parbattanews

জব্দ মাদকের মূল্য প্রকাশ কি নতুন অপরাধী তৈরি করছে?

মাদক সেবন কেবল একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করে না; এটি একটি পরিবার, সমাজ তথা গোটা রাষ্ট্রকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মাদকাসক্তির করাল গ্রাসে তিলে তিলে নিভে যাচ্ছে হাজারো তরুণ প্রাণ, আর হতাশার বুকচাপা কান্নায় দিন কাটছে তাদের পরিবার ও স্বজনদের।

বর্তমানে দেশের আনাচে-কানাচে হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা ইয়াবা। আর এই মরণব্যাধিকে পুঁজি করে রাতারাতি ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ বনে যাচ্ছে একশ্রেণীর অসাধু মানুষ। কম সময়ে লাখপতি ও কোটিপতি হওয়ার তীব্র লোভ দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকেও ঠেলে দিচ্ছে এই অন্ধকার জগতে।

সমাজের অনেক সাধারণ শ্রমিক বা দিনমজুর হুট করেই বনে যাচ্ছেন আলিশান বাড়ি-গাড়ির মালিক। জীবনযাত্রার এই অস্বাভাবিক পরিবর্তন স্থানীয় সাধারণ মানুষের চোখে পড়লেও অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় অন্যরা এই ব্যবসায় আরও উৎসাহিত হচ্ছে। ‘জিরো থেকে হিরো’ হওয়ার এই অন্ধ মোহ যেন সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

গত এক মাসে ৬৪ বিজিবি কর্তৃক ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ৭৮৪ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। মাদক ইয়াবা আটকের এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে বিজিবি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বিভিন্ন সময় ইয়াবাসহ বড় বড় মাদকের চালান জব্দ হওয়ার পর গণমাধ্যমে এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রকাশ করা হয়। যেমন- ১ লাখ পিস ইয়াবার মূল্য দেখানো হয় প্রায় ৩ কোটি টাকা।

এই বিশাল অঙ্কের টাকার গল্প যখন গণমাধ্যমে ঢালাওভাবে প্রচার হয়, তখন সাধারণ মানুষের একাংশ বিভ্রান্ত হচ্ছে। কম সময়ে ধনী হওয়ার আশায় অনেকে লোভে পড়ে এই পাচার চক্রে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাফল্যের প্রচারনাই উল্টো নতুন অপরাধী তৈরিতে কাজ করছে কি না, সেই প্রশ্ন এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।

মাদকের আর্থিক মূল্য প্রকাশ প্রসঙ্গে উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম বলেন- আমরা এখন আর মাদকের আর্থিক মূল্য সাধারণত প্রকাশ বা উল্লেখ করি না। তবে সত্যি কথা বলতে, দুনিয়াতে সব কিছুরই একটা মূল্য আছে। গাঁজা, হিরোইন, ফেনসিডিল, আফিম, ইয়াবা, মদ—সব কিছুরই একটা অবৈধ বাজার মূল্য পাওয়া যায়। তাই বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সামগ্রিক সাফল্য সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার জন্য অনেক সময় এই মূল্য প্রকাশ করে থাকে।”

প্রতিদিন মিয়ানমার থেকে উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন সীমান্ত পেরিয়ে এবং সমুদ্রপথে লাখ লাখ পিস ইয়াবা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কঠোর নজরদারি চালিয়ে অনেক বড় বড় চালান আটক করতে সক্ষম হলেও বিশাল একটি অংশ রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ইয়াবা পাচারের সময় প্রায়শই কেবল চুনোপুঁটিরাই আটক হচ্ছে। পর্দার আড়ালে থাকা মূল অর্থদাতা এবং সিন্ডিকেটের রাঘববোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। গডফাদারদের আইনের আওতায় না আনা পর্যন্ত এই চোরাচালান পুরোপুরি বন্ধ করা অসম্ভব।

তবে মাদকের এই অভিশাপ থেকে দেশকে মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর সীমান্ত রক্ষী বাহিনী। উখিয়া ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম জানান, ‘সীমান্ত সুরক্ষার পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধে বিজিবি জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছে। মাদক সরবরাহকারী ও মূল হোতাদের আইনের আওতায় আনতে গোয়েন্দা নজরদারি ব্যাপক জোরদার করা হয়েছে। দেশের ও তরুণ প্রজন্মের স্বার্থে এ ধরণের কঠোর অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে।’

তিনি সীমান্ত সুরক্ষায় এবং মাদক কারবারিদের যেকোনো গোপন তথ্য দিয়ে বিজিবিকে সহযোগিতার জন্য স্থানীয় নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানান।

শুধু সীমান্ত পাহারা বা চুনোপুঁটিদের ধরে মাদকের এই নীল দংশন থেকে সমাজকে বাঁচানো সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন মাদক কারবারিদের সামাজিক বয়কট, গডফাদারদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং মাদকের কোটি টাকার লোভী প্রচারণার চেয়ে এর ভয়াবহ কুফলের দিকটি বেশি বেশি তুলে ধরা। যুবসমাজকে বাঁচাতে এখনই সম্মিলিত প্রতিরোধের কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : পার্বত্যনিউজের টেকনাফ প্রতিনিধি।

Exit mobile version