ফের রক্তাক্ত পাহাড়। পাহঅড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারকে ঘিরে নতুন করে প্রাণ গেল তিন যুবকের।খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার মধুমঙ্গল পাড়ায় গোলাগুলিতে নিহত হয় ৩ যুবক।
আজ সোমবার (৬ জুলাই) বেলা ১১ টার দিকে উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের মধুমঙ্গল পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে। নিহতরা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন জেএসএস (মূল) দলের সদস্য ছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
তবে নিহতদের নাম পরিচয়সহ বিস্তারিত এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ঘটনার বিষয়ে পানছড়ি থানা পুলিশ জানিয়েছে, ৩ জন নিহতের খবর শোনার পর ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। পরে বিলেল সোয়া ৪ টার দিকে নিহতদের লাশ উদ্ধার করে পানছড়ি থানায় আনা হয়।
পানছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফেরদৌস ওয়াহিদ জানান, বেলা ১২ টার দিকে বিভিন্ন মাধ্যমে শুনতে পান তিনজনের গুলিবিদ্ধ মরদেহ পড়ে আছে। পরে ঘটনাস্থলে গিয়ে নিহতদের মরদেহ পুলিশ হেফাজতে নেয়। তাদের পরিচয় জানাতে পারেনি ওসি। তিনি জানান, অজ্ঞাত তিনজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্যে জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। তদন্তপূর্বক আইন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে জানিয়েছেন ওসি।
ঘটনাস্থল থেকে ২ রাউন্ড তাজাগুলিসহ ১৪ রাউন্ড গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, নিহত ঐ ৩ জন যুবক সন্তু লারমা সমর্থিত জেএসএস’ সক্রিয় সদস্য ছিলেন। তারা দলছুট হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করছিলেন। ঘটনার আগে বাড়ি থেকে বের স্থানীয় বাজারে আসেন ঐ তিন যুবক। বাজার থেকে টমটমে করে ফেরার পথে মধুমঙ্গল পাড়ায় পৌঁছালে ঐ তিন যুবককে একটি সিএনজির গ্যারেজের সামনে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীরা গুলি করে। এতে তারা ঘটনাস্থলেই নিহত হন।
নিহতরা হলেন, রিয়েল চাকমা (২১), পদ্ম চাকমা (১৯) ও ধনা চাকমা (২০)। তাদের মধ্যে রিয়েল চাকমা পানছড়ির আলীচান পাড়ায় এবং অপর দুইজনের বাড়ি রাঙ্গামটি জেলায়।
ঘটনাকে ঘিরে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর কোন ধরণের বিবৃতি বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার পর ঐ এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি থমথমে বিরাজ করছে। দোকান পাট বন্ধ ও জনশূন্য হয়ে পড়েছে সড়ক ও আশপাশ। বিজিবি ও সেনাবাহিনী গিয়ে পরিস্থিতি রাখার চেষ্টা করে।
ট্রিপল মার্ডারের ঘটনায় কারা জড়িত কিংবা আঞ্চলিক চারটি সংগঠনের সম্পৃক্ততা থাকা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জেএসএস এ ঘটনা ঘটিয়েছে বলে জানা যায়।
স্থানীয় কয়েকটি সুত্র বলছে, নিহত তিন যুবক জেএসএস ছেড়ে ইউপিডিএফ’র কালেক্টর হিসেবে কাজ করার জন্যে যোগাযোগ করছিলেন।
এ ঘটনার বিষয়ে জেএসএস’র পক্ষ থেকে কোন বিবৃতি পাওয়া যায়নি এখন পর্যন্ত। এছাড়া ইউপিডিএফসহ অন্যান্য সংগঠনগুলোর সাথে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি!
বিকেলে ট্রিপল মার্ডার নিয়ে গণমাধ্যমে একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয়
ইউপিডিএফ(মূল)। সংগঠনটির মুখপাত্র অংগ্য মারমা বিৃতিতে বলেন, পানছড়ির ঘটনা জেএসএস ও ইউপিডিএফের দুই গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলি নয়, জেএসএস সন্তু গ্রুপের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বলে দাবি করেন।
পাহাড়ে সংঘাত, খুন নিয়ে সাধারণ পাহাড়ি বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাঝে আতঙ্ক ও অস্বস্তি বাড়ছে দিনের পর দিন। এসব ঘটনাকে ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে পাহাড়। সংঘাত বন্ধসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তার বন্ধ, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহারসহ চাঁদাবাজি, গুম, খুন অপরহণ বন্ধে প্রশাসনের জোর তৎপরতা বাড়ানোর দাবি অনেকের।
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মোরতোজা আলী খান বলেন, পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর আধিপত্য বিস্তারে যেসব ঘটনা ঘটে তা নিয়ে জনমনে ভয় কাজ করে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তাছাড়া যেসব এলাকায় ঘটনা ঘটে সেখানে পুলিশের সবসময় যাতায়াত ও যোগাযোগ সম্ভব হয়ে ওঠেনা।
আধিপত্য বিস্তারকে পানছড়ি উপজেলার বাবুরাম পাড়া, পুজগাংসহ কয়েকটি এলাকায় প্রায়ই জেএসএস ও ইউপিডিএফসহ আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে। মারা যান সাধারণ নিরীহ পাহাড়ি নারী পুরুষও।
এর আগে ২০২৫ সালের মার্চ মাসে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর গোলাগুলির ঘটনায় পানছড়ির দুদক ছড়ায় রূপসী চাকমা এক গৃহিণী গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন।
২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পানছড়ির অনিল পাড়ায় পাহাড়ের চূড়ায় প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত ইউপিডিএফ’র (মূল) চার নেতা। পরবর্তীতে এ ঘটনায় নিহতের পরিবার থেকে মামলা দায়ের করা হলেও এখন পর্যন্ত কোন অগ্রগতি হয়নি।
এসব ঘটনা নিয়ে বেগ পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও।
