নয়। হাটে গিয়ে লক্ষ্য করুন—সুস্থ পশু সবসময় সজাগ থাকে, তার কান ও লেজ স্বাভাবিকভাবে নড়ে, নিয়মিত জাবর কাটে। চোখ থাকে উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত, নাকের সামনের অংশ ভেজা থাকে এবং খাবারের প্রতি স্বাভাবিক আগ্রহ দেখা যায়। একমুঠো ঘাস সামনে ধরলে সে আগ্রহ নিয়ে খেতে চায়। অন্যদিকে কৃত্রিমভাবে মোটাতাজা করা পশু অনেক সময় নিস্তেজ ও দুর্বল দেখায়, হাঁটাচলায় অস্বাভাবিকতা থাকে, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয় এবং শরীরে অস্বাভাবিক ফোলা ভাব দেখা যায়। আঙুল দিয়ে চাপ দিলে মাংস দেবে গিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে। কোরবানির পশু কেনার সময় শুধু আকার বা বাহ্যিক চাকচিক্য দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। পশুর আচরণ, শ্বাস-প্রশ্বাস, নাকের স্বাভাবিক ভেজাভাব, চোখের উজ্জ্বলতা এবং চলাফেরা ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। কোনো ধরনের সন্দেহ দেখা দিলে অবশ্যই প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা অভিজ্ঞ ভেটেরিনারি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

বাংলাদেশ আজ গবাদিপশু উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। দেশীয় খামারিরা এখন আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পশু পালন করছেন। ফলে স্থানীয়ভাবে লালিত সুস্থ ও প্রাকৃতিক উপায়ে মোটাতাজাকৃত পশু সহজেই পাওয়া যাচ্ছে। স্থানীয় খামারিদের কাছ থেকে পশু কিনলে যেমন নিরাপদ মাংস নিশ্চিত হয়, তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয় এবং কৃষকও ন্যায্যমূল্য পান।

পশু কেনার পরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় রয়েছে। হাট থেকে আনার পর পশুকে অন্তত ১০–১২ ঘণ্টা বিশ্রাম দিতে হবে। পর্যাপ্ত পরিষ্কার পানি ও প্রাকৃতিক খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলাম জবাইয়ের সময় পশুর প্রতি দয়া ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছে। উট ছাড়া অন্য পশুকে বাম কাতে শুইয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে দ্রুত জবাই করা উচিত, যাতে পশুর কষ্ট কম হয়। কোরবানির আগে অতিরিক্ত ভারী খাবার না দিয়ে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ করলে পশু স্বাভাবিক থাকে এবং মাংসের মানও ভালো থাকে।

সচেতনতা, সুস্থতা ও শরিয়তের সঠিক বিধান অনুসরণ করেই কোরবানির প্রকৃত তাৎপর্য অর্জন সম্ভব। কেবল বাহ্যিক আয়োজন নয়, বরং মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও বিশুদ্ধ নিয়তের সমন্বয়েই কোরবানি হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ ইবাদত। ত্যাগের এই মহান শিক্ষায় ধুয়ে যাক আমাদের সব লোভ, অসচেতনতা ও কলুষতা।

লেখকঃ ডেপুটি রেজিস্ট্রার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

Exit mobile version