parbattanews

খাগড়াছড়ির আলুটিলা : টেকসই পর্যটনে জাতীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাময় নতুন দিগন্ত

মো. সহিদুল ইসলাম সুমন, এই প্রবন্ধের লেখক

বাংলাদেশকে সাধারণত নদীমাতৃক দেশ হিসেবেই বেশি পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এই ভূখণ্ডের আরেকটি অনন্য পরিচয় রয়েছে—এ দেশের পাহাড়, অরণ্য, ঝরনা, গুহা এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির এক অপূর্ব সমাহার।

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐশ্বর্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। দেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ, পরিবেশ দূষণ এবং যান্ত্রিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পেতে প্রতি বছর লাখো মানুষ ছুটে যান এই পাহাড়ি অঞ্চলে। আর সেই ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে খাগড়াছড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্যগুলোর একটি হলো আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র।

স্থানীয় ভাষায় ‘মাতাই হাকোর’ বা ‘দেবতার গুহা’ নামে পরিচিত আলুটিলা কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়; এটি প্রকৃতির রহস্য, পাহাড়ি সভ্যতা, ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার এক অনন্য মিলনস্থল। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে বহুমাত্রিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে আলুটিলার মতো প্রাকৃতিক সম্পদকে নতুনভাবে মূল্যায়ন ও পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা সময়ের দাবি।

খাগড়াছড়ি শহর থেকে মাত্র সাত কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কের পাশে অবস্থিত আলুটিলা পাহাড় সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০০ ফুটেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে চোখের সামনে উন্মোচিত হয় সবুজে মোড়ানো অসংখ্য পাহাড়ের সারি, আঁকাবাঁকা সড়ক, চেঙ্গী নদীর রূপালি জলধারা এবং পাহাড়ি জনপদের মনোরম দৃশ্য। শীতের সকালের কুয়াশা কিংবা বর্ষার ভাসমান মেঘ আলুটিলাকে এক স্বর্গীয় সৌন্দর্যে সাজিয়ে তোলে। প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী এবং ভ্রমণপিপাসু মানুষের জন্য এটি যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস।

তবে আলুটিলার প্রকৃত বিস্ময় লুকিয়ে আছে পাহাড়ের অন্তঃস্থলে। প্রায় ১৫০ মিটার দীর্ঘ প্রাকৃতিক গুহাটি বাংলাদেশের অন্যতম পরিচিত গুহা। চুনাপাথরের প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হওয়া এই গুহার ভেতরে দিনের বেলাতেও সূর্যের আলো পৌঁছায় না। টর্চের আলোয় গুহার আঁকাবাঁকা পথ অতিক্রম করতে হয়। পাথরের গা বেয়ে ঝরে পড়া ঠান্ডা জল, পায়ের নিচ দিয়ে প্রবাহিত সরু জলধারা এবং চারপাশের নিস্তব্ধ পরিবেশ পর্যটকদের এক ভিন্ন অভিজ্ঞতার স্বাদ দেয়। প্রকৃতির এই অপরূপ সৃষ্টি শুধু রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষকেই আকর্ষণ করে না, ভূতত্ত্ব, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

বিশ্বের অনেক দেশ গুহাভিত্তিক পর্যটনকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত করেছে। ভিয়েতনামের সন ডুং গুহা, মালয়েশিয়ার বাতু কেভ, থাইল্যান্ডের থাম লুয়াং কিংবা ভারতের মেঘালয়ের গুহাগুলো প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক পর্যটক আকর্ষণ করে। বাংলাদেশের আলুটিলা আকারে ছোট হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থান, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য এবং পাহাড়ি সংস্কৃতির সমন্বয় আন্তর্জাতিক পর্যটকদের জন্যও আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে, যদি পরিকল্পিত বিনিয়োগ, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা যায়।

বর্তমান বিশ্বে পর্যটন শুধু বিনোদনের বিষয় নয়; এটি অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক শিল্প। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন পরিষদ (WTTC)-এর গবেষণা অনুযায়ী, ভ্রমণ ও পর্যটন খাত বিশ্ব অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং সেবা খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। সংস্থাটি প্রতিবছর বিভিন্ন দেশের পর্যটন খাতের জিডিপিতে অবদান, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রকাশ করে। একইভাবে জাতিসংঘের পর্যটন সংস্থা (UN Tourism) পর্যটনকে টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

বাংলাদেশেও পর্যটন খাত ধীরে ধীরে গুরুত্ব পাচ্ছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড পর্যটনকে দেশের অর্থনৈতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধির অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনা করছে। বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত সরকারি বার্তায়ও টেকসই পর্যটন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আলুটিলার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। কারণ এটি কেবল একটি দর্শনীয় স্থান নয়; বরং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি, তাঁতের বস্ত্র, বাঁশ ও বেতের তৈরি হস্তশিল্প, পাহাড়ি খাবার এবং লোকজ ঐতিহ্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ সৃষ্টি করে। পর্যটকদের আগমনের ফলে স্থানীয় নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক, গাইড, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং হস্তশিল্প বিক্রেতাদের আয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিকল্পিতভাবে এই খাতকে সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতিতে একটি টেকসই পরিবর্তন আনা সম্ভব।

আলুটিলাকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলারও যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। আলুটিলা থেকে সহজেই রিছাং ঝরনা, মাতাই পুকুর বা দেবতার পুকুর, তারেং ভিউ পয়েন্ট, মায়াবিনী লেক, জেলা পরিষদ হর্টিকালচার পার্ক, হাজাছড়া ঝরনা, ডিম পাহাড়সহ খাগড়াছড়ির অন্যান্য দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ করা যায়। একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব স্থানকে একই ভ্রমণপথে যুক্ত করা গেলে পর্যটকদের অবস্থানকাল বাড়বে, ব্যয় বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলা প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের উদ্যোগে আলুটিলার অবকাঠামো উন্নয়নে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভিউ পয়েন্ট, ওয়াচ টাওয়ার, ঝুলন্ত সেতু, বিশ্রামাগার, সিঁড়ি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন পর্যটকদের ভ্রমণকে আরও সহজ করেছে। ঈদ, পূজা, বড়দিন কিংবা দীর্ঘ সরকারি ছুটিতে হাজার হাজার মানুষের সমাগম প্রমাণ করে যে আলুটিলা ইতোমধ্যেই দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে কিছু উদ্বেগও সামনে এসেছে। পর্যটকদের অসচেতন আচরণে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট এবং অন্যান্য বর্জ্যে পাহাড়ের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও পাহাড় কাটা, অপরিকল্পিত দোকান নির্মাণ এবং শব্দদূষণও প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুহার ভেতরে দেয়ালে নাম লিখে রাখা কিংবা প্রাকৃতিক শিলাস্তর ক্ষতিগ্রস্ত করার ঘটনাও উদ্বেগজনক। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতির এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।

আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ পর্যটন উন্নয়নে ‘ইকো-ট্যুরিজম’, ‘গ্রিন ট্যুরিজম’ এবং ‘রেসপনসিবল ট্যুরিজম’-এর নীতি অনুসরণ করছে। অর্থাৎ এমন পর্যটন, যা অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে কিন্তু পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করবে না। আলুটিলার ক্ষেত্রেও সেই নীতিই অনুসরণ করা উচিত। প্লাস্টিকমুক্ত পর্যটন এলাকা ঘোষণা, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, নিরাপদ হাঁটার পথ, প্রশিক্ষিত গাইড, পর্যটন পুলিশ, তথ্যকেন্দ্র, জরুরি চিকিৎসাসেবা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

এর পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে পর্যটন উন্নয়নের অংশীদার করতে হবে। উন্নয়নের সুফল যাতে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঘরে পৌঁছে, সে জন্য ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজারজাতকরণ সুবিধা এবং ডিজিটাল বিপণনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ করেই পর্যটনকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব; অন্যথায় পর্যটনের নামে স্থানীয় সংস্কৃতির ক্ষয় শুরু হবে।

বর্তমান বিশ্বে পর্যটনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ডিজিটাল প্রচারণা। উন্নতমানের ওয়েবসাইট, অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা, বহুভাষিক তথ্যসেবা, ভার্চুয়াল ট্যুর, আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলায় অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে আলুটিলাকে বিশ্বের পর্যটন মানচিত্রে আরও সুপরিচিত করা সম্ভব। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশ ঠিক এই কৌশল অনুসরণ করেই তাদের প্রাকৃতিক পর্যটনকে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নীতিগত ধারাবাহিকতা। পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ, স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, নিরাপত্তা, দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশবিদ, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।

বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির পথে অগ্রসর হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। সেই যাত্রায় শিল্প ও কৃষির পাশাপাশি পর্যটনও হতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক বৈষম্য হ্রাসের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আলুটিলা সেই সম্ভাবনারই উজ্জ্বল প্রতীক। এখানে প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতি এক সুতোয় গাঁথা।

প্রকৃতির এই অনন্য দানকে সংরক্ষণ করা কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার জাতীয় দায়িত্ব। পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা, দায়িত্বশীল পর্যটন এবং স্থানীয় জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে আলুটিলা শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় ইকো-ট্যুরিজম গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। তখন এই পাহাড়ি জনপদের সবুজ শুধু ভ্রমণপিপাসু মানুষের মনই জয় করবে না, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও উন্মোচন করবে এক নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।

Exit mobile version